রোযার শিষ্টাচার

প্রকাশিত: মে ১৮, ২০২০; সময়: ১২:৫৬ pm |
খবর > মতামত

হোছাইন আহমাদ আযমী : শিষ্টাচার শব্দটিকে ইসলামী পরিভাষায় আদব বলা হয়। প্রথমে ‘আদব’ সম্পর্কে কিছু মৌলিক কথা উল্লেখ করছি।

‘আদব’ অর্থ উৎকৃষ্ট রীতিনীতি, উত্তম পদ্ধতি ইত্যাদি। ইবাদত-বন্দেগী থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল কাজ-কর্ম, লেনদেন, সামাজিকতা, আচার-ব্যবহার এবং মন ও মানসের পরিশুদ্ধি ইত্যাদি সকল বিষয়ে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে রীতি ও নীতি নিজে অবলম্বন করেছেন এবং উম্মতকে তা অনুসরণ করতে বলেছেন তারই নাম হল আদব।

ইসলামে আদবের স্থান অনেক ঊর্ধ্বে। (তা যে কোনো বিষয়েরই হোক না কেন)। এগুলো কোনো অনর্থক বা অতিরিক্ত জিনিসের মতো নয়; বরং তা ইসলামের যাবতীয় হুকুম-আহকামের মৌলিক উদ্দেশ্যেরই অন্তর্ভুক্ত।

ইবাদত সংক্রান্ত আদাবসমূহ এজন্যই যত্নের সাথে পালনীয় যে, বিশেষত প্রত্যেক ইবাদতের ফযীলত, বরকত ও ফলাফল তখনই যথাযথভাবে পাওয়া যাবে যখন সে ইবাদতের যাবতীয় আদবের প্রতি যত্নবান হয়ে তা আদায় করা হবে। আজ ঈমানী দুর্বলতার কারণে আদব শব্দটি শুনতেই একটি নেতিবাচক অর্থের দিকে কারো কারো মন ধাবিত হয়। তা এই যে, আদব মানেই তা ছেড়ে দেওয়া জায়েয। এটা ছাড়াও কাজ হয়ে যাবে। এসবের তেমন গুরুত্ব নেই ইত্যাদি। অথচ ঈমানের দাবি তো এই ছিল যে, আদব শব্দ শুনতেই তার ইতিবাচক দিকটি মনে জাগ্রত হওয়া। অর্থাৎ এটা করা উত্তম এবং এর এই এই উপকার রয়েছে। আর এর দ্বারা ইবাদত সুন্দর হয় এবং কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে ইত্যাদি। এখানে একথাটাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, যে কাজকে আদব বলা হবে তা সর্বদাই মুস্তাহাব পর্যায়ের আমল হবে- এটা অপরিহার্য নয়।

অর্থাৎ ‘আদব’ শিরোনামে উল্লেখিত হলেই তা করা ও না করার স্বাধীনতা রয়েছে ধরে নেয়া ভুল। বরং কোনো কোনো সময় এমন বিষয়কেও আদব বলা হয়, যা ফরয কিংবা ওয়াজিব, এমনকি এর চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ। যেমন রোযার আদবসমূহের মধ্যে একটি আদব হল গীবত না করা। এখন যদি এই ধারণা করা হয় যে, গীবত পরিহার করা যেহেতু ‘আদব’ বলে উল্লেখ করা হল তাহলে এটা একটা অনুত্তম কাজ। তবে নিঃসন্দেহে তা ভুল হবে। কেননা, গীবত সব সময়ের জন্যই হারাম এবং কবীরা গুনাহ। রমযানের মতো পূত-পবিত্র মাসে এবং রোযার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতে তা জায়েয হবে কীভাবে? এ সময়ে তো এ থেকে বেঁচে থাকা পূর্বের তুলনায় আরো অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য। কাজেই আদব শব্দ শুনলেই বিষয়টিকে মুস্তাহাব মনে করে নেয়া নিতান্তই ভুল।

এছাড়া কিছু আদব এমন রয়েছে, যা ফিকহী হুকুম অনুযায়ী তো মুস্তাহাব পর্যায়ের বটে, কিন্তু তার সুফল ও উপকারিতা লক্ষ্য করলে একজন মুমিন কখনো তা অগ্রাহ্য করতে পারে না। দৃষ্টান্তস্বরূপ উল্লেখ করা যায় নামাযের খুশু-খুযুকেই (একাগ্রতা)। এটাকে নামাযের ওয়াজিব বা সুন্নাতে মুআক্কাদা কোনোটির সাথেই গণনা করা হয় না। অথচ একাগ্রতা বা খুশু-খুযুই হল নামাযের রূহ তথা প্রাণ। এটির অনুপস্থিতিতে যদিও নামাযের ফরয আদায় হয়ে যাবে, কিন্তু আল্লাহ তাআলার দরবারে একটি মাকবুল আমল হিসাবে গৃহীত হওয়া এবং নামাযের বিশেষ সুফল ও উপকার লাভ করা খুশু-খুযুর উপরই নির্ভরশীল। এটা শরীয়তের অনেক বড় অনুগ্রহ যে, নামাযের ফরয থেকে নিষ্কৃতি পাওয়াকে এর সঙ্গে শর্তযুক্ত করে দেয়নি। অন্যথায় আমাদের মতো দুর্বল ঈমান ও অস্থির চিত্ত লোকদের জন্য তা অত্যন্ত কঠিন হয়ে যেত। কিন্তু তাই বলে খুশু-খুযুর প্রতি উদাসীনতার পরিচয় দেওয়া আদৌ সমীচীন হবে না।

সারকথা এই যে, ইসলামের আদবসমূহের ব্যাপারে একজন মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই ইতিবাচক হওয়া উচিত। যাতে তা অবলম্বন করার সৌভাগ্য হয় এবং ইবাদতের সুফলসমূহ অর্জিত হয়। আদব সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত জরুরি ভূমিকাটির পর মূল বিষয় অর্থাৎ রোযার আদব সম্পর্কে আলোচনা করা হল।

আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে রোযার ব্যাপারে যে সমস্ত ফযীলত, বরকত ও পুরস্কারের ওয়াদা রয়েছে, তা পেতে হলে এবং কাংখিত লক্ষ্য তথা আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য্য, তাকওয়া ও খোদাভীতি অর্জন করতে হলে শুধু পানাহার ও স্ত্রী-সম্ভোগ ত্যাগ করাই যথেষ্ট নয়। কারণ, এগুলো হচ্ছে রোযার দেহ-কাঠামো। আর তার রূহ হল তার আদবসমূহ। তাই রোযার আদবসমূহের ব্যাপারে যত্নবান না হলে রোযার উপরোক্ত ফযীলত ও বরকতসমূহ অর্জিত হবে না।

রোযার আদবসমূহঃ
১) দৃষ্টিকে সর্বপ্রকার গুনাহ থেকে হেফাযত করা। যেমন বেগানা মেয়েদের প্রতি দৃষ্টিপাত করা থেকে, টিভি-সিনেমা দেখা থেকে বিরত থাকা।

২) জবানের হেফাযত। অর্থাৎ মিথ্যা, গীবত-পরনিন্দা, অশ্লীল কথাবার্তা ও ঝগড়া-বিবাদ থেকে দূরে থাকা।

হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে-
যে ব্যক্তি রোযা অবস্থায় মিথ্যাচারিতা ও মন্দ কাজ করা পরিত্যাগ করেনি তার পানাহার পরিত্যাগের কোনোই গুরুত্ব আল্লাহর কাছে নেই। আল্লাহ তাআলা তার পানাহার ত্যাগ করার কোনোই পরোয়া করেন না। (সহীহ বুখারী, হাদীস ১৯০৩)

অন্য এক হাদীসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- রোযা অবস্থায় তোমাদের কেউ যেন কোনো অশ্লীল কিংবা মন্দ কথা না বলে। যেন কোনো প্রকার শোরগোল, হট্টগোলে লিপ্ত না হয়। যদি অন্য কেউ তাকে গালিগালাজ করে কিংবা মারধোর করে তবে সে যেন (তদ্রুপ আচরণ বা গালির প্রতিউত্তরে গালি না দিয়ে) শুধু এতটুকু জানিয়ে দেয় যে, আমি রোযাদার।(সহীহ বুখারী, হাদীস ১৯০৪)

এতে প্রতীয়মান হয় যে, রোযা অবস্থায় মারধর ঝগড়াঝাটি তো দূরের কথা, শোরগোল করাও রোযার আদব পরিপন্থী। অতএব জবানকে এসব থেকে বিরত রেখে সর্বদা যিকির-আযকার ও কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে তরতাজা রাখবে। অন্তত চুপ থাকলেও রোযার বরকত বিনষ্ট হওয়া থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।

৩) কানকে সর্বপ্রকার গুনাহের কাজ থেকে হেফাযত করা। যেমন গানবাদ্য, গীবত, পরনিন্দা ও অশ্লীল কথাবার্তা শোনা থেকে দূরে থাকা।

৪) এছাড়া অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেমন হাত ও পা ইত্যাদিকে গুনাহ ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখা।

৫) সাহরী ও ইফতারে হারাম আহার পরিহার করা। ইমাম গাজ্জালী রাহ. বলেন, যে ব্যক্তি সারাদিন রোযা রেখে হারাম মাল দ্বারা ইফতার করল, সে যেন একটি অট্টালিকা নির্মাণ করল এবং একটি শহর ধুলিস্যাত করে দিল।

৬) রোযা অবস্থায় আল্লাহ তায়ালার প্রভাব-প্রতিপত্তি ও বড়ত্বের কথা এবং তাঁর হুকুম আহকাম বেশি বেশি স্মরণ রাখা। রোযাদারের অন্তরে এ চিন্তা জাগরুক থাকা উচিত যে, আল্লাহ তায়ালা হাযির নাযির অর্থাৎ সদা-সর্বত্র বিদ্যমান আছেন। আমি তাঁর হুকুমে এবং তাঁরই সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য পানাহার ত্যাগ করেছি। তাঁকে সন্তুষ্ট করার জন্য আমাকে ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত থাকতে হবে।

এভাবে এক মাস রোযা রাখা সম্ভব হলে ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাকওয়া ও সংযমের মহামূল্য সম্পদ দান করবেন, যার মাধ্যমে ইহকালীন ও পরকালীন প্রভূত কল্যাণের দ্বার উন্মুক্ত হবে।
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তাওফীক দান করুন- আমীন।

লেখক, শিক্ষক জামিয়া উসমানিয়া হোছাইনাবাদ কাটাখালী রাজশাহী।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে