চোখের জলে ঈদ সেই ২৫ শ্রমিকের পরিবারের

প্রকাশিত: জুলাই ২১, ২০২১; সময়: ৪:০৭ pm |

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : ঈদ আনন্দ যেন ফিকে হয়ে গেছে নারায়ণগঞ্জের রুপগঞ্জের জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিবারের। পরিবারের উপার্জনক্ষম একমাত্র ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশেহারা হয়য়ে পড়েছেন তারা।

কাজে যোগ না দিলে ঈদের বেতন-বোনাস পাবে না। ঈদ আনন্দ মাটি হয়ে যাবে। তাইতো মায়ের কপালে চুমু দিয়ে গত ঈদের পর বাড়ি ছাড়ে ১৭ বছরের কিশোর নাঈম।

কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের মথুরাপাড়া গ্রামের মো. তাহের উদ্দিন আর জামেনার একমাত্র ছেলে নাঈম। ঢাকায় ফেরার সময় মায়ের চোখের পানি মুছে দিয়ে সে বলেছিল, ‘ঈদে তোমার জন্য নতুন শাড়ি নিয়ে আসবো। আর বাবার জন্য পাঞ্জাবি। আর বেতনের টাকা জমিয়ে বাড়িতে নতুন ঘর বানাবো।’

কিন্তু এমন দুঃস্বপ্ন হয়ে আসবে ঠিক পরের ঈদটি, কল্পনাও করেননি তার বাবা-মা!

একমাত্র বুকের ধন হারিয়ে ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে মাতম করছিলেন, নাঈমের মা জামেনা ও বাবা মো. তাহের মিয়া। তাদের করুণ আর্তনাদে চোখের জল ধরে রাখতে পারছিলেন না কেউ। ঈদের দিন এমন বিষাদের ছাঁয়া রূপগঞ্জে জুস কারখানায় আগুনের ঘটনায় নিখোঁজ কিশোর নাঈমের পরিবারে।

নাঈমের মতো একই অবস্থায় জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিখোঁজ ও হতাহত ২৫টি পরিবারে। সংসারে উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে নিদারুণ কষ্টে দিন কাটছে তাদের। বুকে কষ্ট পাথরচাপা দিয়ে প্রিয়জনের মরদেহের অপেক্ষায় রয়েছেন স্বজনরা। ঈদের দিনেও চোখের জলে ভাসছে এসব তারা।

জানা যায়, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিখোঁজদের মধ্যে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ সদর, করিমগঞ্জ, কটিয়াদী ও মিঠামইন উপজেলার ২১ শ্রমিক রয়েছেন। এছাড়া নিহত হয়েছেন এক নারী। আহত হয়েছেন তিনজন। এদের মধ্যে করিমগঞ্জ উপজেলাতেই নিখোঁজ রয়েছেন ১০ জন।

নানশ্রী পূর্ব মথুরাপাড়া গ্রামের নিখোঁজ নাঈমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার মা জামেনা ছেলের ছবি নিয়ে মাতম করছেন। পাশেই কাঁদছেন ভ্যানচালক বাবা মো. তাহের উদ্দিন। একবছর আগে ছয় হাজার টাকা বেতনে ওই কারখানায় চাকরি নেয় নাঈম।

তাহের উদ্দিন জানান, আমার সবকিছু তছনছ হয়ে গেছে। ১০ হাজার টাকা সুদের ওপর নিয়ে ঢাকায় থেকে ছেলের খোঁজ নিয়েছেন। থানা, হাসপাতাল ও মর্গ ঘুরে সে টাকাও ফুরিয়ে গেছে। এখনও সরকারের তরফ থেকে কোনো সহযোগিতা পাননি।

এদিকে একই এলাকার নিখোঁজ রয়েছেন খোকনের স্ত্রী জাহানারা (৩৫)। তার দুই ছেলে জাকির (১৬) ও রাকিব (১০) মলিন মুখে মায়ের ছবি নিয়ে বসে আছে ঘরের সামনে। তারা জানায়, ‘আমরা এতিম হয়ে গেছি। শেষবারের মতো মাকে দেখার জন্য অপেক্ষা করছি।’

মথুরাপাড়া গ্রামের আব্দুল কাইয়ুমের স্ত্রী পাখিমা (৩৫) কারখানার পাশেই একটি বাসা নিয়ে দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে থাকতেন। যাওয়ার সময় শেষ দেখা হয় মায়ের সঙ্গে। বড় মেয়েটির কান্না যেন থামছেই না। সে বলে, ‘আমাকে এখন কে আদর করবে? কীসের ঈদ? আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে।’

নারায়ণগঞ্জের ওই জুস কারখানায় আগুনের ঘটনায় নিখোঁজ সবকটি পরিবারেই একই চিত্র। ঈদের আনন্দ তাদের কাছে বিষাদে পরিণত হয়েছে। কান্না থামছে না স্বজনদের। হতদরিদ্র এসব পরিবারের পাশে ঈদেও দাঁড়াননি কেউ।

এদিকে আগুনের ঘটনায় আহত অবস্থায় মারা যাওয়া জয়কা ইউনিয়নের কুকিমাদল গ্রামের হারুনর রশিদের স্ত্রী মিনা আক্তারের পরিবারকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দুই লাখ টাকা অর্থ সহায়তা দেয়া হয়েছে।

কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ শামীম আলম জানান, নিখোঁজ ও হতাহতদের পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হবে। নিহত একজনের পরিবারকে দুই লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। আহত এক জনকে ৫০ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। মরদেহ শনাক্ত ও পরিবারের কাছে হস্তান্তরের পর তাদের সব ধরনের সহযোগিতা দেয়া হবে।

উল্লেখ্য, গত ৮ জুলাই নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের হাশেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে কারখানার ৫২ শ্রমিক মারা যান। কিন্তু পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় এখনও তাদের নিখোঁজ হিসেবে দেখানো হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার পর তাদের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে