জনকের প্রত্যাবর্তন ও বিজয়ের পরিপূর্ণতা

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১০, ২০২০; সময়: ৩:৪১ অপরাহ্ণ |
খবর > মতামত
Share This

এম নজরুল ইসলাম : আজ ১০ জানুয়ারি। বাঙালী জাতির জীবনে এক ঐতিহাসিক দিন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের এই দিনে দেশে, প্রিয় মানুষের কাছে ফিরে আসেন জাতির জনক, বাংলাদেশের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১০ জানুয়ারি তাই ইতিহাসের এক স্মরণীয় দিন। জনকের প্রত্যাবর্তনে ১৯৭২ সালের এই দিনটিতে সত্যিকার অর্থেই রোমাঞ্চ লেগেছিল বাংলাদেশের ‘দিকে দিকে, ঘাসে ঘাসে’। সে এক ‘মহাজন্মের লগ্নই’ ছিল বাঙালীর জন্য। সেদিন ভেঙ্গে গিয়েছিল ‘অমারাত্রির দুর্গ তোরণ’। বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রগতিশীল ধারার প্রবক্তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে চূর্ণ হয়ে যায় এই উপমহাদেশের যুগ যুগান্তরের চিন্তার অস্থিরতা ও মানসিক অচলায়তন। তাঁর এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের মানুষ যেমন ফিরে পায় সামনে অগ্রসর হওয়ার প্রেরণা, তেমনি তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালীর আশা ও আকাক্সক্ষার প্রতীক। একই সঙ্গে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে অন্ধকারের শক্তির সর্বনাশের সূচনাও হয় তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ভেতর দিয়ে। আজকের এই দিনে বাঙালী ফিরে পায় নবজীবনের আশ্বাস।

এ দেশের মানুষ দীর্ঘকাল থেকেই লড়াই করেছে স্বাধীনতার জন্য। স্বাধীনতা ছিল বাঙালীর দীর্ঘকালের স্বপ্ন। সেই অগ্নিযুগ থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আগে অনেককে জীবন দিতে হয়েছে। সেই বীর শহীদদের রক্তের মিলিত স্রোতধারাই স্বাধীন বাংলাদেশের রূপায়ণে মিলিত শক্তি হয়ে কাজ করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সেই মহান পথপ্রদর্শক, যিনি জাতিকে একটি অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। তাঁর সঠিক ও যোগ্য নেতৃত্বে জাতি পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিন্ন করে বেরিয়ে আসে। স্বাধীনতার ডাক তিনি দিয়েছিলেন ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’, ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো’ এসব অবিস্মরণীয় ও অমোঘ বাক্যের ভেতর দিয়ে বাঙালী দেখতে পায় তার আগামী দিনের দিশা। এর পর ২৫ মার্চ মধ্যরাতে তিনি ঘোষণা করেন স্বাধীনতা।

স্বপ্ন ছিল তাঁর একটি স্বাধীন দেশের। স্বপ্ন ছিল একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের। স্বপ্ন ছিল এদেশের খেটেখাওয়া মেহনতি মানুষের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার। সেই স্বপ্ন নিয়ে সদ্য স্বাধীন দেশে পা রাখা মানুষটি কি ভাবতে পেরেছিলেন, নয় মাসের যুদ্ধে কী তা-ব চালিয়ে গেছে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা? ভাবতে পারেননি। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে মানুষের তখন খাদ্যের নিরাপত্তা নেই। অনেকেরই আশ্রয় নেই। কিন্তু বিশ্বাস ছিল অটুট। মানুষ বিশ্বাস করেছিল তিনি ফিরলে আবার ঘুরে দাঁড়াবে এই দেশ। তাঁর জাদুকরী সাংগঠনিক শক্তিতে তিনি আবার নতুন করে এই দেশটিকে গড়ে নিতে পারবেন। পারবেন সত্যিকারের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে। এই এক অসাধারণ গুণ ছিল তাঁর। মানুষের মনে বিশ্বাসের জন্ম দিতে পারতেন। মানুষ তাঁকে বিশ্বাস করেছিল, তাঁর ওপর নির্ভর করেছিল। তিনি বাঙালীকে একটি স্বাধীন ভূখণ্ড, স্বাধীন সত্তা ও জাতিসত্তার পরিচয় এনে দিয়ে সেই বিশ্বাসের মূল্য দিয়েছিলেন। মানুষ তাঁর দিকে তাকিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছিল, সেই স্বপ্ন পূরণের আশা নিয়েই উপস্থিত হয়েছিল ঢাকার বিমানবন্দরে। বিমানটি বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করার মুহূর্তে উচ্চারিত হয়েছিল ‘জয় বাংলা’ স্লোগান। সেই স্লোগান ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। বাংলার মানুষ জেনেছিল তারা আর অভিভাবকহীন নয়। তাদের অভিভাবক এসেছেন। মুক্ত মানুষ হিসেবে তিনি বাংলার মানুষের দুঃখ ভাগ করে নিতে তাদের মাঝেই ফিরে এসেছেন।

প্রিয় নেতাকে দেখতে কত মানুষ সেদিন একত্রিত হয়েছিল ঢাকায়? সংখ্যায় হিসাব করা যাবে না। বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দানে পৌঁছাতে তাঁর সময় লেগেছিল আড়াই ঘণ্টার বেশি। ঘরে তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী। প্রিয় সন্তানদের সঙ্গে অপেক্ষায় বাবা ও মা। কিন্তু তিনি নিজের বাড়িতে না গিয়ে গেলেন রেসকোর্সে। কেন? উত্তর খুবই সহজ। যে মানুষটির স্বপ্নজুড়ে কেবলই দেশের মানুষ, তিনি মানুষের কাছেই সবার আগে পৌঁছে যেতে চান। তাঁর কাছে দেশের মানুষের চেয়ে বড় কিছু ছিল না কোনদিন। তাই দেশের মাটিতে পা রেখে তিনি প্রথম তাঁর প্রিয় মানুষের সান্নিধ্যই পেতে চেয়েছিলেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেদিন সারা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন স্টেটসম্যানশিপ কাকে বলে! রেসকোর্সে সংক্ষিপ্ত একটি ভাষণ দিয়েছিলেন তিনি।

প্রাণের আবেগমাখা সেই সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, ‘আমি প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয়, আপনাদের ভাই হিসেবে বলছি, যদি দেশবাসী খাবার না পায়, যুবকরা চাকরি বা কাজ না পায়, তাহলে স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে।’ মানবদরদী এক মহান নেতার কী দূরদর্শিতা! ঐ ভাষণে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের বক্তৃতার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেছিলেন, ‘গত ৭ মার্চ আমি এই রেসকোর্সে বলেছিলাম, দুর্গ গড়ে তোলো।’ আজ আবার বলছি, ‘আপনারা একতা বজায় রাখুন।’ তিনি বলেন, ‘আমি বলেছিলাম, বাংলাদেশকে মুক্ত করে ছাড়ব। বাংলাদেশ আজ মুক্ত-স্বাধীন। একজন বাঙালী বেঁচে থাকতেও এই স্বাধীনতা নষ্ট হতে দেব না। বাংলাদেশ ইতিহাসে স্বাধীন দেশরূপেই বেঁচে থাকবে। বাংলাকে দাবিয়ে রাখতে পারে এমন শক্তি কারও নেই।’ সবাইকে শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘বিশ্ববাসীকে আমরা দেখাতে চাই বাঙালীরা কেবল স্বাধীনতার জন্যই আত্মত্যাগ করতে পারে তাই না, তারা শান্তিতেও বাস করতে পারে।’ স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর প্রথম ভাষণে বঙ্গবন্ধু একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের কথা উচ্চারণ করেছিলেন। বলেছিলেন, শান্তির এক বাংলাদেশের কথা। অর্থাৎ আবারও সেই শান্তির স্বপ্ন মানুষের মনে ছড়িয়ে দেয়া। মূলত বঙ্গবন্ধু সেই নেতা, যিনি প্রত্যেক বাঙালীর চোখে স্বাধীনতার স্বপ্ন এঁকে দিতে পেরেছিলেন। এই স্বপ্নসাধ ছিল তাঁরও। আর সে কারণেই দেশে ফিরে আসার পর তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে প্রদত্ত ভাষণে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ভাইয়েরা আমার, লক্ষ মানুষের প্রাণদানের পর আজ আমার দেশ স্বাধীন হয়েছে। আজ আমার জীবনের সাধ পূর্ণ হয়েছে। বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।’ দেশে পা রাখার সেই দিনটিতেই দূরদর্শী বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন, অর্থনৈতিক মুক্তির মধ্যেই সত্যিকারের স্বাধীনতা।

৯ মাস ১৬ দিন কারাবাস শেষে যেদিন দেশে ফিরলেন তিনি, সেদিন প্রথম গেলেন জনগণের কাছে। প্রিয়তমা স্ত্রীর মুখ কি তাঁর মনে পড়েনি? মনে পড়েনি সন্তানদের কথা? বাড়িতে বৃদ্ধ পিতা, বৃদ্ধ মা। কাউকে কি মনে পড়েনি তাঁর? পড়েছে নিশ্চয়। কিন্তু জনগণের নেতা জনগণের কাছেই আগে ফিরেছেন। পাকিস্তানী সামরিক জান্তার কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ফিরে এলেও এ দেশের কিছু মানুষের চক্রান্তে শেষ পর্যন্ত দেশের মাটিতেই জীবন দিতে হয়েছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদের এই মহান নেতাকে। বঙ্গবন্ধু আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর নীতি ও আদর্শ রয়ে গেছে। বাঙালী জাতি বহন করছে তাঁর উত্তরাধিকার, বহন করবে। যতদিন বাংলাদেশ আছে, আছে বাঙালী জাতি, বঙ্গবন্ধুর উত্তারাধিকারও ততদিন থাকবে। আজ ১০ জানুয়ারি। ১৯৭২ সালের এই দিনে পূর্ণতা পেয়েছিল আমাদের স্বাধীনতা।

তাঁর জন্ম শতবর্ষের ক্ষণ গণনার শুরুর এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলা। তাঁর নীতি ও আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে আমরা তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে পারি। গড়ে তুলতে পারি তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা। বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই এগিয়ে যাচ্ছেন। আজ ১০ জানুয়ারির এই ঐতিহাসিক দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা আমরা গড়ে তুলবই।

লেখক : সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়া প্রবাসী লেখক, মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিক

উপরে