অভাবের বাধ ভেঙ্গে বড় হওয়ার স্বপ্নে বিভোর যারা

প্রকাশিত: ০১-০৬-২০২০, সময়: ২১:৪১ |
Share This

নিজস্ব প্রতিবেদক, বাঘা : নানা প্রতিকুলতার মধ্যেও ওরা এগিয়ে গেছে সামনে। তাই ক্ষুধার কষ্ট, আর্থিক অনটন দারিদ্র্যের দৈন্য দমাতে পারেনি ওদের। অভাব অনটনের সংসারে একমাত্র ব্রত ছিল পড়া-শোনা। পণ ছিল যে করেই হোক এস.এস.সিতে ভালো ফল করবেই। তাই সব বাধা পেরিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে পৌঁছে গেছে সাফল্যর শিখরে। তবে চরম দারিদ্র্যের কারণে নিজেদের ভবিষৎ নিয়ে শঙ্কিত ওরা।

অনিক ইসলাম
রাত জেগে লেখা পড়ার সময় ঘুম হওয়ার ভয়ে অনেক সময় হোমিওপ্যাথি ঔষধ সেবন করেছে। অদম্য ইচ্ছার কারণে ছুটির দিনে বাবার সাথে শ্রমিকের কাজ আর টিউশনি করতে হয়েছে তাকে। এবারের এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে উপজেলার বেলগাছি গ্রামের দিন মজুর সাইনাল উদ্দীনের ছেলে অনিক ইসলাম। ইসলামী একাডেমী উচ্চ বিদ্যালয়, কারিগরি ও কৃষি কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল অনিক।

অষ্টম শ্রেণীতে পড়া শোনার সময় তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়িয়ে নিজের পড়ার খরচ চালিয়েছে। এভাবেই পড়াশুনা করে অষ্টম শ্রেণীতে গোল্ডেন এ প্লাস ও পঞ্চম শ্রেণীতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিল। বাবার সম্বল বলতে তার দাদার বাড়ি ভিটার ৫/৬ কাঠা জমি। আর্থিক দৈন্যতার কারণে নিজের দায়িত্ব নিজে নিয়েই শুরু করে লেখা-পড়া। হাঁস মুরগি পালন করে খরচ যুগিয়েছে গৃহিনী মা ময়না বেগম। দুই ভাইয়ের মধ্যে অনিক বড়। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন অনিকের।

আব্দুল্লাহ আল মুসা
বিজ্ঞান বিভাগ থেকে গোন্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে মুসা। ইসলামী একাডেমী উচ্চ বিদ্যালয়, কারিগরি ও কৃষি কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল আব্দুল্লাহ আল মুসা।

মা লাভলি বেগম জানান, কখনো কখনো তার বাবা দু’একটি টাকা হাতে ধরিয়ে বলতেন কিছু কিনে খেয়ে নিও। ওই টাকা খরচ না করে যক্ষের মতো আগলে রাখতো মুসা। এভাবে টাকা জমিয়ে খাতা ও কলম কিনতো সে। এক ছেলে এক মেয়ের মধ্যে ছোট মুসা। আর্থিক দৈন্যতার কারণে বড় মেয়ে ইসরাত জাহানকে আই পাশ করার পর বিয়ে দিয়েছেন। হাঁস মুরগি পালন করে দুইজনের লেখা পড়ার খরচ যুগিয়েছেন।

মুসা জানায়, অস্বচ্ছল সংসারে সুযোগ বুঝে ছুটির দিনে বাবার সাথে মাঠে শ্রমিকের কাজও করতে হয়েছে। বাড়ীতে হাতের কাজ করে মা যে টাকা পেয়েছে তাই দিয়ে লেখা পড়ার খরচ চালিয়েছি। উচ্চ শিক্ষা নিয়ে চিকিৎসক হওয়ার ইচ্ছা তার। সে বাঘা পৌর সভার মর্শিদপুর গ্রামের দিনমজুর ইনছার আলীর ছেলে। সম্বল বলতে বাড়ি ভিটার সাড়ে ৭কাঠা জমি।

মুসার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ জানান, মেধার কারণে স্কুল থেকে তাদের সব ধরনের সুযোগ সুবিধা দিয়েছেন। তার প্রতিষ্ঠান থেকে ১২৩ জন পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে ১২২জন। এর মধ্যে গোল্ডেন এ প্লাসসহ জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৪ জন। উপজেলায় প্রথম স্থানে আছে তার প্রতিষ্ঠান।

রিশা খাতুন
নানান প্রতিকুলতার মধ্যেও শুধু এসএসসিতেই নয় অষ্টম শ্রেণীতেও গোল্ডেন এপ্লাস ও পঞ্চম শ্রেণীতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিল রিশা। নিজের আগ্রহ, মা-বাবার অনুপ্রেরণা আর শিক্ষকের সহযোগিতায় ফলাফল ভালো করে এবার উপজেলার দাদপুর গড়গড়ি ইচ্চ বিদ্যালয় থেকে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে। অভাবের বাধ ভেঙ্গে সাফল্যের চ্যালেঞ্জ এখন সামনের দিকে। নিজেকে আলোকিত করে হাঁসি ফুটিয়েছে মা-বাবার মুখে। দুঃচিন্তা এখন ভালো কলেজে ভর্তি নিয়ে।

কৃষক পরিবারের গৃহিনী মা নুরুননাহার জানান, জায়গা জমি বেশি নাই। তাদের চার সদস্যের সংসার চলে স্বামীর উপার্জনের টাকা দিয়ে। রিশার পড়া লেখার জন্য বাড়তি কোন টাকা দিতে পারেনি তার বাবা। এজন্য আমাকে গরু পালন আর হাতের কাজ করে পড়া লেখার খরচ যোগাতে হয়েছে। সুযোগ বুঝে রিশা নিজেও টিউশনি করেছে। এর ফাঁকে আমার কাজেও সহযোগিতা করতে হয়েছে রিশাকে। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে মেয়ের পড়া লেখা নিয়ে শঙ্কিত মা-বাবা। তবে নিজের ইচ্ছা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে চিকিৎসক হতে চাই রিশা। তার ছোট ভাই চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র।

প্রধান শিক্ষক এমদাদুলল হক বলেন, শিক্ষক আর শিক্ষার্থীদের আগ্রহে ফলাফল ভালো করেছে তার প্রতিষ্ঠান।

সৌরভ
খানপুর জেপি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এবার গোন্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে। সে উপজেলার চাদপুর গ্রামের দিন মজুর আমিরুল ইসলামের ছেলে। অষ্টম ও পঞ্চম শ্রেণীতেও গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছিল।

মা অমেনা বেগম জানান, কোন কোন দিন সকালে নাস্তা করার মতো খাবার থাকেনা ঘরে। এ জন্য বহুবার তাকে না খেয়ে স্কুলে যেতে হয়েছে। নিরূপায় হয়ে কোন কোন সময় পাশের বাড়ীতে গৃহস্থালীর কাজ করতে হয়েছে তাকে। অর্থাভাবে লেখা পড়া বন্ধ করে মেজো মেয়ে লুবনাকে বিয়ে দিয়েছেন এসএসসি পাশের পর। নানা দুর্ভোগের মধ্যেও পড়াশোনা থেকে পিছপা হয়নি সৌরভ।

সৌরভের মা অভিভূত হয়ে কষ্টের এসব কথা জানিয়ে বলেন, দরিদ্র পিতার বোঝা হলেও ছোট বেলা থেকে তার গর্ভের ছোট ছেলে সৌরভের লেখা পড়ার ঝোক ছিল অনেক বেশী। কিন্তু তার বাবা লেখা পড়ার জন্য কোন টাকা পয়সা দেইনি। তার বাবার উপার্জনের টাকা দিয়ে কোন রকমে সংসার চলে। বিদ্যুৎ চলে গেলে অর্থাভাবে বাড়তি আলো জ্বালাতে পারেননি। বাড়ি ভিটার ৬/৭ কাঠা জমিই তাদের সম্বল। ভবিষৎতে চিকিৎসক হওয়ার কথা জানান সৌরভ।

সৌরভের প্রধান শিক্ষক হাবিবুর রহমান জানান, ফলাফল ভালো করে শুধু মা-বাবারই নয়, প্রতিষ্ঠানেও মুখ উজ্জল করেছে। তবে প্রবল ইচ্ছা শক্তি থাকলেও ভবিষৎতে অর্থের কাছে হার মানতে পারে হত দরিদ্র মেধাবীরা।

শিক্ষার্থীরা জানায়, দরিদ্র মেধাবী বলে বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সব সময় সদয় ছিলেন তাদের প্রতি। এখন তাদের পড়া লেখার সবচেয়ে বড় বাধা আর্থিক অসচ্ছলতা।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে