পুলিশ হত্যা মামলায় অন্যের পরিবর্তে জেল খাটছেন কচুয়ার নিরীহ যুবক লিমন

প্রকাশিত: মে ৩১, ২০২১; সময়: ৯:১৭ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক, কচুয়া : চাঁদপুরের কচুয়ায় চাঞ্চল্যকর পুলিশ কর্মকর্তা হত্যা মামলার প্রকৃত আসামির পরিবর্তে ভাড়া করে জেল খাটানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘটনার শিকার হয়েছেন চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার আইনপুর গ্রামের মো. নুরুজ্জামানের ছেলে মো. আবু ইউসুফ লিমন। পুলিশি তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিলেছে।

আবু ইউসুফ লিমনের বাবা নুরুজ্জামান কচুয়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের চতুর্থ শ্রেণির একজন কর্মচারী। এক ছেলে, দুই মেয়ে ও স্ত্রী নিয়ে স্বল্প বেতনের চাকরিতে সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন। একমাত্র ছেলে আবু ইউসুফ লিমনের স্বপ্ন ছিল লেখাপড়ার পাশাপাশি ক্রিকেট খেলা। আবু ইউসুফ লিমন কুমিল্লা প্রাইভেটে প্যারামেডিক্যালে লেখাপড়ার পাশাপাশি কুমিল্লা জেলা ক্রিকেট দলের একজন নিয়মিত খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে উঠেন।

কিন্তু তার বাবার স্বপ্ন ছিল প্যারামেডিক্যাল পাশ করে সে ডাক্তারি পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করবেন। তার ছেলে ক্রিকেট খেলায় মনোযোগী হয়ে পড়ায় বাবা নুরুজ্জামান অভিমান করে ছেলের আর কোন খোঁজ খবর নিতেন না। তার পাশাপাশি ছেলের থাকা-খাওয়া ও ভরণ-পোষণের টাকাও দিতেন না। আবু ইউসুফ লিমনও অভিমান করে তার বাবার সাথে অনেক দিন যোগাযোগ রাখেননি।

এরই মধ্যে আবু ইউসুফ লিমন ঢাকা বিকেএসপির ক্রিকেট দলের সদস্য হওয়ার জন্য বিভিন্ন জনের সাথে আলোচনা করেন। বিকেএসপির ক্রিকেট দলের সদস্য হওয়ার জন্য ফাঁদে পড়ে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ করেন তার বাবা নুরুজ্জামান।

পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, নারীদের টোপ হিসেবে ব্যবহার করে বিত্তশালীদের ফাঁদে ফেলে অর্থ হাতিয়ে নেয় একটি চক্র। এই চক্রের কবলে পড়েন সিআইডি পুলিশের এস আই মো. মামুন ইমরান খান। এরপর তাকে ধরে নিয়ে হত্যার পর পেট্রোল ঢেলে লাশ পুড়িয়ে গাজীপুর বনে ফেলে দেয় হত্যাকারীরা।

এ ঘটনায় নিহত এস.আইয়ের ভাই বাদী হয়ে ঢাকার বনানী থানায় ২০১৮ সালের ১০ জুলাই একটি মামলা করেন। এই মামলায় ২০১৯ সালের ৩১ মার্চ অভিযোগপত্র দাখিল করেন পুলিশ। এরপর ঢাকার ১ নম্বর অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচার শুরু হয় মামলাটির। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

এই মামলার ৬ নম্বর আসামি হলেন রবিউল ইসলাম আপন। এছাড়াও তাকে সোহাগ ও হৃদয় নামেও ডাকা হয়। তিনি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। আসামি রবিউলের বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া থানার আশুতিয়া গ্রামে। তার বাবার নাম মতিউর রহমান।

কিন্তু তার পরিবর্তে রবিউল সেজে মো. আবু ইউসুফ লিমন গত বছরের ২০ অক্টোবর ঢাকার বিজ্ঞ আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। আবু ইউসুফ লিমন রাজধানীর মিরপুর ২ নম্বর সেকশনে এক মেসে ভাড়া থাকতেন। ছোটখাট কাজ করে যা আয় করতেন, তা দিয়ে সিটি ক্লাবে কোচ সবুজের অধীনে ক্রিকেট খেলা শিখতেন। সেখান থেকে আসামি রবিউলের সঙ্গে পরিচয় ঘটে আবু ইউসুফ লিমনের।

এদিকে, দীর্ঘদিন ছেলের সন্ধান না পেয়ে আবু ইউসুফ লিমনের বাবা গত ১৪ জানুয়ারি কচুয়া থানায় জিডি করেন। এর কিছুদিন পর তিনি জানতে পারেন, তার ছেলে কাশিমপুর কারাগারে।

আবু ইউসুফ লিমনের বাবা নুরুজ্জামান বলেন, ‘এ খবর পেয়ে ছেলের সঙ্গে কারাগারে দেখা করি। তার কাছ থেকে জানতে পারি- রবিউল হত্যার হুমকি ও টাকার লোভ দেখিয়ে ইউসুফকে কোর্টে পাঠায়। আবু ইউসুফ লিমন আদালতে নিজেকে রবিউল হিসেবে পরিচয় দেয়। এরপর আদালত তাকে কারাগারে পাঠায়।’

তিনি বলেন ‘ আবু ইউসুফ লিমনকে এক মাসের মধ্যে জামিন করার কথা বলে কোর্টে নিয়েছিল রবিউল। এরপর আর জামিন মেলেনি ইউসুফের।’

ছেলের মুক্তির জন্য আইনজীবী শামীম সরদারের স্মরণাপন্ন হন নুরুজ্জামান। সব কিছু জানার পর ইউসুফের মুক্তির জন্য ঢাকার আদালতে আবেদন করেন ওই আইনজীবী। এ আবেদনে পুরো ঘটনা বর্ণনা করেন তিনি। আদালত গত ২ মার্চ বিষয়টি তদন্ত করতে পুলিশকে নির্দেশ দেন। বিষয়টি তদন্ত করে ডিবি পুলিশ গত ২ মে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে। ওই প্রতিবেদনে ঘটনার সত্যতা মিলেছে।

এ অবস্থায় রবিউলের আইনজীবীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছে পুলিশ। এ আবেদনের ওপর আগামী ২ জুন ঢাকার ১ নম্বর অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে আদেশের জন্য দিন ধার্য্য রয়েছে বলে ভুক্তভোগীর বাবা জানান।

আবু ইউসুফ লিমনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শামীম সরদার বলেন, ‘ আবু ইউসুফ লিমনের বাবার কাছ থেকে বিস্তারিত জানার পর নিজেই অনুসন্ধান শুরু করি। ঘটনার সত্যতা পাওয়ার পর আবু ইউসুফ লিমনের মুক্তির জন্য আদালতে আবেদন জানাই। আদালত এখন কী আদেশ দেন, সে অপেক্ষায় আছি।’

 

  • 144
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে