জনবল সংকটে ভাতাভোগীর ভোগান্তি

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৫, ২০২১; সময়: ১১:৫৭ am |

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : সামাজিক নিরাপত্তার ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়ছে প্রতি বছর। বাজেট বরাদ্দও বৃদ্ধি করছে সরকার। এর পরও গত ২৩ বছরে ভাতাভোগীদের সেবা প্রদানে সমাজকল্যাণ খাতে কোনো পদ সৃষ্টি করা হয়নি। ফলে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছে না প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।

প্রায় এক কোটি ভাতাভোগীকে অনলাইন সেবা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হলেও কারিগরি কোনো পদ সৃজন করা হয়নি। এক হাজার ৭৪০টি ইউনিয়নে কোনো সমাজকর্মী নেই। একজন সমাজকর্মীর ১৪টি ইউনিয়নে কাজ করার উদাহরণ রয়েছে।

নিয়মিত ভাতা পরিশোধ বই লেখা, অনলাইনে ভাতা পেতে মোবাইল নম্বর যুক্ত করা, এনআইডির সমস্যা এবং ব্যাংক হিসাবে টাকা পৌঁছাতে বিলম্বসহ নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন ভাতাভোগীরা। একজন সমাজকর্মী ১৪ ইউনিয়নের লাখ লাখ ভোতাভোগীর বাছাই, বাস্তবায়ন কমিটির সভা, মৃতদের প্রতিস্থাপন, অপেক্ষমাণ তালিকা তৈরি, মনিটরিং, প্রতিবন্ধীদের জরিপসহ প্রায় অর্ধশত কাজ করতে হিমশিম খাচ্ছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ পৌরসভার ভাতাভোগী সাজুরুদ্দিন বলেন, ভাতার বই শেষ হলে আঙুলের ছাপ, এনআইডির সমস্যা ও ব্যাংক হিসাবে টাকা না গেলে সহজে সমাধান পাই না।

শিবগঞ্জ উপজেলার সমাজসেবা কর্মকর্তা কাঞ্চন কুমার দাস বলেন, তার উপজেলায় সেবাগ্রহীতার সংখ্যা অর্ধলাখ। অথচ কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন মাত্র ১৮ জন। নতুন পদ সৃজনের প্রস্তাব তিন বছর আগে কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া হয়েছে। এখনও অনুমোদন হয়নি।

সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যে নগদ আর্থিক সহায়তা-সংক্রান্ত সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবে সমাজসেবা অধিদপ্তর। তখন সেবাগ্রহীতার সংখ্যা হবে প্রায় তিন কোটি। চলতি অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মোট ১ লাখ ৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ১৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

জনবল সংকটের বিষয়ে সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ বলেন, সেবাগ্রহীতাদের সেবা নিশ্চিত করার জন্য পদ সৃজনের চেষ্টা করছি। এজন্য সংশ্নিষ্ট সব দপ্তরে যোগাযোগ করছি। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ও সিনিয়র সচিবও আশ্বাস দিয়েছেন।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন, সমাজসেবার বেশিরভাগ দপ্তরেই জনবল নেই। যারা আছেন, তাদের মধ্যে আবার যোগ্যতার ঘাটতি রয়েছে। ১৯৮৪ সালের পর সামাজিক নিরাপত্তা খাতে কাজ বেড়েছে অনেক, কিন্তু জনবল বাড়েনি। এখানে কর্মরত কর্মকর্তাদের পদোন্নতিরও সুযোগ কম।

তিনি বলেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পদ সৃজনের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। শিগগির আরও পদ সৃজনের প্রস্তাব পাঠানো হবে।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সামাজিক সচেতনতা ও আয়বর্ধক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য ১৯৭৪ সালে পল্লী সমাজসেবা (আরএসএস) কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর দারিদ্র্য নিরসনের লক্ষ্যে ১৯৯৮ সালে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর কার্যক্রম শুরু হয়। দীর্ঘ ২৩ বছরেও সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মাঠপর্যায়ে কোনো পদ সৃজন করা হয়নি।

ফলে ১৯৭৪ সাল থেকে শুরু করে আশির দশকে আরএসএস কার্যক্রমে নিয়োগ পাওয়া কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর কাজ করছেন। আরএসএসের পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তার অতিরিক্ত কাজ করায় ব্যাহত হচ্ছে উভয় কাজের মূল উদ্দেশ্য। এদিকে শূন্য পদ পূরণেও বিলম্ব করছে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। ফলে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির দুই শতাধিক পদ শূন্য রয়েছে।

বাংলাদেশ সমাজসেবা অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ও জাতীয় সমাজসেবা একাডেমির অধ্যক্ষ সাফায়েত হোসেন তালুকদার বলেন, অনেক ইউনিয়নে ইউনিয়ন সমাজকর্মীর কোনো পদ নেই। তাই এক হাজার ২৬২টি ইউনিয়ন সমাজকর্মীসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরির পাঁচ হাজার ৫৬৯টি পদ সৃজনের প্রস্তাব করা হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই পদ সৃজনের প্রস্তাবটি দ্রুত অনুমোদন করা প্রয়োজন।

পদ সৃজনের বিষয়ে গত ২৫ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা) লাইসুর রহমানও বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এখন পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

কারিগরি জনবলের সংকট

বয়স্ক, বিধবা বা স্বামী নিগৃহীতা ও প্রতিবন্ধী ভাতা এবং শিক্ষা উপবৃত্তি উপকারভোগী ৮৮ লাখ ৫০ হাজার জনের মধ্যে গত ৩১ জুন পর্যন্ত ৮৭ লাখ ৬৩ হাজার জনের অনলাইনে সেবা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমে (এমআইএস) তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এ ছাড়া চলতি অর্থবছরে ১৫০টি উপজেলায় সাড়ে ১২ লাখ ভাতাভোগীর অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে। অথচ সমাজসেবা অধিদপ্তরে তথ্যপ্রযুক্তির (আইসিটি) কোনো পদ নেই।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, ডিজিটাল যুগে লাখ লাখ সেবাগ্রহীতার একটি প্রতিষ্ঠানে আইসিটির কোনো পদ না থাকা চরম দুর্ভাগ্যের। এজন্য পদ সৃজনের আগে আইসিটিতে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ ক্ষেত্রে আরও দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। এ ছাড়া আশির দশকের যেসব পদের কোনো কাজ নেই, সেগুলো বিলুপ্ত করে নতুন পদ রূপান্তর করতে হবে।

৫৫৬৯ পদ সৃজনের প্রস্তাব

সারাদেশে ৫ হাজার ৫৬৯টি পদ সৃজনের প্রস্তাব সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে ২০১৮ সালে। এ পদগুলো সৃজনের জন্য এখন কাজ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক পদ আটটি, অতিরিক্ত পরিচালক ২৬টি, উপপরিচালক ৮৯টি, সহকারী পরিচালক বা সমমান ২১৯টি, সমাজসেবা অফিসার বা সমমান ৩১৪টি, ৬৪ জেলা কার্যালয়ে ২৭২টি, ৪৯২ উপজেলায় এক হাজার ৬৮২টিসহ সমাজসেবার হাসপাতাল, প্রবেশন অ্যান্ড আফটার কেয়ার সার্ভিস, আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও শিশু পরিবারের জন্য পাঁচ হাজার ৫৬৯টি পদ সৃজনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক গাজী মোহাম্মদ নূরুল কবির বলেন, তিনি ২০১৭ সালে পদ সৃজন প্রস্তাব সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিলেন। এরপর সমাজকল্যাণ থেকে ২০১৮ সালের শুরুতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এখনও এ কাজের তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। পদ সৃজনের প্রস্তাবটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অনুমোদন করা প্রয়োজন।

  • 17
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে