দুর্ধর্ষ হীরা চোর, মানুষের সামনেই উধাও করেন কোটি টাকার অলঙ্কার

প্রকাশিত: ১৮-১১-২০২০, সময়: ১৩:৫১ |
Share This

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : একটি শ্রমিক পরিবারে তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। জন্মের পর থেকে অভাব-অনটন দেখে বড় হয়েছেন তিনি। দারিদ্রতার কারণে পড়ালেখাও করতে পারেননি বেশি দূর। তিনিই কিনা হয়ে উঠলেন আন্তর্জাতিক মানের হীরা চোর। তার জীবন যেন একটি থ্রিলার সিনেমার চেয়েও ভয়ঙ্কর।

যে বয়সে মানুষ নিজের জীবন নিয়ে ভাবতে শেখে, সে বয়সেই তিনি কিনা হয়ে উঠলেন হীরা চোর। প্রথম মিশনেই সফল হওয়ার কারণে তার আত্মবিশ্বাস আরো বেড়ে যায়। আর এ কারণেই তিনি পরবর্তীতে বহুবার হীরা চুরি করেছেন। তাও আবার ক্রেতা সেজে সেলসবয়দের চোখ ফাঁকি দিয়ে। তার নাম ডরিস পাইন। তবে বিশ্বের সবাই তাকে চেনে ডায়মন্ড ডরিস নামে।

ডায়মন্ড ডরিস পরিচিতি

দিনটি ছিল ১০ অক্টোবর, ১৯৩০ সাল। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার খনিজ শহর, স্ল্যাব ফর্ক। এক আফ্রিকান-আমেরিকান কয়লা-শ্রমিকের ঘরে তার জন্ম। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট মেয়ে তিনি। ছোটবেলা থেকেই বাবার হাতে মাকে অত্যাচারিত হতে দেখেছে।

একে তো বাবা মায়ের মধ্যে অশান্তি, অন্যদিকে দারিদ্রতা। আর এ কারণে পড়াশোনা বেশি দূর যেতে পারেননি তিনি। কলেজ পেরুনোর আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়।

বয়স যখন ১৫ বছর, ঠিক তখন থেকেই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটা নিল ডরিস পাইন। সেটা যাই হোক, যেভাবেই হোক, নিজের খরচ নিজেকেই যোগাতে হবে।

পরিবারকে সাহায্য করার জন্য চাকরি নিতে হলো নার্সের। দায়িত্ব বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের দেখাশোনা করা। তবে নার্সের কাজ করে আর কত টাকাই পাওয়া যায়। তাছাড়া, এরই মধ্যে একটা বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে তার।

১৩ বছর বয়সেই ডরিস পাইন নিজের দুটো বিশেষত্ব আবিষ্কার করেছে। এক, সে চাইলেই কাউকে খুব সহজেই নিজের মতো করে বুঝিয়ে দিতে পারে। দুই, তার চেহারাও আলাদা করে মানুষ মনে রাখে না।

প্রথম চুরির অবিশ্বাস্য কাহিনী

১৯৫২ সালে ২৩ বছর বয়সে এই দুটি বিশেষত্বকে পুঁজি করে প্রথম চুরি করেন ডরিস। বেশ কিছু হীরার আংটি ট্রায়াল দিয়ে দেখে সে। একাধিক আংটিকে একই সময় বিভিন্ন আঙুলে পরে দেখতে থাকেন তিনি। মুহূর্তেই আঙুল বদল হয় সেইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারা মুখও নড়ে।

তারপর সেলসম্যানকে বোকা বানিয়ে ২০ হাজার ডলারের একটি আংটি হাতে করে সে বেরিয়ে আসে পিটার্সবার্গের একটা অলঙ্কারের দোকান থেকে। সেদিন রাতে দুশ্চিন্তা ও ভয়ে সারারাত স্থানীয় গ্রেহাউন্ড স্টেশনের গণশৌচাগারে কাটিয়ে দিয়েছিল সে।

সকালে উঠে ভেবেছিল, এভাবে সম্ভব না। আংটি ফিরিয়ে দেয়ার জন্য দোকানের দিকে দ্রুত চলে আসে সে। তবে গিয়ে হাজির হয় অলঙ্কার বিক্রি হয় এরকম এক রিসেল স্টোরে। আংটিটি বিক্রি করে দেয় তৎকালীন সাত হাজার ডলারে। যার বর্তমান অর্থমূল্য দাঁড়াবে প্রায় ৬৫ হাজার ডলার! এভাবেই হাতেখড়ি হয় ডায়মন্ড ডরিসের। জন্ম নেয় এক হীরা চোরের।

পেশা যখন হীরা চোর

১৯৫০ এর দশকে হীরার অলঙ্কার চুরিকেই একমাত্র পেশা হিসেবে বেছে নেয় ডরিস। এরপর ছেড়ে দেয় নার্সের চাকরি। পুরো উত্তর আমেরিকা ঘুরে দেখে ডরিস। লস অ্যাঞ্জেলস থেকে মন্ট্রিয়েল, কানাডাসহ প্রতিটি এলাকা সময় নিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন তিনি।

নতুন সব পরিকল্পনা ও অনুশীলন করে হাত পাকিয়ে নেয় সে। তিনি ভাবতে থাকেন, পাঁচটির বেশি আংটি যদি পরে দেখার জন্য কোনোভাবে সেলসম্যানকে দিয়ে বের করানো যায় তাহলেই কেল্লাফতে।

ডরিস পাইনের ভাষ্যমতে, এই ব্যাপারে পুলিশকে বিস্তারিত রিপোর্ট করতে বিব্রতবোধ করত দোকানিরা। কারণ এসব জানালে পুলিশ রিপোর্টে দোকানির দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কথা উঠে আসত। এরপর এই রিপোর্ট চলে যেত ইনস্যুরেন্স কোম্পানির কাছে। ফলে ভবিষ্যতে আরো বড় কোনো চুরি হলে ইনস্যুরেন্সের ঝামেলায় পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।

এই কারণে আমাকে অনেক অনুশীলন করতে হয়েছে। যাতে চুরির পর ওদের নিজেদেরকেই দায়ী মনে হয়। এভাবে প্রায় দেড় দশক সফলভাবে চুরি চালিয়ে যান। এরপর ১৯৬৬ সালে প্রথম আইনের নজরে পড়ে যায় ডরিস। তবে সে যাত্রা বেঁচে যায় আরেক ক্রিমিনালের কল্যাণে।

১৯৫৭ সালের কথা। ক্রিমিনাল আন্ডারগ্রাউন্ডে যুক্ত এক ইসরায়েলির সঙ্গে পরিচয় হয় ডরিসের। লোকটাকে সবাই বেইব নামে ডাকত। তার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে প্রেম হয়ে যায়। তারপর ডরিস জানতে পারে, তার আসল নাম হ্যারল্ড রবার্ট ব্রনফিল্ড।

যথেষ্ট নামডাক ছিল মানুষটার। পরিচয় ছিল শক্তিশালী বেশ কয়েকজন আইনজীবীর সঙ্গে। অর্থাৎ যেকোনো বিপদে ডরিসকে বাঁচানোর সামর্থ্য ছিল হ্যারল্ডের। ১৯৬৬ সালে ৩০ নভেম্বর, বুধবার। ফিডেলিটি ফিলাডেলফিয়া ট্রাস্ট বিল্ডিংয়ের এক হীরার দোকান থেকে দুটো হীরার আংটি চুরি করে ডরিস ও হ্যারল্ড।

সে সময় হ্যারল্ড নিজেকে ডরিসের আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দেয়। তার বিধবা মক্কেল স্বামীর কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে বিশাল অঙ্কের টাকা পেয়েছে। এই টাকা দিয়ে নারীরা এখন বেশ কিছু দামি আংটি কিনে রাখতে চায়।

তারা বলল, শুধু ডিসপ্লেতে সাজানো আংটিগুলোই না। আরো দামি আংটি যেগুলো আছে সেগুলোও দেখান। দোকানি ভেতরে যায় দামি আংটি আনার জন্য। এসে দেখে, বিধবা ও তার উকিল চলে গেছে। নেই হয়ে গেছে দুটো আংটিও।

দোকানির দেয়া তথ্যানুযায়ী, পুলিশ ডরিস ও হ্যারল্ডকে শনাক্ত করে ফেলে। বের হয় গ্রেফতারি পরোয়ানা। এই সূত্র ধরে পুলিশ একসময় ঠিকই খুঁজে বের করে ফেলে তাদের দুইজনকে। শেষপর্যন্ত হ্যারল্ডের এক আইনজীবীর পরামর্শে দোষ স্বীকার করে নেয় ডরিস।

তখন তাদের আর জেলে যেতে হয়নি। তবে বড় একটা মাশুল ঠিকই দিতে হয়েছিল। পত্রিকায় ছবি ছাপা হয়েছিল ডরিস পাইনের। ফলে বড় শহরগুলোতে চুরি করা একরকম অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। দুই বছর পর, অর্থাৎ ১৯৬৮ সালে জটিলতা আরও বেড়ে যায়। মারা যায় বেইব নামক হ্যারল্ড ব্রনফোল্ড।

চোর হিসেবে নাম রটে গেল

ডরিস বুঝতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রে তার আর জায়গা নেই। এরপর সিদ্ধান্ত নেয়, ইউরোপ যাবে সে। এভাবেই আন্তর্জাতিক এক অপরাধীতে পরিণত হয় ডরিস পাইন। বেশ কিছু বড়সড় চুরি করে পার পেয়ে গেছে ডরিস। নিজের এবং মায়ের জন্য কিনেছে একাধিক বিলাসবহুল বাড়ি।

১৯৬৬ সালে ক্লিভল্যান্ডে চার বেডরুমের একটা বাড়ি ছিল তার। তখনকার সময়ের অর্থমূল্য অনুযায়ী এ বাড়ির দাম ছিল ২০ হাজার ডলার। তবে পার পেয়ে যাওয়া চুরিগুলো নয়। বরং ধরা পড়ে যাওয়া চুরিগুলোই বিখ্যাত করে তোলে ডরিস পাইনকে।

১৯৭৪ সালে এসব শুরু হয়, ফ্রান্সের মন্টে কার্লোতে। বিখ্যাত ফরাসি কোম্পানি কার্টায়ারের সাড়ে ১০ ক্যারেটের হীরা বসানো একটি অলঙ্কার চুরি করে সে। ছকবাঁধা নিয়মে দোকানিকে ধাঁধায় ফেলে বেরিয়ে আসে অর্ধ মিলিয়ন ডলারের অলঙ্কারটি নিয়ে।

তবে পালাতে পারেনি। পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যায় মন্টে কার্লো থেকে ফিরতি বিমানে ওঠার আগেই। ডরিসের ভাষ্যমতে, তার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল চুরি করার পর জামা পাল্টাতে ভুলে যাওয়া। নয় মাস কারাবাসে ছিলেন ডরিস পাইন। তার মুক্তি পাওয়ার কারণ ছিল পুলিশ নয় মাসেও চুরি যাওয়া অলঙ্কারটি খুঁজে পায়নি।

এরপর তিনি আবার ধরা পড়েন ১৯৮০ সালে স্থান জুরিখে। সব ঠিকঠাক করে জুরিখে পা দেয়ার পর নিজের জন্য ঠিক করে রাখা সবচেয়ে বড় অলিখিত নিয়মটি ভাঙে পাইন। ক্যাব ড্রাইভারের সঙ্গে কথায় কথায় গিয়ে হাজির হয় একটি ক্লাবে। মদ খেয়ে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে সে।

পুলিশ যখন তাকে গ্রেফতার করে, তখন সে ক্লাবে মাতাল অবস্থায় নাচছে। সেবার তাকে গ্রেফতার করে ফ্রান্স দূতাবাসে নিয়ে যাওয়ার জন্য রওনা হন। হঠাৎ সে বাথরুমে যাওয়ার কথা বলে। তারপর সুযোগ বুঝে পালিয়ে আসে ডরিস।

এরপর টের পায়, পকেটে একটা দামি রোলেক্স ঘড়ি পড়ে আছে। কখন যে চুরি করেছে, নিজেও জানে না। শেষপর্যন্ত অবশ্য পুলিশ ঠিকই গ্রেফতার করেছিল তাকে। তবে অল্প কিছুদিন জেলে থাকার পর আবারো সে ছাড়া পেয়ে যায়।

একইভাবে ৫৭ হাজার ডলার দামের একটি আংটি চুরি করে ধরা পড়ে ১৯৯৯ সালে ডরিস পাইন। এরপর ১২ বছরের জেল হয় তার। তবে এবারের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর। এরপর সে আবারো ছাড়া পেয়ে যায়। ২০১০ সালে আবারো এক হাজার ৩০০ ডলারের একটি ব্লুবেরি ট্রেঞ্চ কোট চুরির দায়ে ধরা পড়ে সে।

২০১৩ সালের ২৯ অক্টোবর ২২ হাজার ৫০০ ডলার মূল্যের একটি হীরার আংটি চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েন পাইন। সে সময় তার বয়স ছিল ৮৩ বছর! মামলার রায় হয় ২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল। দুই বছরের কারাদণ্ড এবং দুই বছর পে-রোল দেয়া হয় তাকে।

তবে এমনই তার ভাগ্য, মাত্র দুই মাসের মাথায় ওভারক্রাউডিং, মানে জেলে বন্দীর সংখ্যা অতিরিক্ত হয়ে যাওয়ায় ছাড়া পেয়ে যায় সে। নির্দেশ দেয়া হয় অলঙ্কারের দোকান থেকে দূরে থাকতে। হীরার অলঙ্কার চুরি যার নেশা, অলঙ্কারের দোকান থেকে সে দূরে থাকবে, এমনটা আশা করা বোকামি।

২০১৫ সালের জুলাই মাসে ৩৩ হাজার ডলারের একটা আংটি চুরি করে সে। প্রমাণের অভাবে তাকে গ্রেফতার করা যায়নি। ওই বছরের ২৩শে অক্টোবর। চুরির মাল, মাত্র ৬৯০ ডলার মূল্যের কানের দুল।

লিখেছেন বই, সাক্ষাৎকারও দিয়েছেন গণমাধ্যমে

ডরিস পাইন নিজের চুরির ব্যাপারে একাধিকবার খোলাখুলিভাবে আলোচনা করেছেন। তিনি একটা বই লিখেছে নিজেকে নিয়ে। ‘ডায়মন্ড ডরিস: দ্য ট্রু স্টোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’স মোস্ট নটোরিয়াস জুয়েল থিফ’ নামের বইটি ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয়।

প্রকাশক ছিলেন বিখ্যাত হার্পার কলিন্স। বইতে ডরিসের সহকারী লেখক ছিলেন জেলডা লকহার্ট। এই বইতেই বিস্তারিত জানা যায় ডরিসের জীবনের কথা। জানা যায়, চুরি করে পার পেয়ে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ডরিসের ব্যক্তিত্ব। ডরিসের এক ভিক্টিম, রাজু মেহতা বলছিলেন, কাপড়-চোপড়, ব্যক্তিত্ব, সবমিলিয়ে মানুষটা এত ক্লাসি। কী চমৎকারভাবে আমার সঙ্গে কথা বলছিল।

তারপর আস্তে করে আমার সামনে দিয়ে চুরির মাল নিয়ে বেরিয়ে গেল। এজন্য তার প্রশংসা করতেই হবে। নিজের কাজে সে দুর্দান্ত। এর আগে, ২০১৩ সালে ডরিস পাইনকে নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি ফিল্মও বানানো হয়েছে। দ্য লাইফ অ্যান্ড ক্রাইম অব ডরিস পাইন। এতে ডরিস পাইনের একাধিক সাক্ষাৎকার আছে। শেষ সাক্ষাৎকারটি যখন নেয়া হয়, ডরিস তখন জেলে!

৯০ বছর বয়স এখন ডরিস পাইনের। সর্বশেষ, ২০১৭ সালে ওয়ালমার্ট থেকে ৮৬ ডলার মূল্যের জিনিস চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে সে। যে গার্ড তাকে ধরেছিল, তার ভাষ্যমতে, কিছু জিনিস পাইন নিজের পার্সে ঢুকিয়ে রেখে অতঃপর বাকিগুলো কার্টে রেখে দেয় নেয়ার জন্য। এরপর কার্টের জিনিসগুলোর টাকা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় গার্ড তাকে ধরতে বাধ্য হয়। পার্স চেক করতেই বেরিয়ে আসে চুরির জিনিস।

  • 27
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a comment

উপরে