ধরন বদলে আরও ভয়ঙ্কর ইয়াবা

প্রকাশিত: অক্টোবর ৩০, ২০২১; সময়: ১১:০৩ am |

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলো ধ্বংস করে দেওয়ার মতো রাসায়নিক ‘এমফিটামিন’ এবং ‘ক্যাফেইন’ মিশ্রণে ইয়াবা তৈরি হলেও এখন হিরোইনের মতো মাদকের উপাদন দিয়ে তৈরি হচ্ছে ইয়াবা।

এমনকি ভয়ংকর মাদক আইসের কিছু উপকরণ মিশিয়ে ইয়াবার ‘নতুন ভার্সন’ বাজারজাত করার চেষ্টা চলছে বলে খবর পাওয়া গেছে। সম্প্রতি ইয়াবার বেশ কয়েকটি চালান উদ্ধারের পর রাসায়নিক পরীক্ষাগারে এ ধরনের ইয়াবার সন্ধান মিলেছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

মাদকের ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জিরো টলারেন্স থাকলেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না মাদক পাচার ও সেবন রোধ। বর্তমানে শুধু ইয়াবা নয়, বিভিন্ন মাদকে নতুন নতুন ক্ষতিকর উপাদান যুক্ত হচ্ছে বলেও জানিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন বাজারে শতাধিক প্রকারের ইয়াবা পাওয়া যাচ্ছে। সাদা টিস্যু, পেস্ট, পেঁপে, কমলা, গারো লাল, হলুদ, মাটি, হালকা লাল রঙের আট থেকে দশটি রঙের ইয়াবা বাজারজাত করা হচ্ছে। ইয়াবাতে বিভিন্ন ফলের ফ্লেভারও যুক্ত করা হচ্ছে।

সিআইডির রসায়ন পরীক্ষাগারের প্রধান কর্মকর্তা দীলিপ কুমার জানিয়েছেন, গত কয়েক দিনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন ধরনের ইয়াবার নমুনা পাঠানো হয়। সেখানে দেখা গেছে আগে ইয়াবায় মূল উপাদান হিসাবে ম্যাথামফিটামিন ও ক্যাফেইন ব্যবহার করা হতো। কিন্তু সম্প্রতি যেসব নমুনা পাঠানো হচ্ছে সেখানে রয়েছে মিথাইল, এমফিটামিন ও হেরোইনের উপাদান। এ ধরনের উপাদান ব্যবহারের কারণে মাদকসেবীরা তা সেবনের পর দ্রুত ঘুমিয়ে যায়। বেশি সেবনে মৃত্যুর ঝুঁকিও রয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবদুস সবুর মন্ডল বলেন, ‘ইয়াবার উপাদান বদলের যে কথা বলা হচ্ছে তা আমাদের কাছেও তথ্য রয়েছে। আমরা এ ধরনের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি। শুধু ইয়াবা নয়, বিভিন্ন মাদকে নতুন নতুন ক্ষতিকর উপাদান যুক্ত হচ্ছে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগে ইয়াবা সেবনের পর নেশাগ্রস্তরা দীর্ঘ সময় জেগে থাকত। এখন মাদকবাজারে নতুন ধরনের যে ইয়াবা রয়েছে তা সেবনের সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ছে মাদকসেবীরা।

গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে বনশ্রী, বারিধারা, উত্তরা থেকে ৫০০ গ্রাম আইস ও ৫ হাজার ইয়াবাসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। এ চালানটির তিন দিন আগে ৫০০ গ্রাম আইস এবং ৬৩ হাজার পিস ইয়াবাসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। দুই মাসের ব্যবধানে চট্টগ্রামে চারটি আইসের চালান জব্দ করে র‌্যাব ও পুলিশ। উদ্ধার করা প্রায় সবকটি চালানেই আইসের সাদা গুঁড়ো বা কাঁচামাল পাওয়া গেছে। এসব মালামাল পরীক্ষার জন্য রসায়নাগারে পাঠানো হলে ইয়াবার মধ্যে মিথাইল, এমফিটামিনের সঙ্গে হেরোইনের উপাদানের মিল পাওয়া যায়।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ক্রিস্টাল মেথ বা মেথ-এমফিটামিন প্রধানত তৈরি হয় থাইল্যান্ডে। পাশাপাশি মালয়েশিয়া ও মিয়ানমারে তৈরি হচ্ছে। মূলত এ তিন দেশ থেকে এগুলো ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে পাচার হচ্ছে। বাংলাদেশকে রুট হিসেবে ব্যবহার করছে মাদক কারবারিরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএনসির এক কর্মকর্তা বলেন, শুরুর দিকে ওজন কমানোর জন্য অনেকেই ইয়াবা সেবন করত। পরবর্তী সময়ে রাত জেগে থাকা শিক্ষার্থীরা, লংড্রাইভের চালকরা এর ব্যবহার শুরু করে। আগে চার ধরনের ইয়াবা পাওয়া যেত। গারো লাল রঙের চম্পা, গোলাপি রঙের আর সেভেন, হালকা গোলাপি রঙের জেপি ও ডগ নামের মাটি রঙের ইয়াবা অন্যতম।

এসব ইয়াবা সেবনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো শরীর নিস্তেজ হওয়া, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, গলা-মুখ শুকিয়ে যাওয়া, শরীর ঘামতে থাকা, অনবরত গরম অনুভূত হওয়া, নাড়ির গতি বৃদ্ধি পাওয়া, রক্তচাপ, দেহের তাপমাত্রা ও শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বৃদ্ধি পাওয়া, যৌন উত্তেজনা চিরতরে লোপ পাওয়া অন্যতম। এসব কারণে রক্তনালি ছিঁড়ে অনেকের ব্রেন হেমারেজ হয়, স্মৃতিশক্তি কমে যায়, মানসিক ভারসাম্য দেখা দেয়। বেশি পরিমাণ ইয়াবা সেবন শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমের ব্যত্যয় ঘটিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে।

তিনি আরও বলেন, অনেকে ইয়াবা ছেড়ে আইসের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু আইসের দাম বেশি হওয়ায় তা সাধারণ মাদকসেবীদের কাছে সোনার হরিণ হয়ে দেখা দেয়। এ কারণে নতুন কৌশল নিয়েছে মাদক কারবারিরা। তারা আইসের কিছু উপকরণ দিয়ে ইয়াবার নতুন ভার্সন চালু করে বাজারজাত করার চেষ্টা করছে।

২০১৮ সালে এক পরিসংখ্যান বলছে, মাদকসেবীদের ৫৮ ভাগ ছিল ইয়াবাসেবী। বর্তমান তার সংখ্যা ৮০ ভাগ। বাকি ২০ ভাগ বিভিন্ন ধরনের মাদকে আসক্ত। নতুন এই ইয়াবার বেশিরভাগ আসছে ভারত ও মিয়ানমারের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে। এর মধ্যে কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী, জামালপুরের বকশীগঞ্জ, শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী-নালিতাবাড়ী, ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট ধোবাউড়া, নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, সিলেটের সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও কক্সবাজারের টেকনাফ অন্যতম।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, টেকনাফ সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারির কারণে ইয়াবা পাচারের রুট পরিবর্তন করেছে মাদক কারবারিরা। তারা এখন সরাসরি দেশে ইয়াবা না পাঠিয়ে আগে ভারতে পাচার করে। তারপর এসব সীমান্ত ব্যবহার করে বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে বলে আমরা তথ্য পাচ্ছি। আগে ১৫ থেকে ২০ টাকায় সীমান্তে পাইকারিভাবে ইয়াবা পাওয়া গেলেও বর্তমান তার দাম বেড়ে ঠেকেছে ৭০-৮০ টাকায়। ইয়াবার রূপ পরিবর্তন হয়েছে। ইয়াবার মূল কারবার হচ্ছে মিয়ানমার। ইয়াবা কারখানাগুলো বন্ধ করতে ওই দেশের সঙ্গে আমরা প্রতিনিয়ত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে