হতাশ রাজশাহীর ৭ করোনা যোদ্ধা

প্রকাশিত: আগস্ট ৩০, ২০২১; সময়: ৮:২৪ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আরটি পিসিআর কোভিড-১৯ ল্যাবে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দেড় বছর ধরে জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে বিনা পয়সায় কাজ করে যাচ্ছেন একদল তরুণ টেকনোলজিস্ট। কিন্তু সরকার বা কর্তৃপক্ষের কোন সহযোগিতা না থাকায় তারা আজ হতাশার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছেন।

২০২০ সালের জুলাই মাসে করোনা মহামারিতে বিশ্ব যখন টালমাটাল, রামেক হাসপাতালের পিসিআর ল্যাবে মাত্র ২ জন মলিকুলার বায়োলজিস্ট আর ৫ জন টেকনোলজিস্ট নিয়ে শত শত রোগী সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্তৃপক্ষ।

ঠিক তখন-ই স্বাস্থ মন্ত্রণালয়ের এক আহবানে দেশের অন্যান্য মেডিকেল কলেজের মতই রাজশাহীতেও একঝাঁক মেধাবী-সাহসী সদ্য পাশ করা মেডিকেল টেকনোলজিস্ট স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সামাজিক, পারিপার্শ্বিক সব বাধা আর ভয় ভীতিকে তুচ্ছ করে কাজ শুরু করেন। এই এক বছরে বেশীরভাগ স্বেচ্ছাসেবীরা নানা প্রতিকুলতায় ঝরে গেলেও এখনও কাজ করে যাচ্ছেন ওরা ৭ জন।

এই ৭ করোনা যোদ্ধা হলেন, নওগাঁ জেলার মান্দার ফয়েজ উদ্দীনের ছেলে ইসমাইল হোসেন, রাজশাহী জেলার পুঠিয়ার কফিল উদ্দিন মৃধার মেয়ে শিরিন সুলতানা, দাসপুকুের আব্দুস কুদ্দুসের মেয়ে শারমিন আক্তার, নওগাঁ জেলার পোরশার ফজলুল হক’র ছেলে গোলাম মাওলা, নগরীর কোর্ট বুলনপুরের আইজুদ্দিনের মেয়ে আসিয়া খাতুন, বগুড়া জেলার শেরপুরের সুজাউদ্দৌলার ছেলে মিল্লাত হুসাইন ও রাজশাহী জেলার দূর্গাপুরের মোস্তফা জামালের মেয়ে মমতাজ খাতুন।

এদিকে একই শর্তে কাজকরা একই যোগ্যতা সম্পন্ন দেশের অন্যান্য মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ল্যাবের মধ্যে শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন এন্ড রেফারেল সেন্টার সহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের করোনা স্বেচ্ছাসেবক টেকনোলজিষ্টদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপসচিব আনজুমান আরা স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনের বলে আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহন নীতিমালা-২০১৮’র ৩(৮) অনুচ্ছেদের আলোকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এতে করে তাদের হতাশা আরো বেড়ে গেছে।

তারা বলেন, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগ প্যাথলজি’র মলিকুলার বায়োলজি ল্যাবরেটরী, যা মূলত RT-PCR Covid-19 সনাক্তকরণ ল্যাব হিসেবে পরিচালিত। ল্যাবটি গত ১৮ এপ্রিল’২০ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। শুরুর দিকে ল্যাবটিতে ২ জন মলিকুলার বায়োলজিস্ট এবং ৫ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োজিত ছিলেন।

পরবর্তীতে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় নমুনা পরীক্ষা আরও অনেকাংশেই বৃদ্ধি পায়,ফলে আরও জনবলের দরকার হয়। হাসপাতালের তৎকালীন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জামিলুর রহমান স্যারের তত্ত্বাবধানে শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ অন্যান্য সকল যোগ্যতার নির্বাচন ভিত্তিতে স্ব উদ্যোগে কাজ করার আদেশক্রমে স্মারক নম্বর রামেকহা /প্রশা ২০২০ ৩৩০৩(১৭) এর ভিত্তিতে জুন ২০২০ থেকে প্যাথলজি ল্যাব/ ইনচার্জ এর অধীনে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ শুরু করি।

যদিও আমাদেরকে বলা হয়েছিল হাসপাতালের ফান্ড থেকে মাসিক সম্মানী এবং সরকারিভাবে নিয়োগের কোন সুযোগ আসলে আমরা তা পাবো। কিন্তু গত ১৪ মাস যাবত আমরা এমন কোন সুযোগ পাইনি।

এমতাবস্থায় বাহিরে থাকা খাওয়া নিয়ে আমরা আর্থিকভাবে সংকটে পড়ে যাই, বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে, বর্তমান পরিচালক ব্রিগেডিয়ার শামীম ইয়াজদানী স্যার আমাদের মানবিক দিক বিবেচনা করে কিছু সম্মানির ব্যবস্থা করেন, যা আমাদের থাকা-খাওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান/ হাসপাতালে করোনা জনিত কারনে কর্মরত ২০২ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট কে মহামান্য রাষ্ট্রপতির সানুগ্রহ অনুমোদন করে নিয়োগের স্বাভাবিক নিয়ম-কানুন ও শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ সকল যোগ্যতা প্রমার্জন করে সরাসরি নিয়োগ এবং আউটসোর্সিং নিতিমালা ২০১৮ ৩ (৮) অনুযায়ী ৭০ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট কে আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়া হয়। ঐ সময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য আমাদের নামের তালিকা একাধিকবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও কোন সাড়া মেলেনি।

দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় আমরা একাধিকবার covid-19 আক্রান্ত হওয়া সত্বেও প্রাণের মায়া ত্যাগ করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে অদ্যবধি হাসপাতালে রোগীদের নিরলসভাবে সেবা প্রদান করে যাচ্ছি। এই ১৪ মাসের ৪ টি ঈদ-সহ অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনগুলোতেও আমরা কসজ করে যাচ্ছি অবিরত। আমাদের মধ্যে একজন নারী সহকর্মী প্রেগন্যান্ট অবস্থাতেও ডিউটি করে যাচ্ছেন।

বর্তমানে ল্যাবটিতে হাসপাতালে ভর্তি রোগী ও অন্যান্য রোগীসহ প্রতিদিন গড়ে ২৫০ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। covid-19 এর মত প্লাটফর্মে আমরা নিরলস ভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছি, কিন্তু সরকারিভাবে কোনো সুযোগ না পাওয়ায় আজ আমরা দিশেহারা।

তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মহামান্য রাষ্ট্রপতি সহ সংশ্লিষ্ট সকলের উপর আমাদের দাবি যেন আমাদের মানবিক দিক বিবেচনা করে স্ব উদ্যোগে কর্মরত ৭ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট কে স্থায়ী নিয়োগ দানে সদয় মর্জি হয়।

রামেক হাসপাতালের Covid-19 ল্যাব ইনচার্জ ডাঃ মাহমুদা নাজনীন মমো বলেন, অনুদানের টাকা থেকে ওদের সম্মানিভাতা মাসিক ৫০০০ টাকা করে দেয়া হয়, মাঝে অনিয়মিত ছিল, এপ্রিলে ডিউ বিল ক্লিয়ার করা হয়েছে ; জুলাই পর্যন্ত আপডেট করা আছে। শুরু থেকে এ পর্যন্ত ওরা অনেক পরিশ্রম করছে, এর মধ্যে একেকজনের তিন চারবার করোনা পজিটিভ হয়েছে, বুঝতেই পারছেন, তাদের বর্তমান শারীরিক অবস্থা ; এর মধ্যে একটা মেয়ে প্রেগন্যান্ট, তারপরেও কাজ করছে।

ওরা যে সাহসিকতার সাথে পরিশ্রম করছে, তাতে করে পারমানেন্ট জব বা আউট সোর্সিং বেসিসে, যেটাই হোক, আমি মনে করি এটা পাওয়া ওদের অধিকার ; তাছাড়া আমি যেহেতু ওদের ইনচার্জ, খুব কাছ থেকে ওদের কাজগুলো দেখেছি, ওদের ভালো কিছু হলে আমিও মন থেকে শান্তি পাবো।

মুঠোফোনে চেষ্টা করে রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার শামীম ইয়াজদানীকে না পাওয়ায় মোবাইলে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তাঁকে না পাওয়ায় বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

এদিকে, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ও রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, আমার জানা মতে অল্প হলেও কিছু সম্মানী তাদের পাবার কথা, আমি ঢাকাতে আছি, রাজশাহীতে ফিরে বিষয়টি জেনে যথাযথ ব্যবস্থা নেব।

আর কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবেও সম্মানী না পায়, সেটা আমাকে জানালে ব্যবস্থা গ্রহন করবো। দেশের অন্য মেডিকেলে একই শর্তে কাজ করা অনেকের স্থায়ী চাকরি হয়েছে জানালে তিনি বলেন, এরকমটি আমার জানা নেই, এরকম হয়ে থাকলে আমি জানতাম।

  • 22
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে