সেই মডেলদের নাইট পার্টিতে থাকতো ধনীর দুলালরা

প্রকাশিত: আগস্ট ৪, ২০২১; সময়: ১০:২৫ am |

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : গুলশান, বনানী ও বারিধারার মতো অভিজাত এলাকার ২০-২৫টি বাসায় প্রতি রাতে আয়োজিত নাইট পার্টিতে অংশ নেওয়া বিভিন্ন মডেলই একসময় এ চক্রের সদস্য হয়ে পড়েন। পার্টিতে অংশ নেওয়া ধনাঢ্য পরিবারের সদস্যদের অসতর্ক অবস্থার ছবি কৌশলে তুলে রাখতেন তারা। পরে এসব ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া এবং স্বজনদের কাছে পাঠানোর ভয় দেখিয়ে তাদের ব্ল্যাকমেইল করতেন মডেলরা।

পুলিশ বলছে, এই চক্রের সদস্য হয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছিলেন মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা, মরিয়ম আক্তার মৌ এবং অভিনেত্রী শিলা হাসান। মাদক মামলায় পিয়াসা ও মৌকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের কাছ থেকে জব্দ ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও অন্যান্য আলামত পরীক্ষা করে বেশ কিছু তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। তবে শিলা হাসান এখনও অধরা রয়েছেন।

উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তা জানান, নাইট পার্টির সক্রিয় সদস্য হিসেবে এমন ১০-১১ জনের নাম পাওয়া গেছে, যারা ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দক্ষিণের যুগ্ম কমিশনার হারুন অর রশীদ বলেন, পিয়াসা ও মৌকে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে। আমরা এই চক্রের সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকজনের নামও পেয়েছি। আরও অনেককেই আইনের আওতায় আনা হবে।

গুলশানের একটি ফ্যাশন হাউসের মালিকও রয়েছেন মডেলকেন্দ্রিক এই অপরাধ চক্রে। কয়েকটি শিল্প গ্রুপের ধনীর দুলালও ওই পার্টিতে গিয়ে এদের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। অনেক পার্টিতেই প্রায় নিয়মিত মাদক সেবন করা হতো। সবশেষে থাকত গ্রিন রুম পর্ব। এসব পার্টিতে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে নিজেদের মধ্যে অনেকবার মারামারি-সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। চক্রে জড়িত অনেক উঠতি মডেল ও নায়িকার বাসায় থাকত স্পাই ক্যামেরা। যা দিয়ে পার্টি চলার সময়ের ছবি ধারণ করা হতো। এরই মধ্যে মডেল পিয়াসার বাসায় এ ধরনের ক্যামেরা পাওয়া গেছে।

পুলিশ বলছে, সম্প্রতি প্রভাবশালী কয়েকজনকে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে যান মডেল ফারিয়া মাহাবুব পিয়াসা। নাইট পার্টির আড়ালে তাদের সঙ্গে আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণ করে রাখেন তিনি। এসব ছবি পরিবারের লোকজনের কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দেখিয়ে কয়েক কোটি টাকা দাবি করেন তিনি। বিষয়টি পুলিশকে জানান তারা। পুলিশ এ ঘটনায় তদন্তে নামার পর পিয়াসার মাদক ব্যবসার বিষয়টিও উঠে আসে। এরপর গ্রেপ্তার হন পিয়াসা।

গোয়েন্দারা বলছেন, পিয়াসার নির্দিষ্ট কোনো বৈধ পেশা নেই। নেই আয়ের বৈধ উৎস। অথচ তিনি চলাফেরা করেন বিএমডব্লিউ গাড়িতে। বাস করেন তিন লাখ টাকা ভাড়ার ফ্ল্যাটে। কখনও একটি বেসরকারি টেলিভিশনের পরিচালক হিসেবে, কখনও ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিতেন তিনি। কয়েকটি বিজ্ঞাপন চিত্রেও অভিনয় করেছেন তিনি।

তদন্ত সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, পিয়াসা ও মৌ বাসায় লাইসেন্সবিহীন মিনিবার গড়ে তুলেছিলেন। সেখানে বিদেশি নামিদামি ব্র্যান্ডের মদের পাশাপাশি ইয়াবাও বেচাকেনা হতো। পিয়াসা নিজের বাসায় প্রতিদিনই নাইট পার্টি করতেন। বাসার বিভিন্ন স্থানে গোপনে রাখা হতো সিসি ক্যামেরা। পার্টি চলার সময় আপত্তিকর ছবি তোলা হলেও সাধারণত প্রথমেই কাউকে ব্ল্যাকমেইল করা হতো না। ছবি ও ভিডিও সংরক্ষণ করা হতো। সময় ও সুযোগ বুঝে এসব ছবি ও ভিডিও ব্ল্যাকমেইল করার কাজে ব্যবহার করা হতো।

পিয়াসা ও মৌয়ের মোবাইল ফোন এখন তদন্ত সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের হাতে। উচ্চবিত্ত ও প্রভাবশালী অনেকেরই মোবাইল ফোন নম্বর রয়েছে তাদের কন্ট্রাক্ট লিস্টে। রয়েছে অনেকের সঙ্গে অন্তরঙ্গ ছবি ও ভিডিও।

তদন্ত সংশ্নিষ্টরা বলছেন, অভিজাত এলাকার অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তির পারিবারিক গোপনীয় তথ্যও পিয়াসা সংগ্রহ করতেন। এরপর টাকার বিনিময়ে সেসব তথ্য প্রতিদ্বন্দ্বী ধনাঢ্য পরিবারের সদস্যদের জানিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত তৈরি করতেন। পরে পিয়াসাই আবার তা মিটমাটের দায়িত্ব নিতেন।

গত রোববার রাতে প্রথমে বারিধারায় পিয়াসার বাসায় অভিযান চালায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ। গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। এরপর অভিযান চালানো হয় পিয়াসার অন্যতম সহযোগী মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে মৌয়ের বাসায়। তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানা এবং পিয়াসার বিরুদ্ধে গুলশান থানায় মাদকদ্রব্য আইনে মামলা করে পুলিশ। সোমবার তাদের তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে তাদের।

অভিনয়শিল্পী সংঘের বিবৃতি

দুই-একবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েই মডেল-অভিনেত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া’ তরুণীদের বিষয়ে বিবৃতি দিয়েছে অভিনয় শিল্পীদের সংগঠন ‘অভিনয় শিল্পী সংঘ’। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব নাসিম স্বাক্ষরিত এ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত পরিচয়, প্রভাব, কখনও বাহ্যিক সৌন্দর্য, কিছু ক্ষেত্রে কপালের জোরে দু-একটি বিজ্ঞাপন বা নাটকে কাজ করলেই তাকে মডেল বা অভিনেত্রী বলা যায় কিনা সেই ভাবনাটা জরুরি হয়ে উঠছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কালচারাল অ্যাক্টিভিস্ট, বিনোদন জগতের স্টেক হোল্ডার, মডেল বা অভিনেত্রী তকমা নেওয়ার বা দেওয়ার আগে তার কাজ, কাজের প্রতি আগ্রহ, সামাজিক দায়বদ্ধতা, প্রস্তুতি প্রভৃতি বিষয় বিবেচ্য হওয়া জরুরি।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, কোথাও পুলিশি অভিযানে ধরপাকড় হলে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় সংবাদ মাধ্যমে হেডলাইন হয়- অমুক মডেল বা অভিনেতা-অভিনেত্রী গ্রেপ্তার। এ ধরনের হেডলাইন, সর্বজন শ্রদ্ধেয়, প্রথিতযশা অভিনেতা অভিনেত্রী, মডেলসহ বিনোদন মাধ্যমে নিষ্ঠার সঙ্গে কর্মরত সবার জন্য সামাজিকভাবে অত্যন্ত বিব্রতকর এবং অসম্মানজনক হয়ে ওঠে।

বিবৃতিতে গণমাধ্যমের কাছে শিরোনাম করার সময় সংশ্নিষ্ট সংগঠনগুলো থেকে যাচাই করে এবং সংশ্নিষ্ট কাজে তার নিষ্ঠা ও অবদান ইত্যাদি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে পেশাগত দিকটিকে উল্লেখ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়।

  • 96
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে