রেল সেতুতে পাঁচ তারকা ট্রেন হোটেল!

প্রকাশিত: ১৮-০৬-২০২০, সময়: ১২:৩৬ |
Share This

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : ঢালু পাহাড়ের গায়ে হোটেল রয়েছে, এমনকি পানির নিচেও আছে পাঁচ তারকা হোটেল। তবে কখনো কি শুনেছেন, একটি রেল সেতুর উপরে গড়ে উঠেছে ট্রেন হোটেল? অভিনব কায়দার এই ট্রেন হোটেলটি পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয় স্থান।

দক্ষিণ আফ্রিকা এবং মোজাম্বিক সীমান্তের কোমাটিপোর্টে বহু বছর পূর্বে ট্রেন চলাচল করত। ক্রুগার ন্যাশনাল পার্কের মধ্য দিয়ে এই ট্রেনে তাজেনিন শহর পর্যন্ত ভ্রমণ করা যেত। এই পথে সাবি নদীর উপর একটি রেল সেতু আছে। অবাক করা বিষয় হলো, রেল সেতুটির উপর রয়েছে একটি হোটেল।

প্রায় ১০০ বছর পূর্বে পরিত্যক্ত এই সেলাতি রেলওয়ের সাবি সেতুর উপর ট্রেন হোটেলটি নির্মিত হয়। সম্প্রতি এটি বিলাসবহুল হোটেল হিসেবে গড়ে উঠেছে। যেখানে ২৪টি ক্যারিজ রুম এবং ৭টি বিলাসবহুল ব্রিজ হাউজ রুমের ব্যবস্থা আছে। এখান থেকে সাবি নদী এবং ক্রুগার ন্যাশনাল পার্কের অপূর্ব দৃশ্য উপভোগে করা যায়।

সেলাতি রেলওয়ের এক দীর্ঘ ইতিহাস আছে। ক্রুগার জাতীয় উদ্যানের সঙ্গে এটি মিশে আছে। ১৮৯০ এর দশকের শুরুতে দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন ট্রান্সভাল প্রদেশের উত্তর পূর্ব অঞ্চলে স্বর্ণসহ অন্যান্য মূল্যবান বস্তুর খনির সন্ধান পাওয়া যায়। এই সব মূল্যবান খনিজ দ্রব্য বহনের জন্য ১৮৯২ সালে সেলাতি রেলওয়ের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল।

পরিকল্পনা করা হয়, ট্রান্সভালের খনি থেকে দ্রব্যগুলো ট্রেনে করে কোমাটিপোর্টে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখান থেকে সেলাতি রেলওয়ের সাহায্যে দোলাগোয়া উপসাগরে নিয়ে যাওয়া হবে। সেসময় সেলাতি রেলওয়ে নির্মাণ করা খুবই কঠিন কাজ ছিল। কারণ ওই স্থানে কাজ করার সময় শ্রমিকদের বিভিন্ন প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হত।

গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগব্যাধি, হিংস্র প্রাণীর আক্রমণ এবং সন্ত্রাসী হামলার শিকারের সম্ভাবনা ছিল। এসব কারণেই এখানে কাজ করতে কৃষ্ণাঙ্গ এবং ব্রিটিশ সেনা বাহিনী থেকে পলাতক সদস্যদের কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। শ্রমিকদের হরিণের মাংস এবং অন্যান্য সুস্বাদু খাবারসহ প্রচুর মদ সরবরাহ করা হত। যে কারণে তারা উৎসাহ নিয়েই কাজ করত।

এমন কি মাত্র দুই বছরে ৮০ কিলোমিটার লাইন বসানো হয়। তবে দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অনিয়মের কারণে প্রকল্পটি অসমাপ্ত অবস্থায় কাজ বন্ধ হয়ে যায়। কাজ বন্ধ হওয়ার পূর্বে রেলওয়েটির কাজ স্কুকুজার সাবি ব্রিজ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছিল। এই সময়ের মধ্যে শ্রমিকদের খাওয়ানোর জন্য কয়েক হাজার প্রাণী গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল।

প্রায় ১৫ বছর পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকার পর সেলাতি রেলওয়ে নির্মাণ প্রকল্প পুনরায় শুরু হয়। ১৯১২ সালে তাজেনিন পর্যন্ত রেল লাইনের কাজ সমাপ্ত হয়। এরপর বহু বছর রেল লাইনটি ব্যবহৃত হয়েছিল। সেলাতির খনিগুলো পরিত্যক্ত হওয়ার পর রেল লাইনটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার সাবি নেচার রিজার্ভের প্রথম ওয়ার্ডেন জেমস স্টিভেনসন হ্যামিল্টন পর্যটকদের ব্যবহারের জন্য রেল পথটি পুনর্নির্মাণের ধারণা প্রবর্তন করেন।

তখন ক্রুগার উদ্যান ন্যাশনাল পার্ক ছিল না। শুধু গেম রিজার্ভ জোন ছিল। জেমস স্টিভেনসন এই অঞ্চলটি সংরক্ষিত বন্য প্রাণীর অভায়ারণ্য হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব করেন। সাবি গেম রিসার্ভ ১৯২৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম ন্যাশনাল পার্কে পরিণত হয়। নাম দেয়া হয় ক্রুগার ন্যাশনাল পার্ক। সেলাতি রেলপথটি ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত সচল থাকার পর পরিত্যক্ত হয়।

বর্তমানে পর্যটকদের ভ্রমণের ব্যবস্থা থাকায় রেলওয়েটি পুনরায় প্রাণ ফিরে পেয়েছে। সেখানে অনেক পর্যটকদের আনাগোনা হয়। এই রেল সেতুর উপরে ট্রেনের কামরার হোটেলে বসে পর্যটকরা চারপাশের অনিন্দ্য সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন। নদী, বন, বিভিন্ন প্রজাতির পাখিসহ বন্য প্রাণী সব উপভোগ করেন সৌন্দর্যপিপাসুরা।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে