আমার সখের পেশা

প্রকাশিত: অক্টোবর ৬, ২০২০; সময়: ১:৫৭ pm |
খবর > মতামত

এম. এ. মতিন : শিক্ষক দিবসের এ বছরের তারিখ ৫-১০-২০ খ্রিঃ বেশ চমৎকার! দিন- মাস- বছর সবই ৫ দ্বারা বিভাজ্য। যেন ৫ এর ঘরের নামতা !! হ্যাঁ ঠিক তাই। প্রাইমারী স্কুলের আঙ্গিনায় “পড় সর্দার প্রথায়” দলনেতা নামতা পড়াচ্ছেন- ৫ একে ৫, ৫ দ্বিগুনে ১০, ৫ চারে ২০ ; “পড়সর্দার প্রথায়” ছাত্রই শিক্ষক। আমাদের সময়ে ছাত্রদের কাছে এই “পড় সর্দার প্রথা” বেশ জনপ্রিয় ছিল। ঐ প্রথায় দূরে দাঁড়িয়ে শিক্ষক মনিটারিং করতেন বটে তবে অংশগ্রহণ ছিল ছাত্রদের বেশি।

সে যাই হোক শিক্ষকদিবসে আমি আজ আমার প্রিয় শিক্ষকদের নিয়ে লিখছি। আদর্শিক, নান্দনিক,পরিপূর্ণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন যে মানুষ গুলো অর্থনৈতিক দিক না ভেবে খোলা আকাশের নীচে রোদে পুড়ে, বৃস্টিতে ভিজে শুধুমাত্র সামাজিক কর্তব্যজ্ঞানে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস ধরে ধারাবাহিক শিক্ষাদান করেন। সেইসব মহানায়কের কোনকিছুর সাথেই তুলনা হয়না।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম কে সুনাগরিক হিসাবে গড়ে তোলাটা কর্তব্যজ্ঞান মনে করা এই মানুষগুলো সত্যি মহামানুষ! যারা নিজেদের সুখ সাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে কেবলমাত্র আপনার সন্তান কে মানুষ করতে চাইতেন। আমি আজ তাদের কথা বলছি- সমাজের এই সুন্দর মানুষ গুলোর পুরু চশমার ফাঁক দিয়ে দেখতাম-কি সুন্দর স্নেহভরা আদর মেশানো শাসনের দৃষ্টি!

যে দৃষ্টির আলোকচ্ছটায় যেমন শিখেছি দিক – নাম- আর নামতা। তেমনি ঘনীভূত হতে পেরেছি মা-মাটি- আর মানুষের সাথে। সেই সব শিক্ষাগুরুকে পরম শ্রদ্ধা ভরে সালাম! হাজার সালাম!! লাখো সালাম!!!

তুলনামূলকভাবে ভালো এবং লোভনীয় প্রস্তাবনা রেখে “শিক্ষকতা”পেশায় যোগ দিয়েছিলাম আদর্শিক কারনে। দেশ ও জাতির কল্যানে নিজেকে উৎসর্গ করার অভিপ্রায়ে। তার কতটুকু পেরেছি জানিনা। মনে হতো শুধুমাত্র এই একটি পেশায় সরল পথে জীবনকাল অতিবাহিত করা সহজ।

ভুল বুঝবেন না আর আমিও বলছিনা শিক্ষকেরাই শুধুমাত্র কিংবা কেবল মাত্র সৎ। আর সবাই আলাদা। সবাই সবার বিবেকের কাছে স্বচ্ছ থাকতে পারলেই বুঝে নিবেন আপনিও আদর্শিক। এই পেশায় এসে আমার প্রাণপ্রিয় ছাত্র/ ছাত্রীদের কাছে আজ অবধি যত সম্মান পেয়েছি তা লিখে শেষ করার নয়। চলতিপথে প্রিয় ছাত্র/ ছাত্রীরা যখন সম্মান দেখায়। তখন মনে হয় আমিই শ্রেষ্ঠ। আমিই শিক্ষক। এমনটা আর কেউ পায়না। বুকটা চওড়া হয়। এইতো আমার সূর্য সন্তান। এই তো আমার পরম পাওয়া। আর কি চাই।

ঠিক তখনি মনে হয় -“তুমি মস্তবড় বাহাদুর! তোমাকে সম্মান দেয় ভয়ে। এ সম্মান তোমার ক্ষমতার! এ সম্মান তোমার কাছে অনেক কিছু মনে হলেও আমি বলবো এটা ঠুনকো। যার মাঝে আন্তরিকতা নেই। যার মূল্য আজ আছেতো কাল নেই।”

শিক্ষকতা পেশায় চরম ধর্য্যেরও পরীক্ষা দিতে হয়। যা আপনি পারেন না। বাড়িতে আপনি নিজের একটি অথবা দু’টি শিশু সন্তানকে পরিচালিত করতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন। কখনো নিজেই কেঁদে ফেলেন। রাগে, দুঃখে, কষ্টে সন্তানের গায়ে হাত তুলেন। যা অনুচিত।

আপনার মাঝে সার্বক্ষনিক এক ভয়! সন্তানের কি হবে? ভবিষ্যৎ এ কি করবে? অথচ আমরা যারা শিক্ষকতা পেশার সাথে জড়িত ; তারা কিন্তু প্রতিদিন ২০০০ দুই হাজার ছাত্র/ছাত্রীর অভিযোগ, অনুযোগের সমাধান করি। একটুও বিরক্ত হইনা বরং আনন্দ পাই।

বিশ্বাস করুন আর নাই করুন আমার অনেক সহকর্মী স্কুলে ক্লাশ নিতে পারছেন না বলে করোনাকালীন সময়ে স্কুলে এসে বসে থেকেছেন। বারবার বলেছেন,” স্যার! আর কতদিন? আর ভালো লাগে না।” উনাদের মত আমারও ভালো লাগেনা।

আপনি যখন বিদ্যালয়ে এসে আপনারই সন্তানের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের নানা বিষয়ে বলেন। আমরা কিন্তু সে কথাগুলো মনযোগী হয়ে শুনি। কারন তাতে শুধরাবার সময় পাই। তাতে আপনার সুপরামর্শ পাই।সে মোতাবেক ব্যবস্থা নিতে পারি। মনে মনে অনেক ধন্যবাদ দেইও।

আপনাদের সবারই কমবেশি একই অভিযোগ। এই যেমন-‘‘বাবু পড়াশুনা করেনা, আমি বাবা হলেও কি বলবো আমার কথাতো শুনেই না। ইদানিং ওর মায়ের কথাও শুনে না, সারাদিন মোবাইল আর মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। পড়াশুনার কথা বললেই খাওয়া-দাওয়া বন্ধ। কখনো কখনো রুমে ছিটকানি আটকিয়ে মোবাইলে গেম খেলে। চ্যাট করে।’’

তারপর আপনিই আবার কথা ঘুড়িয়ে বলেন,”লেখাপড়া কি স্কুলে হয়না? বাড়ির কাজ বেশি বেশি কেন দেন না?আপনারা এমন করে পড়া দেবেন যেন সারাদিন ব্যস্ত থাকে। ইদানিং মাস্টাররা সবাই কমার্সিয়াল হয়ে গেছেন। ইত্যাদি।”

আমরা শিক্ষকেরা স্কুল টাইমের সারাদিন ব্যস্তই রাখি। তাই বলছিলাম ওদেরকে জানবার সুযোগ দিন। ওরা জানুক। ওরা ওদের মত করে গড়ে নিক। তাতে আপত্তি কোথায়? আপত্তি থাকবে। কেননা আমি আপনি যা হতে পারিনি তাই ওদের কে হতে বলি। কড়ায় গন্ডায় ওদের কাছ হতে সে অনুযায়ী আদায় করে নিতে চাই। এইতো!

এমনটা চাওয়ার পেছনে কিন্তু একটা কারন আর তা হলো- অসূস্থ প্রতিযোগিতা! বর্তমানে সব পিতামাতাই বলে থাকেন “সে যদি হয়! তুমি কেন নও।”

কিন্তু আমি বলি সবাই যদি প্রথম হয়। তাহ’লে দ্বিতীয় হবে কে? কেউ না ! এইতো। বেশতো মেনে নিলাম! এবার আপনার শৈশবের কথা একটু ভাবুন। ভাবতে পারছেন না বলেই বর্তমানে এই প্রতিযোগিতার নাম হচ্ছে “মানসিক অসূস্থতা”। অধিকাংশ পিতাই তার সন্তানের পছন্দ -অপচ্ছন্দকে পাত্তা দেয়না বলেই জোড় করেন।

পক্ষান্তরে একজন শিক্ষক পছন্দ অপছন্দের মূল্যায়ন করে বলেই বাচ্চারা শিক্ষকদের কথার উপর নির্ভর করে; শিক্ষদের কথা বেদবাক্য মনে করে, বিশ্বাস করে, আনন্দ পায়। আপনার উপর নয়। কিন্তু কেন নয়?

লেখক- প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত), নাটোর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়।

  • 9
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও খবর

উপরে