ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর দ্বৈত অভিযান

প্রকাশিত: মার্চ ১৬, ২০২১; সময়: ৬:৫৬ pm |

পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য্য : ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর কেবলমাত্র ‘মুজিব বর্ষ’ উদযাপনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। একই সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনও থাকবে তার মাথায়। তার অনুষ্ঠানসূচি অনুযায়ী, গোপালগঞ্জ জেলার ওড়াকান্দিতে ‘মতুয়া’ সম্প্রদায়ের পবিত্র মন্দির পরিদর্শনে যাবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মোদি সেখানে যাচ্ছেন সীমানার ওপারের মতুয়াদের মন জয় করতে, যাদের ভোট পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ভোটে জয়-পরাজয়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক। মোদি ২৬ মার্চ ঢাকায় এসে ওড়াকান্দিতে যাবেন ২৭ মার্চ। সেদিন থেকেই শুরু হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ বিধারসভার আট ধাপের নির্বাচনের প্রথম ধাপ। ওড়াকান্দিতে মোদি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করবেন মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা হরিচাঁদ ঠাকুরের প্রতি। হরিচাঁদ ঠাকুর ১৮১২ সালের ১১ মার্চ জন্ম গ্রহণ করেন ওড়াকান্দিতে। ওড়াকান্দির সঙ্গে জড়িত মতুয়া সম্প্রদায়ের আবেগ।

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে মতুয়ারা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?

বিশ্লেষকরা বলছেন, মোদিই হতে চলেছেন প্রথম কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী যিনি ওড়াকান্দিতে যাচ্ছেন। এই জায়গাটি পশ্চিমবঙ্গের দেড় কোটি ভোটারের কাছে একটি আবেগজড়িত পুণ্যস্থান। ভারতজুড়ে মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষ বসবাস করেন। রাজনৈতিকভাবে সচেতন এই সম্প্রদায়ের ভোট ২৯৪টি আসনের মধ্যে প্রায় ৩০টির ভাগ্য নির্ধারণ করবে। এছাড়াও, আরও অন্তত ৬৩টি আসনের ক্ষেত্রেও তাদের পরোক্ষ প্রভাব থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এই মন্দির যাত্রার মাধ্যমে মোদি মতুয়া ভোট ব্যাংক বিজেপির পক্ষে আনার চেষ্টা করবেন। ভারতে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ বাস্তবায়িত না হওয়ায় এই সম্প্রদায়ের মধ্যে কিছুটা হতাশা রয়েছে। ভারতের রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞানের অধ্যাপক বিশ্বনাথ চক্রবর্তী মুঠোফোনে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘মোদির ওড়াকান্দি যাত্রা রাজনৈতিক। তিনি মতুয়া ভোটারদের প্রভাবিত করতেই সেখানে যাচ্ছেন।’

তিনি জানান, মতুয়ারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। দলগুলো তাদেরকে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। যদিও এসব প্রতিশ্রুতিতে প্রভাবিত হয় কিনা সেটা প্রশ্ন সাপেক্ষ। তবে সর্বভারতীয় মতুয়া মহাসংঘের সাধারণ সম্পাদক মহিতোষ বৈদ্য তা মনে করেন না। তিনি বলেন, ‘বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে প্রধানমন্ত্রীর ওড়াকান্দি যাত্রা অবশ্যই মতুয়া ভোটারদেরকে প্রভাবিত করবে বিজেপিকে ভোট দেওয়ার জন্য।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ওড়াকান্দি মন্দিরে যাওয়ার কথা শুনে পুরো মতুয়া সম্প্রদায় আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত।’ ইতোমধ্যে ওড়াকান্দির মতুয়ারা ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে সব ধরণের প্রস্তুতি নিয়েছেন। মতুয়া মহাসংঘের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত ঠাকুর বলেন, ‘আমরা খুবই উজ্জীবিত এবং মোদিজীকে স্বাগত জানাতে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। তার আগমন পুরো মতুয়া সম্প্রদায়কে আবেগতাড়িত করেছে।’

তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আগমনের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের কোনো যোগসূত্র আছে কি না জানতে চাইলে সুব্রত এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। কাশিয়ানি উপজেলা চেয়ারম্যান সুব্রত অপর এক প্রশ্নের জবাবে জানান, মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাস করছেন। গোত্রের হিসেবে মতুয়ারা নমশূদ্র। তারা উত্তর চব্বিশ পরগনা, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা ও নদীয়া জেলায় বসবাস করেন। তারা জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, কোচবিহার ও বর্ধমানের কিছু এলাকাতেও রয়েছে।

এই সম্প্রদায়ের মানুষ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে গিয়েছিল ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর। ২০১১ সালের পর থেকেই মতুয়া ভোট ব্যাংক পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ফলাফল নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সে বছর নির্বাচনে তাদের ভোট মমতা ব্যাণার্জীর নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসকে পশ্চিমবঙ্গে জয়ী করতে অন্যতম ভূমিকা পালন করেছিল।

সে নির্বাচনে প্রায় ৩৪ বছর পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় থাকা সিপিএমকে পরাজিত করে মুখ্যমন্ত্রী হন মমতা। এর আগ পর্যন্ত মতুয়ারা সিপিএমকে সমর্থন করতেন, কিন্তু সরাসরি রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল না। প্রয়াত বীণাপাণি দেবীর আশীর্বাদের ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস বিজয়ী হন। মতুয়াদের কাছে বীণাপানি ‘বড় মা’ বলে পরিচিত। মমতার সঙ্গে তার খুবই ভালো সম্পর্ক ছিল।

তবে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে সব পাল্টে যায়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে বেশিরভাগ মতুয়া ভোটার বিজেপিকে ভোট দেয়।

উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় শান্তনু ঠাকুরের কথা। তিনি মতুয়া মহাসংঘের বর্তমান নেতা এবং বনগাঁ আসনে বিজেপির সংসদ সদস্য। তিনি এই আসনে ঠাকুর পরিবারের ও তৃণমূল কংগ্রেসের জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী মমতা ঠাকুরকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য হয়েছেন প্রায় ১ লক্ষ ভোটের ব্যবধানে। প্রায় ৬৫ থেকে ৬৭ শতাংশ মতুয়া ভোট এই আসনে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই সম্প্রদায়ের তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি তৃণমূল কংগ্রেসের বাইরে অন্য কোনো দল থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

শান্তনুর বাবা মঞ্জুল কৃষ্ণ ঠাকুর রাজ্যের তৃনমূল সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। সিএএর প্রতিশ্রুতিই বিজেপির এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। এই প্রতিশ্রুতি দিয়েই বিজেপি মাতুয়াদের আস্থা জিতে নিয়েছে। তবে এখনও সিএএ বাস্তবায়ন না করায় মতুয়ারা হতাশ হয়ে পড়েছেন। এই আইনটির লক্ষ্য ছিল প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে ধর্মীয় নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচতে ভারতে আসা অমুসলিম অভিবাসীদের নাগরিকত্ব প্রদান করা।

পশ্চিমবঙ্গে সিএএ বাস্তবায়নের দেরি হওয়ায় শান্তনু বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে রয়েছেন। তিনি বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারকে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, সিএএ অবিলম্বে শুরু করা না হলে তার সম্প্রদায়ের মানুষ ‘নতুন কিছু ভাবতে শুরু করবে’। এই সতর্কবাণীর কারণে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ গত মাসে ঠাকুরনগরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। উত্তর চব্বিশ পরগনার অন্তর্ভুক্ত এই অঞ্চলটিতে মূলত মতুয়া সম্প্রদায়ের সদস্যরাই বসবাস করেন।

সফরকালে মতুয়া সম্প্রদায়কে অমিত শাহ আশ্বাস দিয়েছিলেন যে চলমান করোনা ভ্যাকসিন কার্যক্রম শেষ হওয়ার পরে সিএএ বাস্তবায়িত হবে। সার্বিকভাবে এমন বৈরি পরিস্থিতিতে মোদি মতুয়া ভোটারদের উৎসাহিত করবেন এবং ভোটারদের কাছে বাংলাদেশ থেকে একটি রাজনৈতিক বার্তা দেবেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বিশ্বনাথ চক্রবর্তী অবশ্য মনে করেন, এই সফর মতুয়াদের ওপর খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না। সাম্প্রতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, ‘বিজেপি যেভাবে মতুয়া ভোটারদের ওপর ভরসা করছে, মোদির এই সফর তাদের ওপর ততটা প্রভাব ফেলবে বলে আমি মনে করি না।’

নরেন্দ্র মোদির দুই দিনের সফর পরিকল্পনা অনুসারে, ২৬ মার্চ তিনি সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন এবং জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে ভাষণ দেবেন। সেদিন সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু-বাপু ডিজিটাল প্রদর্শনীর উদ্বোধন করবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

২৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার বঙ্গবন্ধু স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাবেন মোদি। সেই সঙ্গে তিনি সাতক্ষীরা ও ওড়াকান্দিতে দুটি মন্দির পরিদর্শন করবেন।

সেদিন বিকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি একটি বৈঠক করবেন এবং দুটি স্মারক ডাকটিকিট উদ্বোধন করবেন। রাতে দিল্লির উদ্দেশে রওনা দেওয়ার আগে তিনি রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে তার কার্যালয়ে সাক্ষাত করবেন।

সূত্র : দ্য ডেইলি স্টার

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে