কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন উৎপাদন বৃদ্ধিতে কেন ভারতকে বেছে নিল যুক্তরাষ্ট্র?

প্রকাশিত: মার্চ ২১, ২০২১; সময়: ৭:৫২ pm |

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : গত মাসে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন সংগ্রহ করতে বিশ্ব যখন উঠেপড়ে লেগেছিল, তখন পশ্চিম ভারতের হিমাগারে পাঁচ কোটির বেশি ভ্যাকসিন মজুদ রাখা ছিল। ৫০ ফিটের চেয়েও অধিক উচ্চতায় ভ্যাকসিনগুলো সারিবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল।

বিপুল সংখ্যক এই ভ্যাকসিনের মজুদ সেরাম ইন্সটিটিউট অব ইন্ডিয়ার। মাত্র কিছুদিন আগেও ভ্যাকসিন শিল্পের বাইরে প্রতিষ্ঠানটির তেমন একটা পরিচিতি ছিল না। কিন্তু, বর্তমানে মাসে সাত কোটির বেশি ভ্যাকসিন উৎপাদনের মাধ্যমে ভারতীয় এই প্রতিষ্ঠানটি বৈশ্বিক করোনা মহামারির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে।

সম্প্রতি ভারতে ভ্যাকসিন উৎপাদন বৃদ্ধিতে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া ২০ কোটি ডলার অর্থ সহায়তা দানের প্রতিশ্রুতি করে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিশ্বব্যাপী আরও ১০০ কোটি ভ্যাকসিনের সরবরাহ নিশ্চিত করতে বেছে নেওয়া হয় ভারতকে। শুক্রবার চীনা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে গঠিত কোয়াড জোটের অনুষ্ঠিত প্রথম ভার্চুয়াল সম্মেলনে ভারতে ভ্যাকসিন উৎপাদন সক্ষমতার বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। সম্মেলনে ভারতসহ উল্লেখিত দেশ তিনটির নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

চীন এবং রাশিয়া উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তাদের নিজেদের তৈরি ভ্যাকসিন সরবরাহ করতে চাইছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র সবার আগে নিজ দেশের নাগরিকদের মধ্যে ভ্যাকসিন সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়।

শুক্রবার কোয়াড সামিট পরবর্তী এক প্রেস ব্রিফিং এ ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বলেন, “ভারতে ভ্যাকসিন উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের বিষয়ে আমরা কথা বলছি। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের মঙ্গলের জন্য এখানকার দেশগুলোতে ভ্যাকসিন রপ্তানির উদ্দেশ্যে চলছে এই আলোচনা। আমরা প্রকৃত অর্থেই সমগ্র অঞ্চলের মানুষকে টিকাদানের আওতায় আনার কথা বলছি”।

তবে, কোয়াড ভ্যাকসিন প্রকল্প নিয়ে এখনও কোনও শেষ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি বলে জানান ভারতীয় একজন কর্মকর্তা। প্রাথমিকভাবে, ভারতীয় প্রতিষ্ঠান বায়োলজিকাল ই লিমিটেডে এক বিলিয়ন ডোজ জনসন অ্যান্ড জনসন ভ্যাকসিন উৎপাদনের উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করা হবে। পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষ সেরাম ইন্সটিটিউট এবং নোভাভ্যাক্স ইনকেও বিনিয়োগ করার কথা চিন্তা করতে পারে বলে জানান ঐ কর্মকর্তা।

নতুন এই উদ্যোগের মাধ্যমে সেরাম ইন্সটিউটের সাফল্যেরই পুনরাবৃত্তি ঘটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। শুরুর দিকে সেরাম শুধুমাত্র উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কোভিড ভ্যাকসিন সরবরাহের উদ্দেশ্যে অ্যাস্ট্রাজেনেকার সাথে যোগাযোগ করে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বেও ভ্যাকসিন সরবরাহে নেমেছে সেরাম। এই মাসের শুরুতে তারা যুক্তরাজ্যে পাঁচ মিলিয়ন ডোজ ভ্যাকসিনের চালান পাঠায়।

বেশ কয়েক বছর ধরেই ভারত বিশ্বের বৃহত্তম ভ্যাকসিন উৎপাদনকারীর তালিকায় আছে। দেশটি আয়তনের দিক থেকে বিশ্বে উৎপাদিত মোট ভ্যাকসিনের অর্ধেকের বেশি উৎপাদন করে থাকে। উদীয়মান বাজার যেখানে স্বল্পমূল্যে ভ্যাকসিন প্রয়োজন, সেখানে বিপুল সংখ্যক ভ্যাকসিন সরবরাহের মাধ্যমে দেশটি বিশেষায়িত হয়ে উঠেছে।

বৃহৎ পরিসরে ভ্যাকসিন উৎপাদন ও বিতরণ কঠিন প্রমাণিত হওয়ায়, বহু দেশ এবং ভ্যাকসিন উৎপাদনকারীই এখন সাহায্যের জন্য ভারতের দিকে ঝুঁকছে।

সেরাম ইন্সটিটিউটের প্রধান নির্বাহী আদর পুনাওয়ালা বলেন, “অনেক মানুষই সম্ভবত বুঝেন না যে তারা কেন ভ্যাকসিন পাবেন না, কেনই বা সরবরাহের বিষয়টি এত কঠিন। বিপুল পরিমাণে উৎপাদনের বিষয়টি তারা গ্রাহ্যই করেন না। মাঝে মাঝে সত্যিকার অর্থে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের তুলনায় বিপুল পরিমাণে ভ্যাকসিনের উৎপাদন কঠিন হয়ে দাঁড়ায়”।

মহামারির আগে, সেরাম ইন্সটিটিউট প্রতি বছর দেড় বিলিয়ন ডোজ ভ্যাকসিন উৎপাদন করত। প্রতিষ্ঠানটি ইউনিসেফের মতো আন্তর্জাতিক সংগঠন এবং উদীয়মান বাজার অর্থনীতির জন্য বিশ্বস্ত সরবরাহকারীতে পরিণত হয়েছিল। সেরাম অধিকাংশ ভ্যাকসিনই এক ডলারের কম মূল্যে বিক্রি করে থাকে। কিন্তু এত স্বল্পমূল্যে বিক্রয়ের পরও একই সময়ে লাখ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন উৎপাদনের মাধ্যমে তারা লাভ করে থাকে। এক দশক ধরে তারা যে ধরনের দক্ষতা, সরঞ্জামাদি এবং বিশ্লেষণ ক্ষমতা অর্জন করেছে তার সাথে খুব কম প্রতিষ্ঠানই টেক্কা দিতে পারবে।

বৃহৎ পরিসরে অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিন উৎপাদনের সবথেকে কার্যকরী উপায়টি বোঝার জন্য কয়েক মাস সময় লাগে বলে জানান সেরামের নির্বাহী পরিচালক উমেশ শালিগ্রাম। “আপনাকে কিছু জিনিস বুঝতে হবে, আপনার সেলগুলো কেমন আচরণ করছে, ভাইরাসের আচরণ কী ধরণের- সেসব অনুধাবন করতে হবে। এসব বোঝার জন্য কিছু সময়ের প্রয়োজন। প্রতি ব্যাচ ভ্যাকসিন উৎপাদনের পর আপনি বিষয়গুলো আগের চেয়ে আরও ভালো বুঝতে পারবেন।”

ডিসেম্বর নাগাদ সেরাম মাসে ৩০ মিলিয়ন ডোজ ভ্যাকসিন উৎপাদন শুরু করে। এই মাসে প্রতিষ্ঠানটি ৭০ মিলিয়ন ডোজের অধিক ভ্যাকসিন উৎপাদন করছে। আগামী দুই-এক মাসের মধ্যেই ভ্যাকসিনের উৎপাদন ১০০ মিলিয়নে গিয়ে পৌঁছাবে বলে আশা করছে প্রতিষ্ঠানটি।

আদর পুনাওয়ালা বলেন, “আমরা মাসিক হারে যা করছি, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান তা বাৎসরিক ভিত্তিতে করে থাকে। আমরা রেকর্ড সময়ের মধ্যে এসব সরঞ্জাম ও সুবিধাদির ব্যবস্থা করতে কঠিন পরিশ্রম করেছি।”

তবে, সেরামের এই সাফল্য তাদের জন্য নতুন এক বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। বিশ্ব-ব্যাপী যখন প্রতিষ্ঠানটি বিপুল পরিমাণে ভ্যাকসিন রপ্তানি শুরু করেছে, তখন তা সর্বপ্রথম ভারতীয়দের জন্য কেন রাখা হল না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রথম বিশ্বের দেশগুলোতে ভ্যাকসিন পাঠানো শুরু হলে অন্যান্য দেশও তাদেরকে ভ্যাকসিন না দেওয়ার কারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

গত মাসে করা এক টুইটে আদর পুনাওয়ালা লিখেন, “আমি সবাইকে শান্ত থাকার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি, @সেরামইন্সটইন্ডিয়া কে সমগ্র বিশ্বের ভ্যাকসিন চাহিদায় ভারসাম্য আনার পাশাপাশি ভারতের বিপুল চাহিদাকে প্রাধান্য দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া আছে। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।”

সূত্র: ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল

  • 7
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে