এটা আদর্শের মিলন মেলা

প্রকাশিত: জানুয়ারি ৩০, ২০২০; সময়: ৮:৪৮ অপরাহ্ণ |
Share This

মোহা. আসাদুজ্জামান আসাদ : শীত আসলেই আমাদের দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের উদ্যোগে হয় বনভোজন। বনভোজন, মিলনমেলা, আনন্দ ভ্রমণ এমন অনেক নামেই হয়ে থাকে এসব আয়োজন। তবে রাজশাহীতে এক দশক ধরে ভিন্নধারার একটা মিলনমেলা হয়ে আসছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মানুষের মিলনমেলা। এটা সাধারণ কোন বনভোজন বা আনন্দ ভ্রমণের মধ্যে পড়ে না।

আমরা যে কয়জন এটির উদ্যোক্তা ছিলাম তারা চেয়েছিলাম বছরের একটা দিন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মানুষগুলো একটু ভিন্নভাবে কাটাবো। যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশনেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালি করতে সব ধরনের ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত। গ্রামের পা ফাটা মানুষগুলো একদিন একসাথে মিলিত হয়ে আনন্দের গান গাইবে, সুন্দর আগামীর গান গাইবে। আমরা যে প্রত্যাশা নিয়ে পথ চলা শুরু করেছিলাম সেই পথে হাঁটছি আজও। হাঁটি হাঁটি পা পা করে সেই পথেই এগিয়ে চলেছি আমরা। প্রথম দিনের আয়োজনটা খুবই ক্ষুদ্র হলেও আজ তার ব্যাপকতা উল্লেখ করার মত। এক দশক আগে আমরা আওয়ামী পরিবারের মিলনমেলা রাজশাহীতে শুরু করেছিলাম। আর আজ এই মেলা হয় দেশের বিভিন্নস্থানে। এই আয়োজন নিয়েই বলবো কিছু কথা।

আওয়ামী পরিবারের মিলন মেলা আমারা শুরু করেছিলাম ২০১০ সালে। এটির মূল লক্ষ্য ছিলো রাজনীতি করা মানুষদের একদিন অরাজনৈতিক ভাবে একত্রিত হওয়া। সেটিকে মাথায় নিয়ে আমরা আওয়ামী পরিবারের মিলনমেলা নাম দিয়ে শহীদ কামারুজ্জামন উদ্যানে শুরু করেছিলাম। প্রথমটিতে প্রায় হাজার খানেক মানুষের অংশগ্রহণ ছিলো পরিবারসহ। তারপর এটি ধীরে ধীরে প্রায় ৪/৫ হাজার হয়েছে। এটির মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিলো প্রতি বছর আওয়ামী পরিবারের অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর অদর্শ যারা ধারণ করে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার যারা ধারক বাহক এই মানুষগুলো বছরে একদিন আমার একবেলা এক সঙ্গে খাই।

এখানে কোন রাজনৈতিক বক্তৃতা হয় না, এখানে কোন গ্রুপিং এর আলোচনা হয় না। এখানে শুধুমাত্র আমাদের দলীয় চেতনার মানুষেরা একে অপরের সাথে মতবিনিময় করেন, গল্প করে সময়টি অতিবাহিত করে। এর মাঝে কিছু দিন থেকে কিছু কবি সাহিত্যিকদের যাওয়া আসা বেড়েছে। তাদের কিছু বই প্রকাশনা উৎসব হয়। এখানে ভিশন-২০২১ রক্তদান, রক্তের গ্রুপিংসহ বিভিন্ন কর্মসূচি থাকে। বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা হয়। যারা আজন্ম আওয়ামী লীগ করেছে, যাদের বয়স ৭০ এর উদ্ধে এসমস্ত মানুষদেরকে অজন্ম যোদ্ধ হিসেবে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এ বছরও ২০ থেকে ২৫ জনকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে।

আমি মনে করি এটি আমাদের প্রাণের মেলা, প্রাণের উৎসব। আওয়ামী লীগের সম্মেলনে যেমন অনেক পুরানো মানুষ একত্রিত হয় এখানেও। আমরা রাজনীতির মাঠে রাজনীতি করি কিন্তু অনেকের বউ বাচ্চার সাথে পরিচিত না। এখানে সবাই পরিবার নিয়ে আসে তাদের এক পরিবারে সাথে আরেক পরিবারের কথাবার্তা হয়, সাক্ষাৎ হয়। এই বিষয়গুলো অনেক বেশি আন্তরিকতা তৈরি করে। এই দিনটি সারাদিন কিভাবে কত আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে পার হয় সেটা নাা বলে বোঝানো যাবেনা।

অনেক বেশি আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে পার হয়। অনেকই বলে এটি পিকনিক। এটি পিকনিকও না। দুপুরে কেউ খায়, কেউ খায় না। কিন্তু  তাদের যে আত্মার সম্পর্ক… সেই কবে এক সঙ্গে মিছিল করেছিলো, সেই কবে একসঙ্গে জেলে ছিলো, পুলিশের তাড়া খেয়েছিলো সেসব হাজারো স্মৃতির সম্পর্ক এখানে এক হয়ে যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন দলের সভাপতি হিসেবে রাজশাহীতে বা তার আশেপাশের জেলাগুলোতে এসেছিলেন আমরা গিয়েছি। কিভাবে গিয়েছি, শেখ হাসিনা যখন প্রথম রাজশাহী এসেছেন তাকে আমরা কিভাবে গ্রহণ করেছি। আবার বঙ্গবন্ধু যখন রাজশাহী এসেছেন বা তার সাথে যারা রাজনীতি করেছেন। সেই সময়ের মানুষদের স্মৃতিচারণ, শহীদ কামারুজ্জামানের সাথে যারা রাজনীতি করেছেন এইভাবে বিভিন্ন সময়ের যেসব নেতৃত্ব ছিলো তাদের একটি সমন্বয় হয়। এখানে একে অপরের সাথে এ বিষয়গুলো নিয়ে মতবিনিময় করে। তাতে করে আমরা আমাদের সম্পর্কে যেমন জানি, দলের অতীত সম্পর্কেও জানি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা স্মৃতি চারণ করেন।

সব মিলিয়ে এই আওয়ামী পরিবারের মিলন মেলা আমাদের জন্য সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। এখানে বঙ্গবন্ধু, মাওলানা ভাষানী, শের ই বাংলা, আওয়ামী লীগের সভাপতি বর্তমান বাংলাদেশের রূপকার দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে নিয়ে আলোচনা হয়। দেশের উন্নয়ন কর্মকান্ড এবং বাংলাদেশের ইতিহাস ঐতিহ্যও উঠে আসে। এগুলো আমাদের বিভিন্ন ছবির মাধ্যমে প্রদর্শিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের গান, কবিতায় শিহরিত হয় এই চেতনার হাজারো মানুষের হৃদয়।

আজকে ২০২০ সালের যে মিলন মেলা, এখানেও প্রায় ৩ হাজার মানুষ রেজিস্ট্র্রেশন করেছে। তারা সকাল ১০টা থেকে আসবে। তারা তাদের প্রাণের উৎসবে যোগ দিবে। সারাদিন রাজনীতিবিদরা রাজনীতির বাহিরে একদিন তারা মিলিত হবে। এইভাবে আমরা এটি করি। এটি শুধু রাজশাহী জেলার মানুষই নয় বাইরের অনেক জেলার মানুষই এতে যোগ দিচ্ছেন। রবাবরই চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর মানুষ থাকে এই আয়োজনে। এবার নাটোর, বগুড়া নড়াইল, রংপুরসহ বিভিন্ন জায়গার মানুষ নিবন্ধন করেছে। এটি ধীরে ধীরে গ্রাম পর্যন্ত যাচ্ছে। আমাদের বাহিরেও অনেক জায়গাতে আওয়ামী পরিবারে মিলনমেলা নাম দিয়ে করছে। আমি মনে করি, এটি ভালো দিক। নিজেদের মধ্যে যদি ছোটখাটো সমস্যা থাকে এই মেলাতে আসলে সেটিও দূর হয়।

রাজশাহীর এই আয়োজন সুন্দরভাবে শেষ করতে প্রায় দুই মাস আগে থেকে এর কাজ পরিচালিত করা হয়। মূলত মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শফিকুজ্জামান এই আয়োজনের সার্বিক আয়োজন করে থাকে। এছাড়াও ছাত্রলীগের সাবেক, বর্তমান প্রায় এক থেকে দেড়শ ছেলে মেয়ে কাজ করে। তারা দিন রাত্রি কাজ করে। এজন্য অফিস খোলা হয়। অনেকেই ফরম নিয়ে চলে যায়। আবার জমা দেওয়ার সময় টাকা দেয়। সেটি কম্পিউটারে তালিকাভুক্ত করা হয়। মিলন মেলার দিন একটি পরিচিতি কার্ড প্রত্যেকের গলায় দেওয়া হয়।

এছাড়া একটি খাদ্য কুপন দেওয়া হয়। এটা নিয়ে তারা সকলেই লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার গ্রহণ করে। এখানে কোন হৈ চৈ বা কে খাবার পাবে আর কে পাবে না এমনটি হয় না। এখানে শুধু যারা রেজিট্রেশন করে তারায় আসে না। এখানে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অনেক মানুষকে অমন্ত্রণ জানানো হয়। এখানে সাংবাদিক বন্ধুদের অমন্ত্রর জানানো হয়। প্রশাসনের বিভিন্ন মানুষকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সব মিলিয়ে কাজটি প্রথম দিকে আমাদের কাছে খুব কঠিন ছিলো। এখন ধীরে ধীরে নিয়মের মধ্যে আনতে পেরেছি।

একটু পুরানো কথা বলি, আওয়ামী পরিবারের মিলন মেলার এই ভাবনাটি কিভাবে এলো একটু বলে রাখা ভালো। আমি ২০০৯ সালে ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের নিয়ে একটি পিকনিকের মত আয়োজন করেছিলাম। তখনই মনে হয়েছিলো এখানে যদি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সময়ের মানুষদের ডাকা হয়। কিন্তু এত মানুষকে তো দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানো সম্ভব না। আমরা নিজের টাকায় পিকনিক করি। এটির নাম দিলাম আওয়ামী পরিবারের মিলনমেলা। আমার টাকা আমার উৎসব, আমার টাকায় আমি খাবো। এটি মাথায় নিয়েই এই মিলন মেলা শুরু।

সেখানে প্রথমবার যারা এসেছিলো তারা ২০০৯ সালে আমার কাছে দাবি করেছিলো এটি যেন বন্ধ না হয়। এটি যাতে চলমান থাকে। এখানে আরও একটি জিনিস হয়। এই মিলন মেলার যারা নিয়মিত সদস্য তাদের অনেকেই মৃত্যু বরণ করেছেন। এই সমস্ত মানুষদের তালিকা করি। কোন মানুষ মৃত্যু বরণ করেছে, কারা অসুস্থ তাদের জন্য দোয়া করা হয়। শেষ করা হয় আওয়ামী লীগ যাতে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী যাতে মানুষের সেবা করতে পারেন এবং আল্লাহ যাতে তাকে সুস্থ রাখে দোয়ার মধ্য দিয়েই মিলনমেলার সমাপ্তি ঘটে।

ক্ষমতায় যারা আছেন তারা দুই চারজন এই আয়োজনে থাকতে পারেন। যারা আওয়ামী লীগের একদম পোড় খাওয়া মানুষ, যারা শুধু চায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাক। যারা দলের কাছে কিছু প্রত্যাশা করে না। যারা চায় জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু শ্লোগানটি উচ্চারিত হোক। বঙ্গবন্ধুর ছবি মাথার উপরে থাকুক। এই মানুষগুলোর সংখ্যাই বেশি। পা ফাটা মানুষগুলোই এখানে বেশি আসে। এখানে কোট প্যান্ট পরা মানুষের সংখ্যা কম। এখানে এমপি-মন্ত্রীদের আনাগোনা নাই বললেই চলে।

এটি আমাদের চলমান প্রক্রিয়া। এটি চলবে। এটির সাথে দলের দায়িত্বে থাকা না থাকার সম্পর্ক নেই। এটি আমাদের একটি প্রাণের উৎসব বলে আমি মনে করি। সংগঠন সংগঠনের গতিতে চলে। আর মিলন মেলা আমাদের একত্রিত করে। এটি প্রাণের উৎসব। এখানে কিন্তু এবছরে মিলন মেলার দিনই জানিয়ে দেওয়া হবে আগামী বছর কত তারিখে মিলন মেলা হবে।

এবার যারা আসবে তারা একটি মুজিব বর্ষের কোট পিন পাবে, একটি ক্যালেন্ডার পাবে, কিছু বই প্রকাশনা উৎসব হবে। সেই বইগুলো তারা পাবে। মুক্তিযুদ্ধ ও শেখ হাসিনার ইতিহাস নিয়ে লেখা বই থাকে। থাকে বাঙ্গালির পিঠা স্টল। চাঁপাইয়ের নকশি কাঁথা আসবে। এই ভাবে সারাদিন ব্যাপি এই কাজগুলো হয়।

লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগ ও আয়োজক, আওয়ামী পরিবারের মিলন মেলা।

উপরে