রামেক হাসপাতাল ঘিরে নৈরাজ্য

প্রকাশিত: মে ৯, ২০১৯; সময়: ৩:৩৪ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল গিরে গড়ে উঠেছে একটি নৈরাজ্য চক্র। রোগিদের জিম্মি করে তারা হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের অর্থ। কিন্তু তা দেখার যেন কেউ নেই।

১২০০ শয্যার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ওয়ার্ড রয়েছে ৫৭টি। প্রতিদিন হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নেন দুই থেকে আড়াই হাজার রোগী। সবচেয়ে বড় চিকিৎসা কেন্দ্র হওয়ায় পুরো অঞ্চলের রোগীরা ভিড় জমান রামেক হাসপাতালে। রোগীদের জিম্মি করে দীর্ঘদিন ধরেই হাসপাতাল কেন্দ্রিক নানান বাণিজ্য রমরমা।

হাসপাতাল থেকে নগরীর লক্ষ্মীপুর মোড়ের দূরত্ব সাকুল্যে ২০০ মিটারের মত। পায়ে হেটে যেত সময় লাগবে মিনিট দুয়েক। কিন্তু সল্প দূরত্বের এই পথ রোগীদের পাড়ি দিতেই গুনতে হয় অন্তত ৪০০ টাকা ভ্যান ভাড়া। অবিশ্বাস্য এই কাণ্ড প্রকাশ্যেই ঘটছে রামেক হাসপাতালে।

অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ এই ভ্যান চালকরা জিম্মি করছেন রোগী ও তাদের স্বজনদের। তাতে যোগসাজস রয়েছে হাসপাতালের এক শ্রেণির কর্মী এবং আইন-শৃংখলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীর সদস্যদের। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় দিন দিন বাড়ছে এদের দৌরাত্ম।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিদিন প্রায় ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ জন রোগী চিকিৎসার জন্য আসেন রামেক হাসপাতালের জরুরী বিভাগে। এদের মধ্যে অন্তত দেড়শ রোগী থাকেন মুমূর্ষু অবস্থায়। যাদের জরুরী পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন পড়ে। সার্বক্ষনিক রোগী ভর্তি হলেও দুপুর ১২টা পর্যন্ত রোগ নির্ণয় হয় হাসপাতালে।

জানা গেছে, গত ২৩ জানুয়ারী থেকে বিকল হাসপাতালের সিটি স্ক্যান মেশিন। সচল অবস্থায় সিটি স্ক্যান সেবা পেয়েছেন অন্তত: ২০ রোগী। এমআরআই মেশিন সচল থাকলেও সেবা পাচ্ছেন দিনে ৫ থেকে ৭ জন। এ ক্ষেত্রে ভরসা বাইরের রোগ নির্ণয় কেন্দ্রগুলো। তাছাড়া দুপুরের পর ভর্তি রোগীদের রোগ নির্ণয়ে যেতে হচ্ছে বাইরেই।

ব্রেন স্ট্রোক করে দুপুর ২টার দিকে হাসপাতালে আসেন খাইরুল ইসলাম (৬৫)। জরুরী বিভাগ থেকে তাকে পাঠানো হয়েছে নিউরো মেডিসিন বিভাগে। ওয়ার্ডের দায়িত্বরত ইন্টার্ন চিকিৎসক সিটি স্ক্যান-এমআরআই করাতে বলেন নগরীর বেসরকারি রোগ নির্ণয়কেন্দ্র পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।

রোগীর স্বজনরা বলেন, পপুলারে নেয়ার জন্য জরুরী বিভাগের সামনে আসতেই রোগীর ট্রলি ঘিরে ধরেন কয়েকজন ভ্যান, অটোরিকশা ও মাইক্রোবাস চালক। আগে থেকেই জরুরী বিভাগের সামনের গাছ তলায় বসে ছিলেন তারা।

রোগীর অবস্থা বিবেচনায় ভ্যানে নেয়ার সিদ্ধান্ত হলো। আর এ জন্য গুনতে হলো ৪০০ টাকা ভাড়া। সিটি স্ক্যান শেষে ওই ভ্যান রোগী পৌঁছে দিয়ে গেলো হাসপাতালে। রোগ নির্ণয়ে বাড়তি খরচের সাথে বাড়তি ভ্যান ভাড়ায় চরম বিপাকে তারা। তবে এনিয়ে ক্ষোভ জানানোর জায়গা নেই।

প্রতিদিন হাসপাতালের জরুরী বিভাগের সামনে অন্তত: সাতটি ভ্যান নিয়ে চালকদের অপক্ষেমান থাকে। এরা হাসপাতাল সংলগ্ন আশেপাশের এলাকার বাসিন্দা। রোগী বহণের জন্য বিশেষ কায়দায় ভ্যান প্রস্তুত করেছেন এরা। এখানে অন্তত: দশজন ভ্যান চালক প্রতিদিন বসে থাকেন।

সল্প দূরত্বের ভাড়া এতো বেশি কেনো? এমন প্রশ্নের জবাবে একজন ভ্যান চালক বলেন, দিনে দুই থেকে তিনটি ভাড়া তারা পান। ক্লিনিকে আনা নেয়া ছাড়াও তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষাতেও সহায়তা করেন। হাসপাতালে থাকতে ম্যানেজ করতে হয় পুলিশ-আনসারদের। বাড়তি ভাড়া না আদায় করলে টেকা মুশকিল। তবে রোগীদের তারা জোর করেননা বলে দাবি করেন এক ভ্যান চালক।

এদিকে, রামেক হাসপাতালের বেশির ভাগ ওয়ার্ডে ঘুরে দেখা যায়, কোন না কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোগীদের যেতে হচ্ছে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, গ্রীন ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মেডিপ্যাথ, ল্যাব কেয়ার, নর্থ বেঙ্গল ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালসহ লক্ষ্মীপুর মোড় ঘীরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন রোগ নির্ণয় কেন্দ্রে।

রোগীদের কাছ থেকে বাড়তি ভ্যান ভাড়া নেয়ার বিষয়টি স্বিকার করেছেন হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এনামুল হক। তার ভাষ্য, এনিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তেমন কিছুই করার নেই।

তিনি আরো বলেন, হাসপাতালে যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়, সেসব হাসপাতালেই করার কথা। কিন্তু বাইরের ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কেন পাঠানো হচ্ছে বলতে পারবো না। এটা চিকিৎসকরাই ভালো বলতে পারবেন।

রামেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের এই জিম্মি করার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন রাজশাহীর সামাজিক সংগঠন রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই নানান অব্যবস্থাপনা চলে আসছে হাসপাতালে। এতে হাসপাতালের এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত। এনিয়ে বিভিন্ন সময় আন্দোলনও করেছে রাজশাহীবাসী। কিন্তু প্রতিকার মেলেনি। সেবার মানোন্নয়নে অবিলম্বে এসব অব্যবস্থাপনা দূর করার দাবি জানান জামাত খান।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে