২০২১ সালেই পুরুষদের জন্মবিরতিকরণ পিল পাওয়া যাবে?

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৩০, ২০২০; সময়: ৫:১৫ pm |

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : গর্ভনিরোধক বা জন্মবিরতিকরণ পিল বলতে সাধারণত সকলে নারীদের সেবন উপযোগী পিল বুঝে থাকে। এবার আশা করা হচ্ছে, ২০২১ সালের মধ্যে পুরুষদের জন্যও জন্মবিরতিকরণ পিল বাজারে বিকোবে।

ব্রিটেনে আজ থেকে ৬০ বছর আগেই নারীদের পিলের প্রচলন হয়। পুরুষের জন্য পিলও চলে আসছে গত ২৫ বছর যাবত বিজ্ঞানীরা অবিরাম বলে চলেছেন, তবু এখনো শেষটা কেউ দেখে উঠতে পারেনি। নতুন করে আবারো আশায় বুক বাঁধা হচ্ছে ২০২১ এর জন্য।

সর্বশেষ গবেষণা অনুযায়ী, পুরুষরা তাদের জন্য প্রতিরোধমূলক পণ্যগুলো শীঘ্রই গ্রহণ করতে সক্ষম হবে- জেল, পিল,মাসিক ইনজেকশান এমনকি প্রতিবর্তনযোগ্য বন্ধ্যাকরণ অস্ত্রোপচার- সবকিছুই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলেছে।

সাধারণ চোখে মনে হয়, পুরুষদের প্রজননতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ অপেক্ষাকৃত সহজ। নারীদের চাইতেও এখানে জটিলতা কম।

অথচ সত্যিটা পুরোই উলটো। একজন পুরুষের জৈবিক উদ্দেশ্য হলো তাঁর জিনগুলোকে ছড়িয়ে দেয়া, বংশবিস্তার করা। সারাদিন জুড়ে একজন প্রজননে সক্ষম পুরুষ প্রতি সেকেন্ডে এক হাজার শুক্রাণু উৎপাদন করেন, জৈবিক ক্রিয়ার সময় নির্গত করেন ২৫০ মিলিয়ন শুক্রাণু-এই বিপুল পরিমাণ শুক্রাণুর কৃত্রিমভাবে নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করা কার্যকরভাবেই কঠিন। অন্যদিকে প্রাকৃতিকভাবে একজন নারী প্রতি মাসে মাত্র একটি অথবা দুটি ডিম্বাণু নিঃসরণ করেন।

১৯৫০ সালে বিজ্ঞানীরা সর্বপ্রথম পুরুষদের জন্য পিল তৈরীর চেষ্টা করেন। তাঁরই অংশ হিসেবে মার্কিন কোম্পানী স্টার্লিং ড্রাগ একটি পরজীবি- বিরোধী চিকিৎসার পরীক্ষামূলক প্রয়োগের সময় এক অনাকাঙ্ক্ষিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখতে পান; এটি পুরুষ ইঁদুরদের অস্থায়ীভাবে উৎপাদনে অক্ষম করে তোলে।

তারা কারাগারের পুরুষ বন্দীদের ওপরও যৌগটি প্রয়োগ করেন এবং দেখতে পান যে, তাদের শুক্রাণুর সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু বন্দীরা যখন চোরাইপথে চালানকৃত হুইস্কি পান করে তখন তারা ভয়াবহ পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার শিকার হন। তাদের প্রচন্ড বমি হয় এবং হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় অনেকগুণ। ফলশ্রুতিতে স্টার্লিং সেবার তাদের সেই ঔষধের প্রয়োগ বন্ধ করে দেয়।

বর্তমানে পুরুষদের কাছে জন্ম নিয়ন্ত্রণের দুটি বিকল্প রয়েছে- কনডমের ব্যবহার এবং স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ অস্ত্রোপচার- সেখানে সার্জন শুক্রাণু বহন করা টিউবটি কেটে ফেলেন বা বন্ধ করে দেন। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জোয়ার নয়া মোড় নিচ্ছে এখন। নতুন এক ধরণের গর্ভনিরোধক জেল এখন আবারো আশা দেখাচ্ছে। ইতিমধ্যেই এই জেলটি ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের কিছু দম্পতির মাঝে পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে।

জেলটি পুরুষ হরমোন টেস্টোস্টেরন এবং সেজেস্টেরোন এসিটেটের সংমিশ্রণ (যার বাণিজ্যিক নাম নেস্টোরন)।

নেস্টোরন টেস্টিসে শুক্রাণুর উৎপাদন এমন প্রক্রিয়াতে কমিয়ে ফেলে যে তা পুরুষের লিবিডোকে (যৌনক্রিয়া) প্রভাবিত না করেই শুক্রাণুর উৎপাদন কার্যকরভাবে প্রতিহত করে।

পরীক্ষামূলক প্রয়োগের অংশ হিসেবে, পুরুষেরা এই জেল তাদের কাঁধে এবং উপরের বাহুতে প্রতিদিন মাখবেন। হরমোন তাদের ত্বকের নিচে শোষিত হবে এবং পরবর্তী ২৪ ঘন্টায় আস্তে আস্তে তা রক্তস্রোতে মিশে যেতে থাকবে। ব্রিটেনে এটি এডিনবরা ইউনিভার্সিটি এবং ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট কর্তৃক পরীক্ষিত হচ্ছে।

এডিনবরা গবেষণা দলের অধ্যাপক রিচার্ড এন্ডারসন বলেন, আমরা এখন পাঁচজোড়া দম্পতির ওপর এই পরীক্ষাটি পর্যবেক্ষণ করছি যারা গত এক বছর যাবত কোনরূপ অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই জন্মবিরতিকরণ জেল ব্যবহার করে চলেছেন। যদিও পুরোপুরি সিদ্ধান্তে আসতে আরো বছর তিনেক লেগে যাবে। সমীক্ষার লক্ষ্য ৪৫০ জোড়া দম্পতি তাদের প্রধান জন্মবিরতিকরণ পদ্ধতি হিসেবে এই জেল গ্রহণ করবেন।

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে এই জেলের পরীক্ষামূলক ব্যবহার পরিচালনা করছেন, ড ক্রিস্টিনা ওয়াং। তিনি লস এঞ্জেলস বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের একজন পর্যবেক্ষক। ক্রিস্টিনা বলেন, পুরুষ জন্মবিরতিকরণ ঔষধ প্রয়োগের তিনটি সুপ্ত পদ্ধতি রয়েছে -পিল হিসেবে, জেলের সাথে মিশিয়ে, এবং মাসিক ভিত্তিতে ইঞ্জেকশান প্রয়োগ। তিনটিরই ভিন্ন ভিন্ন সুবিধা রয়েছে।

“মানুষের কাছে পিল সেবনের ধারণাই অধিকতর জনপ্রিয় কারণ এটি সবচাইতে সহজ। অথচ পিলের মাধ্যমে মাত্র ১-৩ শতাংশের মত ড্রাগ শোষিত হয়ে থাকে। জেলের ভেতর দিয়ে শোষিত হয় প্রায় ১০ শতাংশ এবং সর্বাপেক্ষা কার্যকর ফলাফল পাওয়া সম্ভব ইনজেকশানে। এটি শতভাগ কার্যকর।”

“আমি মনে করি সর্বস্তরে বিক্রয়ের জন্য জেলটিকেই সর্বপ্রথম অনুমোদন দেয়া হবে। এরপরে ইনজেকশন। এখন পর্যন্ত পরিচালিত সমীক্ষার ফলাফল বলছে, জেলের ব্যবহার নিরাপদ, সহনশীল এবং শুক্রাণুর নিঃসরণ এটি উল্লেখযোগ্যহারে কমিয়ে দেয়।”

ইনজেকশান এবং পিলের বাকি আশাটুকু যে ঔষধ জিইয়ে রেখেছে তা হলো ডাইমথানড্রোলন আনডিক্যানোয়াট (ডিএমএইউ) । জেলের মত এটিও পুরুষ টেস্টোস্টেরন হরমোন এবং নারীদের প্রজেস্টিন হরমোন সহযোগে গঠিত।

ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির মেডিসিনের অধ্যাপক স্টেফানি পেইজ প্রাথমিক পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অংশ হিসেবে ডিএমএইউকে জেল এবং ইনজেকশান উভয় রূপেই ব্যবহার করছেন।

“আমাদের প্রথম পর্যায়ের সমীক্ষায় অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ফলাফল পাওয়া গেছে। এ পর্যন্ত ১০০জন পুরুষ ডিএমএইউ ইনজেকশান ব্যবহার করেছেন এবং প্রত্যেকের কাছেই এটি ছিল সহনীয় মাত্রার।”

এদিকে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ যে ট্রায়াল পরীচালনা করছেন,যা অনেকটাই প্রতিবর্তনযোগ্য বন্ধ্যাকরণ অস্ত্রোপচার (reversible vasectomy)। এটি হলো একপ্রকার শুক্রাণু নিরোধক ইনজেকশান যা গর্ভাবস্থা প্রতিরোধ করবে ১৩ বছর পর্যন্ত।

৩০০ এর অধিক পুরুষের ওপর এটি প্রয়োগ করা হয়ে গেছে। এই সমীক্ষার প্রধান ড রাধে শ্যাম শর্মা বলেন, আমাদের প্রক্রিয়াতে গর্ভনিরোধ সফলতার হার শতকরা ৯৭.৩ ভাগ। এবং এটি পুরোপুরি পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াহীন।

শেফিল্ড ইউনিভার্সিটির এন্ড্রলজির অধ্যাপক এলান পেসি তাই আগত পুরুষ পিল নিয়ে ভীষণ আশাবাদী। তিনি বলেন, “পুরুষদের রীতিমত এই পিলের ব্যবহার নিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে।”

“কবে কে ভেবেছিল পুরুষদের পাচনতন্ত্রগুলোকেও কার্যকর গর্ভনিরোধক হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।”

তবে নিয়ম করে গর্ভনিরোধক পিলের সরবরাহ খানিকটা অযৌক্তিক ঠেকেছে তাঁর কাছে। “প্রতি মাসে ইনজেকশান গ্রহণ করতে মনে হয় না পুরুষেরা সকলে রাজি হবেন” – যোগ করেন এলান ।

জেল বা ইনজেকশন- ধরন যাই হোক না কেন, পুরুষদের গর্ভনিরোধক ঔষধ যে নারীদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা তুলে ধরতে যাচ্ছে সেটি তো নিশ্চিত। তাছাড়া এটির ব্যবহার নিয়ে নারী তাঁর সঙ্গীর ওপর যথাযথ আস্থা রাখতে পারছেন কিনা সেটিও দেখার বিষয় ভবিষ্যতে।

সূত্র: মেইল অনলাইন

  • 59
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে