যেভাবে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণ করে সেনাবাহিনী

প্রকাশিত: এপ্রিল ১৭, ২০২২; সময়: ১২:৩২ pm |

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : পাকিস্তানে ইমরান খানের পতনের পর দেশটির রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকার কথা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ১০ এপ্রিল পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে হেরে পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন ইমরান খান

। তার পতনের পর পেছনের শক্তি হিসেবে আঙুল উঠেছে দেশটির সেনাবাহিনীর দিকে। বিশ্নেষকরা মনে করছেন, পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণেই সরে যেতে হয়েছে তাকে।

যদিও ইমরান খানকে পদ থেকে সরানোর পুরো স্ট্ক্রিপ্টে সেনাবাহিনীকে কখনোই মঞ্চে দেখা যায়নি। অতীতেও দেখা গেছে, পাকিস্তানের রাজনীতির যে কোনো পালাবদলের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততা অবশ্যম্ভাবী। প্রশ্ন উঠেছে, পাকিস্তানের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর এই প্রাধান্য, সেটি তারা কীভাবে অর্জন করেছে।

১৯৪৭ সালে যখন পাকিস্তান রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে, সেটি হয়েছিল রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাত ধরেই। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই দেশটির রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর প্রবেশ ঘটে। একেবারে শুরু থেকেই পাকিস্তানের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর সম্পৃক্ততা ছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেশটি জন্মলাভ করায় পাকিস্তানে শুরু থেকেই নিরাপত্তার ইস্যুটি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণে শুরু থেকেই সেনাবাহিনী গুরুত্ব পেয়ে এসেছে, যা ক্রমে রাজনীতিতে তাদের প্রভাব বিস্তারের পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

কিংস কলেজ লন্ডনের সমরবিদ্যা বিভাগের সিনিয়র ফেলো এবং পাকিস্তান বিশ্নেষক আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, ‘শুরু থেকেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে।

তারা কখনোই বেসামরিক নেতৃবৃন্দকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে দেয়নি। তারা নিজেরা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিত। প্রতিরক্ষা বিষয়ে সব সিদ্ধান্ত সেনাবাহিনী দ্বারাই প্রভাবিত ছিল।’

পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর অবস্থান বর্তমানে এমনই শক্তিশালী, কোনো রাজনৈতিক দলই তাদের সঙ্গে আপস না করে টিকে থাকতে পারে না। ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খানের নেতৃত্বে দেশটিতে প্রথম সামরিক অভ্যুত্থান হলেও তার আগে থেকেই শাসনব্যবস্থায় সামরিক-বেসামরিক যৌথ অংশীদারিত্ব চালু হয়ে গিয়েছিল। রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা এবং অদক্ষতার কারণে এটি হয়েছিল বলে মনে করেন বিশ্নেষকরা।

পাকিস্তানের ৭৫ বছরের মধ্যে ইতিহাসে সামরিক বাহিনী দেশ শাসন করেছে ৩৩ বছর। যখন তারা রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল না, তখনও তাদের প্রাধান্য ছিল সবকিছুতে। সেজন্য নিরাপত্তার প্রশ্নটিকে বারবার সামনে আনা হয়েছে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতিতেও দেশটির সেনাবাহিনীর প্রভাব ব্যাপক। বলা হয়ে থাকে, শত্রু কিংবা মিত্র যেমনই হোক, বহির্বিশ্বের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক কেমন হবে তা নির্ধারিত হয় দেশটির সেনা সদরে। এমনকি পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে বহির্বিশ্বের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতেও দেখা যায়।

পাকিস্তানের সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং করাচি কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের চেয়ারম্যান ইকরাম সেহগল পররাষ্ট্রনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রভাবকে যৌক্তিক বলে মনে করেন।

তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতিতে আর্মি সব সময়ই প্রভাবশালী। এর কারণও আছে। সেনাবাহিনীর যে গোয়েন্দা সংস্থা, তাদের খুবই সংগঠিত একটি ব্যবস্থা আছে, যা দিয়ে তারা খবর সংগ্রহ করে এবং সেগুলো বিশ্নেষণ করে। এরপর তারা সেটি পররাষ্ট্র দপ্তরে পাঠায়, তারা দপ্তরের সঙ্গে খুব নিবিড়ভাবে কাজ করে।’

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের ধরনে বদল এসেছে। কিছুদিন আগে ইমরান খানকে নিয়ে সংকটের সময় সেনাবাহিনী জানিয়ে দিয়েছিল তারা কোনো পক্ষে নেই।

তরুণ প্রজন্ম সেনাবাহিনীর সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলে রাজপথে বিক্ষোভ করছে। কিন্তু এই বিক্ষোভ সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব আর প্রাধান্য কমানোর মতো সক্ষমতায় খুব শিগগিরই যে পৌঁছাবে না- এ ব্যাপারে বিশ্নেষকরা নিশ্চিত।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপে