পুনঃতফসিল তিন দফার বেশি হলে ঋণ নয়

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১০, ২০২১; সময়: ১১:৫২ am |

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত কুটির, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তাদের সহজে ঋণ দিতে আরও ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলের শর্ত আরও শিথিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ঋণঝুঁকির রেটিং পদ্ধতির সনদ ছাড়াই এখন প্রণোদনার অর্থ মিলবে।

পাশাপাশি ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। কোনো গ্রাহক আগে ঋণখেলাপি হয়ে যদি তিন দফার বেশি পুনঃতফসিল করে থাকেন তবে ওই গ্রাহক আলোচ্য প্রণোদনা তহবিল থেকে এখন কোনো ঋণ পাবেন না। একই সঙ্গে বর্তমানে ঋণখেলাপি থাকলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকও পাবেন না ঋণ।

এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একটি সার্কুলার জারি করে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে। এর নতুন শর্ত আরোপ ও আগের শর্ত শিথিল করার বিষয়টি ওইদিন থেকেই কার্যকর করা হয়েছে। প্যাকেজ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

উল্লেখ্য, করোনার ক্ষতি মোকাবিলার জন্য গত বছরের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত কুটির, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের আলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিমালা জারি করে। কয়েক দফা মেয়াদ বাড়িয়ে গত ৩০ জুন প্যাকেজের প্রথম দফার মেয়াদ শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় এই তহবিলে আরও ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে তহবিলের মোট আকার হলো ৪০ হাজার কোটি টাকা।

প্রথম দফার ২০ হাজার কোটি টাকা ইতোমধ্যে প্রায় বিতরণ হয়ে গেছে। এখন দ্বিতীয় দফার ২০ হাজার কোটি টাকা থেকে ঋণ বিতরণ হচ্ছে। এর মেয়াদ আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে আলোচ্য প্যাকেজের ঋণ বিতরণ করতে হবে।

প্রথম দফার ২০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে যেসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বরাদ্দ কোটা অনুযায়ী ঋণ বিতরণ করতে পারেনি তাদের তিরস্কার ও যারা বিতরণ করতে পেরেছে তাদের প্রশংসাপত্র দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হচ্ছে, ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রণীত গাইডলাইন্স অন ইন্টারনাল ক্রেডিট রিস্ক রেটিং সিস্টেমস ফর ব্যাংকস (আইসিআরআরএস) বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রণীত ব্যাংকগুলোর জন্য অভ্যন্তরীণ ঋণঝুঁকির রেটিং পদ্ধতি স্থগিত করার জন্য।

কেননা এটি বাস্তবায়ন করা বেশ কঠিন। এটি বাস্তবায়ন করতে পারছে না বলে অনেকে ঋণ পাচ্ছেন না। ব্যবসায়ীদের ওই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই নীতিমালাটি আলোচ্য প্রণোদনা প্যাকেজের ক্ষেত্রে স্থগিত করেছে। ফলে এখন থেকে ঝুঁকির রেটিং সনদ ছাড়াই প্রণোদনার ঋণ পাওয়া যাবে।

সার্কুলারে বলা হয়, আলোচ্য তহবিল থেকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের চলতি মূলধনের পাশাপাশি মেয়াদি ঋণ দেওয়া যাবে। তবে মাঝারি উদ্যোক্তাদের কোনো মেয়াদি ঋণ দেওয়া যাবে না। শুধু চলতি মূলধন ঋণ দিতে হবে। চলতি মূলধন ও মেয়াদি ঋণ মাসিক বা ত্রৈমাসিক কিস্তিতে আদায় করা যাবে।

আগে মাসিক কিস্তিতে আদায়ের কথা বলা হয়েছিল। বরাদ্দ তহবিলের মধ্যে ৭০ শতাংশ দিতে হবে কুটির, অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের। বাকি ৩০ শতাংশ দিতে হবে মাঝারি উদ্যোক্তাদের। ছোট উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঋণ প্রবাহ বাড়াতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র উদ্যেক্তাদের ৭০ শতাংশ ঋণের মধ্যে ৬৫ শতাংশ দিতে হবে উৎপাদন ও সেবা খাতে। বাকি ৩৫ শতাংশ দিতে হবে ছোট ট্রেডিং বা ব্যবসা খাতে। মাঝারি খাতের ৩০ শতাংশ উৎপাদন ও সেবা খাতে দিতে হবে। ব্যবসা খাতে দেওয়া যাবে না। প্যাকেজের ৮ শতাংশ দিতে হবে নারী উদ্যোক্তাদের। উৎপাদন ও সেবা খাতে ঋণের জোগান বাড়াতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ঋণের সুদের হার হবে ৯ শতাংশ। এর মধ্যে গ্রাহক দেবে ৪ শতাংশ। বাকি ৫ শতাংশ সরকার থেকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভর্তুকি হিসাবে দেওয়া হবে। প্রণোদনার আওতায় গ্রাহক যে মেয়াদেই ঋণ নেন না কেন, সুদ ভর্তুকি পাবেন এক বছরের জন্য। ঋণের বিপরীতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বেঁধে দেওয়া ফি বা চার্জের বাইরে অন্য কোনো গোপনীয় ফি বা চার্জ আরোপ করা যাবে না। এ ধরনের ফি বা চার্জ আরোপ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে হুশিয়ার করে দিয়েছে। যা আগে কখনো দেওয়া হয়নি।

যেসব গ্রাহক আগে ঋণ পাননি, তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। আগে কখনো ঋণ নেননি। কিন্তু করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ঋণ নিতে চাচ্ছেন এমন সব গ্রাহকদের দ্রুত ঋণ দিতে হবে।

এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রণীত গাইডলাইন্স অন ইন্টারনাল ক্রেডিট রিস্ক রেটিং সিস্টেমস ফর ব্যাংকস (আইসিআরআরএস) অনুযায়ী রেটিং না করেও ব্যাংক থেকে ঋণ দেওয়া যাবে। তবে প্রতিটি ব্যাংক নিজস্ব নীতিমালার আওতায় ঋণ ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে ব্যাংক গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে ঋণ গ্রহীতা নির্বাচন করতে হবে। গ্রাহকদের ঋণের পরিমাণ ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। ঋণের মেয়াদ শেষ হলে লেনদেন সন্তোষনজক হলে ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে এর মেয়াদ বাড়ানো যাবে। তবে কোনো সুদ ভর্তুকি পাওয়া যাবে না।

সার্কুলারে বলা হয়, আলোচ্য প্যাকেজের ঋণ দিয়ে আগের কোনো ঋণ পরিশোধ করা যাবে না। এ অর্থ দিয়ে নতুন কোনো ব্যবসা বা চলমান ব্যবসা সম্প্রসারণ করা যাবে না। কেবল বিদ্যমান শিল্পে ব্যবহার করতে হবে। এতে আরও বলা হয়, ছোট উদ্যোক্তাদের দ্রুত ঋণ দিতে শাখা পর্যায়ে ঋণ বিতরণের ক্ষমতা দিতে হবে। প্রয়োজনে ক্ষমতা বাড়াতে হবে।

সার্কুলারে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করে দিয়ে বলা হয়, প্রণোদনা ঋণের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংককে যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করে জমা দিতে হবে। তা না হলে প্রণোদনা প্যাকেজের আওতা থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নাম বাতিল করে দেওয়া হবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ঋণ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে কোনো ভুল তথ্য দিলে প্যাকেজের আওতায় কোনো সুদ ভর্তুকি পাওয়া যাবে না। উলটো বিতরণ করা ঋণের ওপর ২ শতাংশ দণ্ড সুদ আরোপ করা হবে। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক জামানত হিসাবে গ্রাহকের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও গ্রুপভিত্তিক গ্যারান্টি নেওয়া যাবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে