করোনা চিকিৎসায় টিকাগুলো কতোটা স্থায়ী সুরক্ষা দেয়?

প্রকাশিত: এপ্রিল ১৪, ২০২১; সময়: ১:৪১ pm |

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : বিশ্ব কাঁপছে করোনার প্রাণসংহারী ত্রাসে, বিপর্যয় দেশের জনজীবনেও। এর মধ্যেই দেশে-বিদেশে ভাইরাসের নতুন ধরন হয়ে উঠছে সংক্রমণের প্রধান উৎস। যা প্রথম প্রজন্মের কোভিড টিকাগুলোর প্রদত্ত সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

প্রতিষেধকের ডোজ মজুতের মাধ্যমে টিকাদানে এগিয়ে গেছে উন্নত বিশ্বের দেশগুলো। দুনিয়ার এক নম্বর অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রে টিকাগ্রহণের পর একটি বড় অংশের নাগরিক চার মাস অতিবাহিত করে ফেলেছেন। তারা স্থায়ী সুরক্ষা পেয়েছেন কিনা সেই প্রশ্নটি নিয়েই এখন আলোচনা চলছে।

দেশটিতে দামি ও তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর ফাইজার, মডার্না ও জনসন অ্যান্ড জনসন কোম্পানির তৈরি প্রতিষেধক দেওয়া হচ্ছে। এগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে দেওয়া টিকার অবস্থাটাও তুলে ধরতে পারবে।

টিকাগুলোর গুণাগুণ নিয়ে পাওয়া সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক তথ্য পর্যালোচনার ভিত্তিতে বেশকিছু প্রশ্নের উত্তর তুলে ধরেছে প্রভাবশালী মার্কিন গণমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।

টিকা নিয়ে কোভিড-১৯ থেকে কতদিন সুরক্ষা পাওয়া যায়? সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কি ডোজের কার্যকারিতা কমে?

ফাইজার ভ্যাকসিন অন্তত ছয় মাস সুরক্ষা দেয়। এই সময়ে টিকাগ্রহীতার দেহে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি সুরক্ষা তেমন একটা কমে না বলে মানব ট্রায়ালে প্রমাণিত হয়েছে। মডার্নার তৈরি টিকা নেওয়ার ছয় মাস পরও পর্যাপ্ত পরিমাণ অ্যান্টিবডির উপস্থিতি মিলেছে গ্রহীতার রক্তরসে। নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণা সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

টিকা দুটি নিলে কেবল ছয় মাস পর্যন্ত সুরক্ষা মিলবে- অনেকেই ভুল করে তা মনে করেছেন বলে জানান ইউনিভার্সিটি অব পেনিসিলভানিয়ার মাইক্রোবায়োলজির অধ্যাপক স্কট হেন্সলি। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, “বিশ্বাসটি একেবারেই ভুল, আসলে এপর্যন্ত আমরা টিকাদানের পর ছয় মাস সময় পেয়েছি, তাই ছয় মাস পর্যন্ত সুরক্ষার তথ্যই আছে। যেমন এখন থেকে আরও ছয় মাস পর জানা যাবে- সুরক্ষা এক বছর পর্যন্ত থাকে কিনা। আর তেমনটা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।”

ভ্যাকসিনগুলোর সুরক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে?

ইউনিভার্সিটি অব অ্যারিজোনার ইম্যিউনোবায়োলজির সহযোগী অধ্যাপক দীপ্ত ভট্টাচার্য বলেন, মানবদেহে রোগ প্রতিরোধের নানা স্তরে ভ্যাকসিনগুলো নেওয়ার ফলে প্রাপ্ত সুরক্ষা দীর্ঘসময় ধরে থাকতে পারে।

এক্ষেত্রে, মডার্না ও ফাইজার ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ নেওয়ার পরই পাওয়া যায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রতিরোধ ক্ষমতা। আর দ্বিতীয় ডোজ রক্তরসে অ্যান্টিবডি ও টি সেলের মাত্রা বাড়ায়।

জনসন অ্যান্ড জনসন ভ্যাকসিনের সুরক্ষাও কি ফাইজার ও মডার্নার মতো দীর্ঘস্থায়ী?

নিজেদের ভ্যাকসিন তৈরির ক্ষেত্রে ভিন্ন ধরনের জৈবপ্রযুক্তি প্লাটফর্ম ব্যবহার করেছে জনসন অ্যান্ড জনসন। তবে টিকাটি বেশিদিন আগে দেওয়া শুরু না হওয়ার অন্যদুটির মতো এর ব্যাপারে বেশি তথ্য পাওয়া যায়নি।

জনসনের টিকাগ্রহীতাদের মধ্যে দুই সপ্তাহ পর থেকে ৭০ দিন পর্যন্ত অ্যান্টিবডির মাত্রা বাড়তে দেখা গেছে। তাই কোম্পানিটির আবিষ্কৃত টিকার কার্যকারিতা ফাইজার ও মডার্নার চেয়ে কম বলা হলেও, বাড়তে বাড়তে এক পর্যায়ে এটি অন্যদের মতোই সমান সুরক্ষা দেবে বলে মনে করেন দীপ্ত ভট্টাচার্য।

ভ্যাকসিন কী জীবনভর কোভিড-১৯ রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা দেবে?

আগেই বলা হয়েছে, ভ্যাকসিন মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার নানা স্তরকে প্রভাবিত করে। তাই নানা মাত্রায় সুরক্ষা কয়েক বছর বা কারো কারো ক্ষেত্রে কয়েক যুগও স্থায়ী হতে পারে। কিন্তু, সেটা এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না বিজ্ঞানীরা।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার মেডিসিনের অধ্যাপক মনিকা গান্ধী বলেন, ২০২০ সালে নেচার জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে, কোভিড-১৯ সৃষ্টিকারী ভাইরাসের উত্তরসূরী সার্স ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের দেহে এখনও এর বিরুদ্ধে টি সেল নামক সুরক্ষা কোষ কাজ করছে।

টিকা নেওয়ার সাত সপ্তাহ পর ফাইজার ভ্যাকসিন গ্রহণকারীদের মধ্যে অ্যান্টিবডির মাত্রা কমে গেলেও, মেমোরি বি সেল তৈরি হওয়া অব্যাহত থাকার প্রমাণ মিলেছে বলেও ড. গান্ধী উল্লেখ করেন। আসলে মেমোরি বি সেল আমাদের রক্তের শ্বেতকণিকায় থাকে, পরবর্তীতে এই কোষকে বুস্টার ডোজের মাধ্যমে আবারও পর্যাপ্ত পরিমাণে অ্যান্টিবডি উৎপাদনের জন্য উদ্দীপ্ত করে তোলা সম্ভব।

২০০৮ সালে নেচার ম্যাগাজিনে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় বলা হয়, ১৯১৮ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারি থেকে বেঁচে যাওয়া অনেকের দেহে ৯ দশক পরও ইনফ্লুয়েঞ্জা জীবাণুর সংস্পর্শে আসার পর মেমোরি বি সেল থেকে অ্যান্টিবডি উৎপাদনের প্রমাণ মিলেছে।

জীবাণুর নতুন ধরনগুলো কী ভ্যাকসিন থেকে পাওয়া সুরক্ষার স্থায়িত্ব বদলাতে পারে?

সার্স কোভ-২ ভাইরাসের মতো যেকোনো অণুজীবের জীবনচক্রে অভিযোজন একটি চলমান প্রক্রিয়া। এব্যাপারে এখনও নিশ্চিত করে অনুমান করা তাই সম্ভব নয়। এপর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে দেওয়া ভ্যাকসিনগুলো নতুন ধরনগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষা দিতে পারে বলেই প্রমাণ মিলেছে। তবে আরও বিপজ্জনক ধরনের আবির্ভাব ঘটলে তখন কি হবে –তা বলা মুশকিল। এমন ধরনগুলো ভ্যাকসিন গ্রহণের মাধ্যমে পাওয়া শারীরিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়ার শক্তি অর্জন করতে পারে।

ড. ভট্টাচার্য বলেন, “এখনও শনাক্ত করা না গেলেও নিঃসন্দেহে এমন ধরনের উপস্থিতি আছে। সত্যিই থাকলে টিকে থাকার স্বার্থেই তারা জনস্বাস্থ্যের জন্য ব্যাপক হুমকি সৃষ্টি করবে, ফলে বাধাগ্রস্ত হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রে গোষ্ঠীবদ্ধ অনাক্রম্যতা বা হার্ড ইম্যিউনিটি অর্জনের চেষ্টা।”

এই পরিস্থিতিতেই আসলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে শরীরে বিদ্যমান অ্যান্টিবডির মাত্রা। ড. হেন্সলি বলেন, “এমআরএনএ প্রযুক্তি ব্যবহারকারী ভ্যাকসিন প্রাকৃতিক সংক্রমণের চাইতে অনেক বেশি পরিমাণে অ্যান্টিবডি তৈরিতে সাহায্য করে। আর বেশি পরিমাণে অ্যান্টিবডি থাকলে নতুন ধরনের ভাইরাস যতোই ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করুক, কোনো না কোনো অ্যান্টিবডি তাকে আক্রমণ করবেই। আর এভাবেই কিছুটা সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব। তবে সেই রক্ষাকবচ কতোটা শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী হবে তা আমাদের জানা নেই।”

সূত্র:ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

  • 20
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে