ধর্ষণ ঠেকাতে শিশুদের আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ

প্রকাশিত: ১৮-১০-২০২০, সময়: ১৩:৫৬ |
Share This

নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণ, নারী নির্যাতন এবং শিশু নিপীড়নের ঘটনা যখন বেড়েই চলেছে ঠিক সে সময় উত্তরের চারটি জেলায় কন্যা শিশুদের আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে কয়েকটি উন্নয়ন সংস্থা।ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থায়নে এবং নেটজ বাংলাদেশের কারিগরি সহায়তায় চাপাঁইনবাবগজ্ঞ, নওগাঁ, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের মোট ৩২টি স্কুলে কন্যা শিশুদের আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ চলছে।

সরজমিনে চারটি জেলার এই আত্মরক্ষামূলক কর্মসূচি ঘুরে দেখা যায়, এই প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর স্কুল পড়ুয়া কন্যাশিশুদের যেমন বেড়েছে আত্মবিশ্বাস ঠিক তেমনি নিজেদের রক্ষার জন্য প্রস্তুতি।

নাচলের দুলাহার উচ্চ বিদ্যালয়ের সানোয়ারা সাহস করে কারো সাথে কথা বলতে পারতো না।বাইরে একা বের হতে ভয় পেতো।সে সানোয়ারা এখন কারো সাথে কথা বলতে বা বাইরে একা বের হতে ভয় পায় না।তার জীবনে যেনো এক নতুন সকাল শুরু হয়েছে আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে।

সানোয়ারা বলেন, এখন আমি আর কোনো কিছু ভয় করি না।এখন নিজেকে যেকোনো বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবো এবং অন্যকেও রক্ষা করতে পারবো।

বৃটিশ শাসকদের অত্যাচারে নাচলের রানী ইলামিত্র যেমন এগিয়ে এসেছিলেন তেমনি নাচোলসহ আশেপাশের এলাকার ৩২ টি স্কুলের শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছেন নির্যাতন ও নিপীড়নের বিপক্ষে এই প্রশিক্ষণে।

শুধু সানোয়ারা নয় ,এই স্কুলে আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণ নিয়ে নির্যাতনের প্রতিবাদ শুরু করেছেন অনেক শিক্ষার্থী।বাল্যবিয়ে, যৌন নিপীড়ন, লিঙ্গ বৈষম্য, অপুষ্টি, কন্যাশিশুর প্রতি অসচেতনতা যখন চারিদিকে ঘিরে ধরেছে ঠিক তখনি প্রত্যন্ত অঞ্চলের কন্যা শিশুদের নতুন জীবনের আলোর পথ দেখাতে শুরু করেছে এই আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ।

মাহবুব হোসেন জানান, আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মেয়েরা আর ভীত নয়।তারা ভয়কে জয় করেছে। এখন আর মুখ লুকিয়ে না থেকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে। অভিভাবকরাও বুঝতে পারছেন মেয়েরা কোনো অংশে কম নয়।মেয়েরা যে যৌন হয়রানির শিকার হয় তা কমানোর জন্যই মূলত এই প্রশিক্ষণ।

আগামীতে এই প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন,এখন চারটি জেলায় এই কর্মসূচি চলছে। ভবিষ্যতে এর সংখ্যা আরো বাড়াতে চাই । দেশের বিভিন্ন জায়গায় আমরা এই প্রশিক্ষণ ছড়িয়ে দিতে চাই।উত্তর পশ্চিমের স্কুলগুলোতে চলা এই প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন প্রায় ছয় শত চল্লিশ জন কিশোরী।

বালিয়াডাঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী সুমাইয়া খাতুন বলেন, আগে আমি জানতাম না নিজেকে রক্ষা করতে কিন্তু আজ আমি পরিপূর্ণভাবে প্রশিক্ষিত হয়েছি।রাস্তায় চলাফেরার সময় আমরা মেয়েরা নানা রকম নিপীড়ন ও হয়রানীর শিকার হয় ।সমাজে প্রতিনিয়ত ছোট হয়।কিন্তু আজ আমাদের দেখে সবাই বুঝতে পারছে আমরা একটা প্রশিক্ষণ নিয়েছি ।আমরা এখন নিজেকে রক্ষা করতে পারবো।সুতরাং আমি আমার জীবনের একটা নতুন অধ্যায় শুরু করেছি।

অভিভাবক চম্পা বেগম জানান, তাদের ভিতরে যে একটা জড়তা ছিলো এই আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণ পেয়ে তাদের আর জড়তা নেই। তারা কথা বলতে শিখেছে ,তারা প্রতিবাদ করা শিখেছে এবং বখাটে ছেলেদের হাত থেকে তারা নিজেকে রক্ষা করার সুয়োগ পেয়েছে।

নাচোল উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাবিহা সুলতানা বলেন, সরকারীভাবে আমরা যেখানে পৌছাতে পারছি না ডাসকো সেখানে কিছুটা অংশ হলেও কভার করছে।তারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করার সুবাদে সেসব জায়গাগুলোতে পৌছাচ্ছে এবং বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে ভূমিকা রাখছে।ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থায়নে ও নেটস বাংলাদেশের কারিগরি সহায়তায় এই প্রশিক্ষণ নিয়ে সানোয়ারার মত অনেকেই নিজের পাড়াপ্রতিবেশিকে শেখাচ্ছে আত্মরক্ষার এই প্রশিক্ষণ।

আত্মরক্ষার প্রশিক্ষক সম্পা আক্তার বলেন, সকল ধরনের অন্যায় ও নির্যাতনের হাত থেকে বাচঁতে আমরা এদের প্রস্তুত করছি।এরাই আগামীর সবুজ বাংলাদেশ।আর এভাবেই ছড়িয়ে পড়ছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্কুল পড়ুয়া কিশোরীদের অদম্য সাহস আর উঠে আসা সব ধরনের নির্যাতন নিপীড়নের বিরুদ্ধে আওয়াজ।

নেটজ বাংলাদেশের কর্মকর্তা সারা খাতুন বলেন,এই কর্মসূচির ফলে নারীরা নিজেদের আত্মবিশ্বাস ও নিজেদের রক্ষার পাশাপাশি কন্যা শিশুদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখাচ্ছে।উত্তরে চারটি জেলায় আলো ফুটতে শুরু করেছে। এতে করে সামগ্রিক উন্নয়নে এগিয়ে যাবে, তবে এই কর্মসূচি পুরো বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেবার জন্য সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।

এই আত্মরক্ষামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নকারী সংগঠন ডাসকো ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ আকরাম জানান,বাংলাদেশের অন্যতম বাল্যবিবাহ ও নারী নির্যাতন প্রবণ এলাকা চাপাঁইনবাবগঞ্জের যে সমস্ত স্কুলে এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে সে সমস্ত এলাকার সামগ্রিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।বিশেষ করে এই সব স্কুল পড়ুয়া কিশোরীরা এখন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পার করে নিজের পায়ে দাঁড়াবার স্বপ্ন দেখছে।

 

  • 117
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a comment

উপরে