বায়া সেফ হোমের পরিচালকের বিরুদ্ধে কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ

প্রকাশিত: মে ২, ২০২১; সময়: ৮:৩০ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক : মহিলা ও শিশু-কিশোরী হেফাজতিদের নিরাপদ আবাসন কেন্দ্র হিসেবে দেশে গড়ে তোলা হয় ছয়টি সরকারি ‘সেফহোম’। এগুলোর একটি রাজশাহী মহানগরীর উপকণ্ঠে অবস্থিত বায়া ‘সেফহোম’। বর্তমানে সেফহোমটি শিশু-কিশোরীদের জন্য আর নিরাপদ নয়।

অভিযোগ রয়েছে, সেফহোমের পরিচালক মোছা. লাইজু রাজ্জাক আশ্রিতদের দিয়ে জোরপূর্বক শ্রমিকের কাজ করান। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি বরাদ্দ থেকে অর্থ লুটপাট এবং সেফহোমের পুকুর, জমি ও অন্যান্য সম্পদ ব্যবহার করে কোটি টাকা আত্মসাত করেছেন তিনি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০৬ সাল থেকে এই সেফহোমের পরিচালক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন মোছা. লাইজু রাজ্জাক। দীর্ঘ সময় সেফহোমের দায়িত্বে থাকার ফলে সেখানে নিজস্ব রাজ্য কায়েম করেছেন তিনি। সেই রাজ্যে মুকুটবিহীন রাণী মোছা. লাইজু রাজ্জাক।

ফলে নিজের ইচ্ছেমত সম্পদের ব্যবহার ও ভোগ করে চলেছেন তিনি। আশ্রয় নেয়া নারী-শিশুদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিয়েই ছাড় দেন না। তাদের ওপর চালান নির্যাতনের স্টিম রোলার।

জানা গেছে, তার স্বামী মো. সিদ্দিকুর রহমান বায়া শিশুসদন কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা। ফলে এই দপ্তর সম্পর্কে তাদের দু’জনের স্পষ্ট ধারণা রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্বামী ও স্ত্রী মিলে বায়া সেফ হোমের কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সেফহোমের জন্য ফ্রিজ, টেলিভিশন, ফ্যান ক্রয় ও মেরামতের উদ্দেশ্যে ৪ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়। সেই বরাদ্দ থেকে শুধু টেলিভিশন ক্রয় ও পুরোনো ফ্যানগুলো মেরামত করিয়েছেন লাইলু রাজ্জাক। পুরোনো ফ্যানগুলো মেরামতের জন্য ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি ফ্যানের জন্য ৫০০ টাকা করে আদায় করেছেন তিনি। এভাবে সরকারি টাকা নয়ছয় করে চলেছেন এই কর্মকর্তা।

এছাড়া সেফহোমের ভেতরে ড্রেন নির্মাণের জন্য ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু এখনো নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। এই টাকাও ভোগ করতে বিভিন্ন ছক আঁকছেন লাইলু রাজ্জাক।

সেফ হোমের ভেতরে ২ বিঘা আয়তনের একটি পুকুর রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পুকুরটি লিজ না দিয়ে পরিচালক লাইলু রাজ্জাক নিজেই মাছ চাষ করেন। দীর্ঘদিন যাবত মাছ বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন তিনি।

এছাড়া সেফহোমের ভেতরে ব্যক্তিগতভাবে ছাগল, পাঁতিহাস, মুরগি ও সবজি চাষ করেন লাইলু রাজ্জাক। আর এসব চাষাবাদে শ্রমিক হিসেবে জোরপূর্বক আশ্রয় নেয়া নারী ও শিশুদের কাজ করান। সেফহোমের ভেতরে চাষকৃত এসব মাছ, শাক-সবজি আশ্রয় নেয়া নারী-শিশুদেরকে খাওয়ানোর নিয়ম থাকলেও তিনি তা করেন না। বরং এগুলো বিক্রি করে তিনি লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন।

জানা গেছে, বায়া সেফ হোমে বর্তমানে ১২০ জন নারী ও শিশু রয়েছেন। রমজান মাসেও জোরপূর্বক তাদের দিয়ে শ্রমিকের কাজ করান লাইজু রাজ্জাক। নির্যাতনের ভয়ে এসব বিষয়ে কথা বলতে কেউ সাহস করেন না।

পরিচালক লাইজু রাজ্জাকের নির্যাতনের একটি অন্যতম উদাহরণ কয়েকদিন আগে ঘটে যাওয়া একটি অমানবিক ঘটনা। কিছু দিন আগে মোছা. মিম (১৮) নামের হারিয়ে যাওয়া এক তরুণীকে উদ্ধার করে পুলিশ। মেয়েটি কথা বলতে পারেনা। এরপর তাকে বায়া সেফহোমে রাখা হয়। কিন্তু ওই কিশোরীকে সেবা দেয়া তো দূরের কথা তাকে দিয়ে বিভিন্ন কাজ করিয়ে নিতেন সেফহোমের পরিচালক।

গত বুধবার বেলা ১২টার দিকে বোবা মোছা. মিমকে জোরপূর্বক ছাগলের খাবার জন্য পাতা কাটতে গাছে তুলে দেন লাইজু রাজ্জাক। এসময় গাছ থেকে পড়ে গিয়ে বুকে গুরুতর আঘাত পান তিনি। পরে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়।

বুধবার খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মিমকে অক্সিজেন দিতে হয়েছে। চিকিৎসকরা জানান, তার অবস্থা সঙ্কটাপন্ন। তখনো কিছুই স্পষ্ট করে জানাতে পারেননি তারা। আর এ ঘটনায় সেফহোমে থাকা নারী-শিশুদের মাঝে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

এখানেই শেষ নয়, নারী-শিশুদেরকে ঘরগুলো দখলে নিয়েছেন স্টাফরা। আশ্রিত নারী-শিশুকে গাদাগাদি করে কয়েকটি ঘরে রাখা হয়। আর বাকি ঘরগুলো স্টাফদের বাসা হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে বায়া সেফ হোমে থাকা একাধিক নারী বলেন, আমরা নির্যাতিত নারী হিসাবে এখানে থাকি। কিন্তু পরিচালক আমাদের উপরে অমানবিক নির্যাতন করেন। আমরা ভয়ে কিছু বলতে পারিনা। মোছা. লাইজু রাজ্জাকের এ অমানবিক নির্যাতনের হাত থেকে তারা বাঁচতে চান বলে জানান এই প্রতিবেদককে।

এসকল অভিযোগ বিষয়ে জানতে রাজশাহীর বায়া সেফহোমের পরিচালক মোছা. লাইজু রাজ্জাকের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। তিনি এই প্রতিবেদককে সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, আমার একটা মানসম্মান আছে। বেকার আমাকে হয়রানি করা হবে। এছাড়া তার সাক্ষাতকার নিতে চাইলে তিনি অস্বীকার করে এ প্রতিবেদককে বাসায় দেখা করতে বলেন।

এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা সমাজসেবা অফিসের উপপরিচালক মোছা. হাসিনা মমতাজ বলেন, আমার কাছে এ ধরনের কোন অভিযোগ আসেনি। এছাড়াও আমি নিয়মিত সেখানে যাই, কোন অনিয়ম চোখে পড়েনি। অনিয়মের অভিযোগ পেলে তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন বলে জানান।

 

  • 113
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে