আতঙ্কিত লাখ লাখ মানুষ আশ্রয়কেন্দে ফণীর আঘাতে উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যপক ক্ষতি

প্রকাশিত: মে ৪, ২০১৯; সময়: ৫:৩৯ am |
খবর > জাতীয়

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : সাইক্লোন ফণী গত মধ্যরাতে খুলনা ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এলাকায় আঘাত হেনেছে। খুলনা ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় গতকাল সকাল থেকে ফণীর অগ্রবর্তী অংশের প্রভাব শুরু হয়। এতে উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ফণীর প্রভাবে বাগেরহাট এবং কিশোরগঞ্জে অন্তত ৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আর উপকূলীয় অঞ্চলে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে শত শত গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানির নিচে তলিয়ে গেছে ফসলভরা জমি।  আতঙ্কিত লাখ লাখ মানুষ বাড়িঘর গবাদিপশু সহায় সম্পদ রেখে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে অবস্থান নিয়েছে।
জানা গেছে, ফণীর প্রবাহে রাজধানীসহ সারা দেশে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এছাড়া কোথাও কোথাও বাঁধ ভেঙে গেছে। ঘূর্ণিঝড় ফণীর বাংলাদেশের খুলনা উপকূলে দমকা ও ঝড়ো হাওয়ার সৃষ্টি করতে পারে। যা সারা রাত পর্যন্ত চলবে। এছাড়া আজ শনিবার পর্যন্ত এর প্রভাব থাকবে।
আবহাওয়ার বিশেষ বিজ্ঞপ্তি জানানো হয়, ঘূর্ণিঝড় এবং অমাবস্যার প্রভাবে উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, বরগুনা, ভোলা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহের নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৪ থেকে ৫ ফুট অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে। উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সকল মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদফতরের পরিচালক সামছুদ্দিন আহমেদ বলেন, ঘূর্ণিঝড় ফণী শুক্রবার সকাল ১০টায় ভারতের ওড়িষ্যা উপকূল অতিক্রম করে। ওড়িষ্যা উপকূল অতিক্রম করার সময় এর চারপাশে বাতাসের বেগ ছিল ঘন্টায় ১৮০ কিলোমিটার। তিনি বলেন, বর্তমানে এটি ওড়িষা উপকূল থেকে উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশের উপকূল খুলনার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এজন্য পায়রা ও মংলা সমুদ্রবন্ধরকে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। চট্টগ্রামকে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে ও কক্সবাজারে ৪ নম্বর হুঁশিয়ারি সংকেট দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘূর্ণিঝড় আগেও বাংলাদেশে হয়েছিল। এর ফলে প্রাণহানি হয়েছিল। এছাড়া গাছপালা উপড়ে যাওয়া ও কাচা-বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। এই ঘূর্ণিঝড় ফণীর ক্ষেত্রে এই ধরনের আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, ফণীর প্রবাহে রাজধানীসহ সারা দেশে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এছাড়া কোথায় কোথায় বাঁধ ভেঙে গেছে। যেসব এলাকায় আমরা ৭ নম্বর বিপদ সংকেত দিয়েছি ফণী সেসব এলাকায় প্রথমে আঘাত হানবে। এরপর খুলনা, সাতক্ষীরা,রংপুর ও রাজশাহী হয়ে উত্তরাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হবে।
ফণী যখন আঘাত হানবে তখন বাতাসের গতিবেগ সম্পর্কে আবহাওয়া অধিদফতরের পরিচালক বলেন, ফনি যখন আঘাত হানবে তখন বাতাসের গতিবেগ ঘন্টায় একেক জায়গায় একেক রকম হবে। কোথায় হয়তো ১০০ কিলোমিটার। কোথাও ১২০ কিলোমিটার, কোথাও ১০ কিলোমিটার, কোথাও ২০ কিলোমিটার এ ধরনের বাতাস হতে পারে। তিনি বলেন, ফনী ভারতে যেভাবে আঘাত হেনেছে তা থেকে বুঝা যাচ্ছে এটি একটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়। ঘূর্ণিঝড় থেকে নিরাপদে থাককে আশ্রয় কেন্দ্রে থাকার জন্য পরামর্শ দেন তিনি।
আবহাওয়া অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, বাতাসের তীব্রতা এবং ধ্বংসক্ষমতা অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড়কে চারটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়। ঘূর্ণিঝড়ের ফলে সৃষ্ট বাতাসের গতিবেগ যদি ঘণ্টায় ৬২-৮৮ কিলোমিটার হয়, তাহলে তাকে ঘূর্ণিঝড় বা ট্রপিক্যাল সাইক্লোন বলা হয়। গতিবেগ ৮৯-১১৭ কিলোমিটার হলে তীব্র ঘূর্ণিঝড় বা প্রবল ঘূর্ণিঝড় বলা হয়। আর বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১১৮-২১৯ কিলোমিটার হলে সেটিকে হ্যারিকেন গতিসম্পন্ন ঘূর্ণিঝড় বা অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় বলা হয়। গতিবেগ ২২০ কিলোমিটার বা তার বেশি হলে তাকে ‘সুপার সাইক্লোন’ বলা হয়। এ হিসেবে ঘূর্ণিঝড় ফণীর বর্তমান গতিবেগ আছে ১৪০-১৬০ কিলোমিটার। ফলে ঝড়টি অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়।
তিনি বলেন, ঝড়ের অগ্রভাগ দেশের যশোর ও খুলনা অঞ্চল দিয়ে ঢুকতে শুরু করলেও চার বন্দরের সর্তক সংকেত বদলানো হয়নি। সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরগুলোকে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলো ৭ নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে।
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলো ৬ নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায়ই থাকবে। একই কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
বরিশাল অফিস থেকে শাহে আলম জানান, গতকাল সন্ধ্যার দিকেই আঘাত হানতে শুরু করে উপকূলীয় এলাকায়। বিপদ সীমার উপরে নদ-নদীর পানি, বিচ্ছন্ন বিদুৎ সংযোগ, প্লাবিত হয় একের পর এক নি¤œাঞ্চল। ভেড়ী বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পড়ে লোকালয়। বিপদ সীমার ২৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে উপকূলীয় এলাকার নদ-নদীর পানি প্রবাহিত হয়।
বরিশালের জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান বলেন, ঘূর্ণিঝড় ফণী মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে। এরইমধ্যে বিভিন্ন সেচ্ছাসেবী ও উন্নয়ন সংস্থার সাথে দফায় দফায় সভা করা হয়েছে। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবিলা নিয়ে আগাম প্রস্তুতি মূলক কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে। দুর্যোগের সতর্কতা নিয়ে জনসাধারণকে অবহিত করার জন্য ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
এদিকে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ফণী ধেয়ে আসার কারণে বরিশাল নদীবন্দর থেকে সকল ধরণের লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে বাংলাদেশে অভ্যস্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ(বিআইডব্লিউটিএ)। বরিশালের নৌনিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের প্রধান মিঠু সরকার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ঘুর্ণিঝড় ফণী‘র শঙ্কায় কুয়াকাটা উপকূলীয় অঞ্চল ও পায়রা বন্দরসহ তৎসংলগ্ন এলাকার মানুষের মধ্যে এক ধরনের উৎকন্ঠা বিরাজ করে।
এদিকে ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে নদী ও সাগরের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পটুয়াখালীতে বেশ কিছু পয়েন্টের বেড়িবাঁধ ভেঙে ও উপচে পরে তলিয়ে গেছে গ্রামের পর গ্রাম। গতকাল সন্ধ্যায় তিনটি উপজেলায় এ পর্যন্ত অন্তত ২৫ গ্রাম প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গ্রামগুলোয় পানি ঢুকে প্লাবিত হওয়ায় তলিয়ে গেছে বাড়িঘর ফসলি জমি। এতে সবচেয়ে বেশী ক্ষতি হয়েছে রবি মৌসুমে মুগডাল।
এদিকে, উচ্চ জোয়ারে নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কলাপাড়া উপজেলার লালুয়া ইউনিয়নের চারিপাড়া পয়েন্টে দেড় কিলোমিটার এলাকায় বেড়িবাঁধ আংশিক থাকায় গ্রামের মধ্যে পানি ঢুকে অন্তত ১০টি গ্রাম প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া মহিপুরের নিজামপুর পয়েন্টে বেড়ি বাঁধ ভেঙে ৫টি গ্রাম প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত ঘোষণার পর থেকে বরগুনা সদরসহ ৬ উপজেলার মানুষ নিজেদের জানমাল রক্ষায় আশ্রয়কেন্দ্র যাওয়া শুরু করে।  জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ জানান, মানুষের জীবন ও জানমাল রক্ষা করতে উপকূলীয় এলাকায় মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে। নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য বরগুনায় ৩৩৫টি সাইক্লোন শেল্টার খুলে রাখা হয়েছে। এতে অন্তত ২ লাখ মানুষ নিরাপদে আশ্রয় নিতে পারবে। এ ছাড়াও ঘূর্ণিঝড়ে সম্ভাব্য ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে ২২৬ বান্ডেল টিন, ৪২৩ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য, নগদ ১৩ লাখ ৯৬ হাজার টাকা, দুই হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার মজুদ রয়েছে।
এদিকে ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’ ও অমাবশ্যার প্রভাবে চার-পাঁচ ফুটের অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। উপকূলীয় জেলা চাঁদপুর, বরগুনা, ভোলা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোর নিম্নাঞ্চলে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে চার থেকে পাঁচ ফুট অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে। এদিকে বরিশালের উপকূলীয় জেলা ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোতে ৭ নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে।
ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি হেডকোয়ার্টার এবং উপকূলীয় ১৯টি জেলায় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। এসব জেলার উপজেলা পর্যাযয়েও নিয়ন্ত্রণকক্ষ খোলা হযয়েছে। রেডক্রিসেন্টের নিয়ন্ত্রণকক্ষও খোলা হয়েছে। উপকূলীয় আর্মি স্টেশনগুলোতেও ঢাকা থেকে বার্তা পাঠানো হয়েছে। তাঁরা প্রস্তুতি রেখেছেন। সিপিপির ৫৬ হাজার স্বেচ্ছাসেবককে বার্তা পাঠানো হয়েছে, তাঁরা সবাই প্রস্তুত আছেন।
এদিকে স্বেচ্ছাসেবকরা এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছেন। মানুষের অন্ন, বস্ত্র ও চিকিৎসার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া আছে। এসব জেলার প্রশাসকদের কাছে ২০০ মেট্রিকটন চাল পৌঁছে দেওয়া হয়েছে এবং প্রত্যেক জেলা প্রশাসককে পাঁচ লাখ করে টাকাও দেওয়া হয়েছে। ৪১ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। স্যালাইনের জন্য সুপেয় পানির ট্রাক পাঠানো হয়েছে।’’
বাগেরহাটে এক জনের মৃত্যু :
গতকাল দুপুরে বাগেরহাট সদরে ঝড়ো হাওয়ার মধ্যে উপজেলার রণজিৎপুর গ্রামে মাথার উপর গাছের ডাল ভেঙ্গে পড়ে শাহানুর বেগম (৫০) নামে এক গৃহবধূ মারা যায়। এর আগে দুপুর থেকেই সুন্দরবনসহ বাগেরহাটের বিভিন্ন নদীর পানি ফুসে উঠে। দুপুর বলেশ্বর শরণখোলা উপজেলার বলেশ^র নদীর প্রবল স্রোতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৩৫/১ পোল্ডারের বগী এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে বগী, উত্তর সাউথখালী, দক্ষিণ সাউথখালী, চালিতাবুনিয়া ও দক্ষিণ চালিতাবুনিয়া নামে ৫ গ্রাম প্লাবিত হয়। দুপুর থেকে বাগেরহাট জেলার উপর দিয়ে বইতে শুরু করেছে ঝড়ো হাওয়া। গুড়ি-গুড়ি ও মাঝারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। আতংকিত লোকজন বিকাল থেকেই জেলার ২৩৪টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে আসতে শুরু করে। সন্ধ্যার আগেই লোকজন দোকানপাঠ বন্ধ করে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটে যায়।
এর আগে দুপুর থেকেই সুন্দরবনসহ বাগেরহাটের বিভিন্ন নদীর পানি ফুসে উঠে। দুপুর বলেশ্বর শরণখোলা উপজেলার বলেশ্বর নদীর প্রবল স্রোতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৩৫/১ পোল্ডারের বগী এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে বগী, উত্তর সাউথখালী, দক্ষিণ সাউথখালী, চালিতাবুনিয়া ও দক্ষিণ চালিতাবুনিয়া নামে ৫ গ্রাম প্লাবিত হয়। দুপুর থেকে বাগেরহাট জেলার উপর দিয়ে বইতে শুরু করেছে ঝড়ো হাওয়া। গুড়ি-গুড়ি ও মাঝারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। আতংকিত লোকজন বিকাল থেকেই জেলার ২৩৪টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে আসতে শুরু করেছে। সন্ধ্যার আগেই লোকজন দোকানপাঠ বন্ধ করে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছে। রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়।
জেলার সর্বত্র ঘূর্ণিঝড় ফণী আতংক ছড়িয়ে পড়ে। এদিকে, সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের দুবলার চর, আলোরকোল, কটকা ও শ্যালার চরে অবস্থানরত বনকর্মী ও জেলেরা আশ্রয় কেন্দ্রে নিরাপদে রয়েছে। মোংলা বন্দরের পন্য ওঠানামা বন্ধ রেখে বন্দর চ্যানেল খালী করা হয়। । ঝড় পরবর্তী উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়ার জন্য মোংলায় নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের ২১টি জাহাজকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’ আঘাত আনলে ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইড সুন্দরবনের অসংখ বন্যপ্রাণীর ক্ষতি হবার আশংকা রয়েছে। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সিডরে লন্ডভন্ড হয়ে যায় সুন্দরবনে একটি বিরাট অংশ। ঝড়-জলোচ্ছাসে মারা যায় ১টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার, অসংখ্য হরিণসহ অনেক বন্যপ্রাণী। বাগেরহাটে ঘূর্ণিঝড়ের পর ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বন্টনের জন্য প্রায় ৪শ মেট্রিক টন চাল ও ৫ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার মজুদ রাখা হয়েছে। সাইক্লোন শেল্টারের পাশাপাশি উপকূলের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
কিশোরগঞ্জে ৬ জন নিহত :
কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া, মিঠামইন ও ইটনা উপজেলায় বজ্রপাতে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে প্রবল ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে সৃষ্ট বৃষ্টির সময় বজ্রপাতে তাদের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে পাকুন্দিয়ার তিনজন, মিঠামইনের দুইজন ও ইটনার একজন রয়েছেন।
নিহতরা হলেন- পাকুন্দিয়া উপজেলার সুখিয়া ইউনিয়নের কুর্শাকান্দা গ্রামের আয়াজ আলীর ছেলে আসাদ মিয়া (৫৫), একই উপজেলার চরফরাদি ইউনিয়নের আলগীরচর গ্রামের আবদুল হালিমের মেয়ে নুরুন্নাহার (৩০), একই এলাকার এন্তাজ আলীর ছেলে মুজিবুর (১৭), মিঠামইন উপজেলার বৈরাটি ইউনিয়নের বিরামচর গ্রামের গোলাপ মিয়ার ছেলে মহিউদ্দিন (২৩), একই উপজেলার কেওয়াজোড় ইউনিয়নের অলিপুর গ্রামের এবাদ মিয়ার ছেলে সুমন মিয়া (৭) ও ইটনা উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নের কাটুইর গ্রামের রাখেশ দাসের ছেলে রুবেল দাস (২৬)।
পুলিশ জানায়, ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে শুক্রবার দুপুরের দিকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রবল বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়া বয়ে যায়। এ সময় মাঠে কাজ করার সময় বজ্রপাতে পাকুন্দিয়া, মিঠামইন ও ইটনায় ছয়জনের মৃত্যু হয়। পাকুন্দিয়া থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইলিয়াস, মিঠামইন থানার ওসি জাকির রব্বানি ও ইটনা থানার ওসি মুর্শেদ জামান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’র প্রভাবে কক্সবাজারে ঝড়ো আবহাওয়া বিরাজ করছে। গতকাল সকাল থেকেই তীব্র বাতাস বইতে শুরু করে সমুদ্রসৈকত পাড়ে। দুপুরের দিকে সাগর বেশ উত্তাল দেখা গেছে। বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ছে সাগরের তীরে।  স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সমুদ্রে জোয়ারের পানি কয়েক ফুট বেড়ে গেছে। যদিও এর মধ্যেও কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকদের সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে দেখা গেছে। পাশাপাশি পর্যটকরা যাতে সৈকত ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান, সে জন্য স্বেচ্ছাসেবকদের মাইকিং করতে দেখা গেছে। স্বেচ্ছাসেবকরা জানিয়েছেন, পর্যটকদের সৈকত থেকে হোটেল-মোটেলে ফিরিয়ে নিতে তাদের বেগ পেতে হচ্ছে।
সভায় ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো. আশরাফুল আফসার জানান, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এবং উপজেলাগুলোতে নিয়ন্ত্রণকক্ষের পাশাপাশি উপজেলা ও উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) দেওয়া হয়েছে নির্দেশনা।
নৌবাহিনীর প্রস্তুতি :
বাংলাদেশ নৌবাহিনী ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’র আঘাত পরবর্তী জরুরি উদ্ধারকাজ, ত্রাণতৎপরতা ও চিকিৎসা সহায়তাসহ যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। শুক্রবার আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়। এতে বলা হয়, চট্টগ্রাম, খুলনা ও মোংলা নৌ অঞ্চলে নৌবাহিনীর ৩২টি জাহাজ সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় দ্রুততম সময়ে জরুরি ত্রাণসামগ্রী এবং চিকিৎসা সহায়তা প্রদানের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। পাশাপাশি খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুরসহ উপকূলীয় দুর্গত এলাকাগুলোতে মোতায়েনের জন্য নৌ কন্টিনজেন্ট প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়, দুর্যোগ পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য নৌবাহিনী জাহাজ মেঘনা বরিশালে, বানৌজা তিস্তা ঝালকাঠিতে, এলসিটি-১০৪ বরগুনায় এবং এলসিভিপি-০১১ পটুয়াখালীতে নিয়োজিত থাকবে। এসব জাহাজ জরুরি খাদ্যসামগ্রী হিসেবে দু’হাজার পরিবারের তিন দিনের শুকনা খাবার বহন করছে।
প্রতিটি পরিবারের জন্য শুকনা খাবার হিসেবে রাখা হয়েছে ১০ কেজি চাল, ২ কেজি ডাল, ২ কেজি তেল, ২ কেজি লবণ, ২ কেজি চিড়া, ২ কেজি মুড়ি, ১ কেজি গুড় ও প্যাকেট বিস্কুট। এছাড়াও মোমবাতি, পলিথিন ব্যাগ, ম্যাচ বক্স, বিশুদ্ধ খাবার পানি, স্যালাইন ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধ রয়েছে। দুর্গত এলাকাগুলোতে জরুরি চিকিৎসা সহায়তার জন্য বিশেষ মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও খাবার স্যালাইন বিতরণের কাজে নিয়োজিত থাকবে। এছাড়া, নৌ কন্টিনজেন্টসমূহ অনুরূপ ত্রাণসামগ্রী নিয়ে সড়ক পথে দুর্গত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণের জন্য নিয়োজিত থাকবে।
সচিবালয়ে ব্রিফিং :
ঘণ্টায় ১৮০ থেকে ২১০ কিলোমিটার গতিবেগের ফণী এখন ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটারের ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিয়েছে। তবে গতি কমলেও বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে রয়েছে জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা।
গতকাল সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে সচিবালয়ে দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের এক ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানিয়েছেন আবহাওয়া অধিদফতরের পরিচালক সামছুদ্দিন আহমেদ। ব্রিফিংয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব মো. নজিবুর রহমানসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
ব্রিফিংয়ে আবহাওয়া অধিদফতরের পরিচালক বলেন, ফণীর প্রভাবে সারাদেশ এখন মেঘাচ্ছন্ন। বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়া রয়েছে বিভিন্ন জেলায়। মধ্যরাতে এই ঝড়ো হাওয়ার গতি বাড়বে। এসময় ফণীর কেন্দ্র বাংলাদেশের খুলনা-সাতক্ষীরা অঞ্চলে আঘাত হানতে পারে আমরা আশঙ্কা করছি। শামছুদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, ফণীর কারণে ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টির প্রবণতা শনিবার পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। ঘূর্ণিঝড়টির গতি কমে গেলেও জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাব মোকাবিলায় উপকূলীয় ১৯টি জেলার ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৫ জনকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। আরও তিন থেকে ছয় লাখ মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে নেওয়া হতে পারে। তবে ফণীর গতি কমে আসায় অনেকেই আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনীহা প্রকাশ করছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বলেন, আমাদের উপকূলে ৪ হাজার ৭১টি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। এর বাইরে স্কুল-কলেজসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ভবনও আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত জেলা প্রশাসন থেকে কোনো দুঃসংবাদ আমরা পাইনি।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, এখন পর্যন্ত ফণী মোকাবিলায় আমরা সক্ষম হয়েছি। সম্ভাব্য উপদ্রুত জেলাগুলোতে খাবার ও নগদ টাকা পৌঁছে দেওয়া আছে। আরও ৪০ কোটি টাকা মজুত আছে। ফণীর কারণে যেন কোনো প্রাণনাশের ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে আমরা সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব মো. নজিবুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে সরকারি সফরে লন্ডনে রয়েছেন। সেখান থেকেই তিনি সার্বক্ষণিক ফণীর মনিটরিং অব্যাহত রেখেছেন, আমাদের বিভিন্ন নির্দেশনা দিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ও ঘূর্ণিঘড় ফণী নিবিড়ভাবে মনিটরিং করছে।
ফণী আঘাত হানলে দুর্গতদের উদ্ধার তৎপরতা ও চিকিৎসাসেবা বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বলেন, উপকূলে উদ্ধার তৎপরতার জন্য নৌবাহিনীর ৩২টি জাহাজ প্রস্তুত আছে। এসব জাহাজে বিশুদ্ধ খাবার পানি, স্যালাইনসহ ওষুধ ও শুকনো খাবার মজুদ আছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে স্থলপথ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও জলপথে এসব জাহাজ কাজ করবে। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, উপকূলের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তায় সেনা সদস্য, কোস্টগার্ড, পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত আছে। এছাড়া, যারা আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন, তাদের ঘরবাড়ির সুরক্ষাতেও কোস্টগার্ড, পুলিশ, র‌্যাবসহ আনসার-ভিডিপি তৎপর রয়েছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে