‘এখন জীবন রক্ষা করতে হবে, বাকি সব পরে’

প্রকাশিত: এপ্রিল ২৮, ২০২১; সময়: ২:২৩ am |

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : দশ মাস আগে সরকার অনুমোদিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে আসে, মহামারি মোকাবিলায় বিধিনিষেধের কারণে ২০২০ সালের মাঝামাঝিতে এক কোটি ৬৪ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্রের কাতারে যুক্ত হয়েছে। গত বছরের জুন মাসে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) গবেষকদের একটি দল এই প্রতিবেদনটি তৈরি করে।

এতে আরও বলা হয়েছিল, দারিদ্র্যের হার ৯ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে। পোভার্টি ইন দ্য টাইম অব করোনা: ট্রেন্ডস, ড্রাইভারস, ভার্নারেবিলিটি অ্যান্ড পলিসি রেসপনস ইন বাংলাদেশ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বিদ্যমান ২০ দশমিক ৫ শতাংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নতুন দরিদ্র মানুষগুলো যুক্ত হবে।

এতে আরও আশঙ্কা করা হয়েছিল, গত বছরের শেষে দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২৫ দশমিক ১৩ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। যদিও মহামারির কারণে কত মানুষ দরিদ্রের কাতারে যুক্ত হয়েছে সে সংক্রান্ত পরিবর্তী কোনো হিসাব সরকারের কাছে নেই। প্রতিবেদনটির তৈরিতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিআইডিএস-এর মহাপরিচালক বিনায়ক সেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ে দেশে মানবিক এবং অর্থনৈতিক সংকট আরও প্রকট হবে।

গত বছরের আলোকে বিনায়ক সেন বলেছেন, লকডাউন এবং ব্যবসা-বাণিজ্য খুলে দিতে বারবার নিয়ম-নীতির যে পরিবর্তন করা হচ্ছে তা মহামারি নিয়ন্ত্রণে খুব ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।

তিনি বলেন, সংক্রমণ সঙ্গে করোনায় মৃত্যুর হারও বেড়ে যেতে পারে। সরকারকে আরও কঠোর লকডাউন ঘোষণা করতে হতে পারে। তাতে মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হতে পারে এবং দারিদ্র্যের হার আরও বেড়ে যেতে পারে।

করোনা সংক্রমণ রোধে টানা তিন মাস কঠোর লকডাউন দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, লকডাউনে কারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে সরকারকে খাদ্য ও নগদ অর্থ এবং অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যেন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ কঠোর লকডাউনেও টিকে থাকতে পারে।

এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি, প্রতিদিন প্রায় এক শ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। যদি এই মৃত্যুর হার বেড়ে প্রতিদিন হাজারে পৌঁছে তাহলে সমাজে যে বিশাল অস্থিরতা তৈরি হবে তা সংক্রমণ রোধে টানা তিন মাস কঠোর লকডাউনের চেয়ে বেশি ব্যয়বহুল হবে বলেন বিনায়ক সেন।

তিনি বলেন, জীবন রক্ষার জন্য জীবিকার কিছুটা ছাড় দেওয়া প্রয়োজন। এ জন্য আমাদের অতিরিক্ত কিছু খরচ করতে হবে। আমরা যদি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের খাবার সরবরাহ করতে পারি, ভবিষ্যতে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা যাবে।

বিআইডিএসের প্রতিবেদনটি পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনৈতিক বিভাগের অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে দারিদ্র্যের হার ছিল ২০ দশমিক ৩ শতাংশ। করোনা মহামারির কারণে বছরের শেষে এটি ২৫ দশমিক ১৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

সংক্রমণের রাশ টানতে দেওয়া কঠোর লকডাউনে নতুন করে দরিদ্র হওয়া মানুষদের পাঁচটি ভিন্ন পরিস্থিতিতে বিবেচনা করা হয়েছে। এগুলো হলো-

১) পরিস্থিতিতে শহরাঞ্চলের আয়শূন্য দিনমজুরদের বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু গ্রামাঞ্চলের মানুষের আয়ে কোনো ধরনের প্রভাব পড়বে না। কোভিড-১৯ এর কারণে অপরিহার্য লকডাউনের ফলে ৯৩ লাখ ৬০ হাজার মানুষ নতুন করে দরিদ্র হবে এবং মাথাপিছু দারিদ্র্যের সূচক ৫ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।

২) পরিস্থিতিতে যদি শহরাঞ্চলের দিনমজুর শ্রেণির ৮০ শতাংশ ও গ্রামাঞ্চলের পাঁচ শতাংশ মানুষের আয় কমে যায়, নতুন করে এক কোটি ২৮ লাখ মানুষ দরিদ্র হবে এবং দারিদ্র্যের সূচক ৭ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।

৩) পরিস্থিতিতে শহরাঞ্চলের কর্মহীন ৮০ শতাংশ ও গ্রামাঞ্চলের ১০ শতাংশ শ্রমিকের আয় কমে গেলে নতুন করে এক কোটি ৬৪ লাখ মানুষ দরিদ্র হবে এবং দারিদ্র্যের সূচক ৯ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। করোনার ধাক্কার বিষয়ে গবেষকরা মনে করছেন, প্রথম লকডাউনে তৃতীয় পরিস্থিতিটিই আমাদের এখানে ঘটেছে। কারণ এটি আয় ও ব্যয়ের ওপর সম্ভাব্য বাস্তব প্রভাবকে প্রতিফলিত করে।

৪)পরিস্থিতিতে যদি শহরাঞ্চলের ৮০ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলের ২০ শতাংশ মানুষের আয় কমে যায়, তাহলে নতুন করে দুই কোটি ৫৩ লাখ মানুষ দরিদ্র হবে এবং দারিদ্র্যের সূচক ১৪ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।

৫) পরিস্থিতিতে ধারণা করা হচ্ছে, শহরাঞ্চলের ৭০ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলের ৩০ শতাংশ মানুষের আয় কমে গেলে নতুন করে তিন কোটি ৫৪ লাখ মানুষ দরিদ্র হবে এবং দারিদ্র্যের সূচক ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।

বিনায়ক বলেন, নতুন দরিদ্রদের অধিকাংশই ‘অস্থায়ী দরিদ্র’ যারা হঠাৎ ধাক্কার পর অল্প সময়ের জন্য দরিদ্র হয়েছেন। এই মানুষদের কোনো না কোনোভাবে দারিদ্র্য থেকে বের হয়ে আসার সক্ষমতা আছে। কিন্তু নতুন করে দরিদ্র হওয়া কিছু মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি।

যারা লকডাউনের পরেও নিজেদের জীবিকা পুনরুদ্ধার করতে পারেনি, তারাই আসলে নতুন দরিদ্র। এই শ্রেণির মানুষদের জন্যই সহযোগিতা প্রয়োজন। এই সংখ্যাটা আসলে কতো, তা আমাদের পক্ষে বের করা সম্ভব না। বিবিএস এর সে সক্ষমতা আছে বলেন তিনি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ সংকটের কারণে সৃষ্ট দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে কয়েক বছরে অর্জিত প্রচেষ্টা এবং উদ্যোগগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ার হুমকিতে রয়েছে। বাংলাদেশ ২০৩১ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) পূরণে দারিদ্র্যের হার শূন্যে নামিয়ে আনাতে মাথাপিছু প্রবৃদ্ধি গড়ে সাত শতাংশ অর্জনের পরিকল্পনা করেছিল। এমনকি নির্ধারিত লক্ষ্যের কাছাকাছি ছয় শতাংশ জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল।

গবেষণায় বলা হয়েছে, পরবর্তী দুটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় প্রবৃদ্ধি মাথাপিছু ছয় শতাংশ বৃদ্ধি করে ২০১৯ সালের সমপরিমাণ দারিদ্র্যের স্তরে পৌঁছাতে প্রায় নয় বছর এবং ২০১৬ সালের সমপর্যায়ে পৌঁছাতে প্রায় পাঁচ বছর লাগবে। এটি একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা যা বাংলাদেশের ইতিহাসে ব্যতিক্রম ঘটনা। এর আগে দেশে যে বিভিন্ন মন্দা দেখা দিয়েছিল তা কখনই দারিদ্র্যের জন্য এমন ভয়াবহ পরিণতি তৈরি করেনি প্রতিবেদনে বলা হয়। সূত্র- দ্য ডেইলি স্টার

  • 36
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে