দেশে পরকীয়ায় বাড়ছে সহিংসতা

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২১; সময়: ১০:৫১ pm |

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : সম্প্রতি পরকীয়া ঘিরে একের পর এক সহিংস ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মাঝে। এসব ঘটনার পেছনে ছিল পরকীয়া অর্থাৎ স্বামী বা স্ত্রীর সাথে অন্য নারী বা পুরুষের অনৈতিক সম্পর্ক। কিন্তু নৃশংস খুন, হত্যা বা অমানবিক নির্যাতনের ঘটনার পরই এসব আইনের আওতায় আসে।

অথচ অনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে নারী বা পুরুষ কোনো মানসিক নির্যাতনের শিকার হলেও বিদ্যমান আইনে সহায়তা পাওয়ার সুযোগ নেই। এনিয়ে হাইকোর্টে রিটও হয়েছে। তাই দ্রুত আইনটি সংস্কারের প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশের দণ্ডবিধি ৪৯৭ ধারায় বিয়ের পবিত্রতা রক্ষায় ব্যভিচারকে অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

এখানে বলা হয়, ‘কোনো ব্যক্তি যদি, অপর কোনো নারীর স্বামীর বিনা সম্মতিতে বা যৌনকামনার উপস্থিতি ছাড়া যৌনসঙ্গম করে, যে নারী অপর কোনো পুরুষের এরূপ যৌনসঙ্গম ধর্ষণের অপরাধ না হলে, সে ব্যক্তি ব্যভিচার করেছে বলে পরিগণিত হবে ও তাকে যে কোনো বর্ণনার কারাদণ্ড যার মেয়াদ সাত বছর পর্যন্ত হতে পারে বা জরিমানা দণ্ড বা উভয় দণ্ডে শাস্তিযোগ্য হবে। এরূপ ক্ষেত্রে ওই নারী দুষ্কর্মের সহায়তাকারিণী হিসেবে শাস্তিযোগ্য হবে না।’

পরকীয়ার সাজাসংক্রান্ত দণ্ডবিধির (পেনাল কোড) ৪৯৭ ধারা কেন অবৈধ এবং অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে ২০১৯ সালের ৮ জুলাই রুল জারি করে হাইকোর্ট। এর আগে ওই বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান এ বিষয়ে রিটটি করেন।

এ প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান বলেন, দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারা অনুযায়ী কোনো স্ত্রী পরকীয়া করলে যার সঙ্গে পরকীয়া করবে শুধু সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রয়েছে। অথচ স্ত্রীর বিরুদ্ধে স্বামীর কিছুই করার নেই।

একইভাবে স্বামী পরকীয়া করলে স্ত্রী স্বামীর বিরুদ্ধে বা যার সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িত হবে তার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিকার পাবেন না। উপরন্ত স্বামী যদি কোনো বিধবা বা অবিবাহিত নারীর সঙ্গে পরকীয়া জড়িয়ে পড়েন এবং স্ত্রী যদি স্বামীর অনুমতি সাপেক্ষে পরকীয়ায় জড়িত হয় তা আইনত বৈধ।

তিনি আরও বলেন, এই আইন সংবিধানের ২৭, ২৮ ও ৩২ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এটা অদ্ভুত ও বৈষম্যমূলক।

দেশের প্রচলিত আইনে ব্যভিচার ও পরকীয়ার বিষয়ে ব্যারিস্টার সাবরিনা জেরিন বলেন, পেনাল কোডের ৪৯৭ ধারায় ব্যভিচারের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, একজন বিবাহিত পুরুষ যখন অন্যের বিবাহিত স্ত্রীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়ান, সেটিই ব্যভিচার। এক্ষেত্রে নারী যদি অবিবাহিত বা বিধবা হন, তাহলে সেটি আইনের ধারায় পরকীয়া হিসেবে স্বীকৃত না। অন্যদিকে কোনো স্ত্রী যদি অন্যের স্বামীর সঙ্গে পরকীয়া করেন, তাহলেও সেই স্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।

কিন্তু যার সঙ্গে তিনি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছেন, সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। আবার পরকীয়া করছেন যে ব্যক্তি, তার স্ত্রীও কোনো আইনের সাহায্য নিতে পারবেন না। এর ফলে ভুক্তভোগী মাত্রেই আইনের সাহায্য পান না। বিদ্যমান এই আইনকে অসম্পূর্ণ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, একে পরিপূর্ণ না করলে ভুক্তভোগী নারী বা পুরুষ আইনের সাহায্য থেকে বঞ্চিত হতেই থাকবেন।

এই আইনজীবী বলেন, এখানে লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, পরকীয়ার কারণে নির্যাতনের শিকার হলেও পরকীয়াজনিত কারণে আইনি কোনো প্রক্রিয়া গ্রহণ করতে পারবেন না। আইনের আশ্রয় নিতে হলে তাকে পারিবারিক সহিংসতার বিষয়টি সামনে আনতে হবে।

তিনি আরও বলেন, যেসব নারী শারীরিক নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন, তারা যেন অবশ্যই কোনো সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তারি পরীক্ষা করান। সেখানে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের রেকর্ড কাজে লাগবে। এছাড়া ভিডিও, ছবি বা মেসেজও মামলায় সাহায্য করবে।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও পরকীয়া একটি ভয়াবহ অপরাধ। এর শাস্তিও কঠিন। এ প্রসঙ্গে বঙ্গভবন জামে মসজিদের ইমাম জিয়াউর রহমান বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরকীয়া-ব্যভিচারের ভয়ানক শাস্তির কথা বর্ণনা করেছেন।

তিনি বলেন, ‘হে মানব জাতি, তোমরা ব্যভিচার পরিত্যাগ করো। ব্যভিচারকারীদের জন্য ছয়টি কঠিন শাস্তি রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি শাস্তি দুনিয়াতে ও তিনটি আখেরাতে প্রকাশ পাবে। যে তিনটি শাস্তি দুনিয়াতে প্রকাশ পাবে তা হচ্ছে-তার চেহারার উজ্জ্বলতা বিনষ্ট হবে, তার আয়ুষ্কাল সংকীর্ণ হয়ে যাবে এবং তার দরিদ্রতা চিরস্থায়ী হবে। আর যে তিনটি শাস্তি আখেরাতে প্রকাশ পাবে তা হচ্ছে-সে আল্লাহর অসন্তোষ, কঠিন হিসাব ও জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে।’

  • 121
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে