রাজশাহীতে মাদক ব্যবসায়ীর জামিন জালিয়াতি করায় আইনজীবী গ্রেপ্তার

প্রকাশিত: মে ২, ২০১৯; সময়: ৮:৩৮ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহীর গোদাগাড়ী সীমান্ত দিয়ে সবচেয়ে বেশি হেরোইন ঢোকে। এই উপজেলার একজন আইনজীবীর নাম সালাহউদ্দিন বিশ্বাস। জেলা পুলিশের এক প্রতিবেদনে রাজশাহীর ছয়জন আইনজীবীকে ‘মাদক ব্যবসায়ীদের আইনজীবী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাদের মধ্যে সালাহউদ্দিনের নামও রয়েছে। বৃহস্পতিবার এই আইনজীবী গ্রেপ্তার হয়েছেন।

মাদকের মামলায় হাইকোর্টে জামিন জালিয়াতির ঘটনায় দায়ের করা একটি মামলায় রাজধানীর শাহবাগ থানা পুলিশ বৃহস্পতিবার ভোরে গোদাগাড়ী পৌরসভার মহিষালবাড়ি মহল্লার বাড়ি থেকে সালাহউদ্দিন বিশ্বাসকে গ্রেপ্তার করে। এরপর তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেয়া শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অমল কৃষ্ণ দে তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, মামলাটির বাদী সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের দপ্তরের সুপারিনটেডেন্ট মজিবর রহমান। গত মার্চে মামলাটি দায়ের হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের ১৭ অক্টোবর গোদাগাড়ী উপজেলার আঁচুয়াভাটা গ্রামের আফজাল হোসেনের ছেলে আশরাফুল ইসলাম ওরফে বাবু ৫৫০ গ্রাম হেরোইনসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। এরপর রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে তার কয়েকদফা জামিনের আবেদন করা হলেও নাকচ হয়। এ অবস্থায় হাইকোর্টে তার জামিন চাওয়া হয়। জামিন পেতে আশরাফুলের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া হেরোইনের পরিমাণ ৫৫০ গ্রামের পরিবর্তে ৪৮ গ্রাম উল্লেখ করা হয়। রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এন্তাজুল হক বাবু জানান, ২০১৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ আসামি আশরাফুলের অন্তবর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করেন। পরবর্তীতে আইনজীবী সালাহউদ্দিন বিশ্বাস রাজশাহীর বিচারিক আদালতে আশরাফুলের মুক্তির জন্য বেলবন্ড দাখিল করেন। তখনই জামিন জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে। এরপর আসামির জামিন বাতিল হয়। পরে আশরাফুল আর জামিন পাননি। সম্প্রতি তার যাবজ্জীবন কারাদ- হয়েছে।

আরও জানা জানা গেছে, রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল জামিন জালিয়াতির বিষয়টি জানিয়ে ২০১৮ সালের ১৯ মার্চ হাইকোর্টের জামিন আদেশটি সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের কাছে পাঠায়। পরে ২৭ মার্চ রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় জামিন আদেশ ও মামলার নথিপত্র আদালতে দাখিল করে। সেদিন সংশ্লিষ্ট আদালতের আইন কর্মকর্তা আসামির জামিন বাতিল ও জামিন জালিয়াতির ঘটনায় অন্য কারা জড়িত তা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডির) মাধ্যমে তদন্ত করার আবেদন করেন। এ সময় হাইকোর্ট আসামির আইনজীবী রিফাত জাহানের কাছে জানতে চান, মামলাটি তিনি কীভাবে পেয়েছেন। হলফনামা আকারে বিষয়টি আদালতে দাখিল করতে বলা হয়। রিফাত জাহান আদালতে দাখিল করা তার হলফনামায় বলেছেন, তিনি তার জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শেখ আতিয়ার রহমানের কথা মতো আসামি আশরাফুলের জামিন আবেদনে আবেদনকারী আইনজীবী হয়েছিলেন। আইনজীবী শেখ আতিয়ার রহমান মামলাটি ঢাকা জজ আদালতের আইনজীবী শিউলী আক্তারের মাধ্যমে পেয়েছেন।

এই জামিন জালিয়াতির ঘটনা তদন্ত করতে বিচারপতি শেখ আবদুল আউয়াল ও বিচারপতি মো. খসরুজ্জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ সিআইডিকে নির্দেশ দেয়। সিআইডি দীর্ঘ সময় ধরে বিষয়টির তদন্ত করে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্টারের দপ্তরে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। এই প্রতিবেদনসহ গত ৯ মার্চ শাহবাগ থানায় মামলা করা হয়। এ মামলার অন্য আসামিদের নাম না জানালেও পুলিশ জানিয়েছে, রাজশাহীর আইনজীবী সালাহউদ্দিন বিশ্বাসসহ আরও আসামি আছেন।

জানা গেছে, আইনজীবী সালাহউদ্দিন বিশ্বাস যেসব মামলা নিয়ে লড়েন তার সিংহভাগই মাদক সংক্রান্ত। হেরোইনের নমুনার রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পাল্টানোর চক্রের সঙ্গেও জড়িত তিনি। পুলিশের এক প্রতিবেদনে এ বিষয়টি উঠে এসেছে। তার কারসাজিতে নমুনা পরীক্ষার সময় জব্দকৃত বস্তু হেরোইন নয়, এমন প্রতিবেদন ঢাকা থেকে আসে বলে জানতে পেরেছে পুলিশ। এর ফলে আসামির পক্ষে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে বাধ্য হয় পুলিশ। এতে আসামি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পান। সাম্প্রতিক সময়ে পাঁচ কেজি হেরোইন জব্দের পর নমুনা পরীক্ষায় সেটি হেরোইনের পরিবর্তে ‘বাদামি গুড়া’ প্রতিবেদন এলে আইনজীবী সালাহউদ্দিন বিশ্বাসের এই অপকর্মের বিষয়টি জানতে পারে পুলিশ। এই চক্রে কিছু অসাধু পুলিশ এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ থাকতে পারে বলেও মনে করে পুলিশ। পাঁচ কেজি হেরোইনের নমুনা পরীক্ষার পর ঢাকা থেকে ‘বাদামি গুড়া’ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পুলিশ আদালতে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনও দাখিল করেছিল। পরবর্তীতে প্রতিবেদন পাল্টানোর বিষয়টি জানাজানি হলে মামলাটির পুনঃতদন্ত শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ৮ অক্টোবর র‌্যাব ৫ কেজি হেরোইন জব্দ করে। এ নিয়ে মো. সাজেমান (৩৭) ও মো. আলম (৪৫) নামের দুই ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করা হয়। মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা গোদাগাড়ী থানার এসআই আবদুর রাজ্জাক (নিরস্ত্র) জব্দকৃত আলামত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে পাঠান। তার বদলিজনিত কারণে গোদাগাড়ী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আলতাব হোসেন তদন্তভার পান এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন।

উড়ো ফোন পাওয়ার পর রাজশাহীর পুলিশ সুপার মো. শহিদুল্লাহ জেলা বিশেষ শাখার তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরীকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করে দেন। এই কমিটি গত ২৯ এপ্রিল পুলিশ সুপারের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে বলা হয়, হেরোইনের আলামতের প্রতিবেদন পাল্টে ফেলা হয়েছে। এরপর নতুন করে মামলাটির তদন্ত শুরু হয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে ছয়জন আইনজীবীকে মাদক ব্যবসায়ীদের নির্ধারিত আইনজীবী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এদের মধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া সালাহউদ্দিন বিশ্বাসও ছিলেন।

শাহবাগ থানার মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা এসআই অমল কৃষ্ণ দে বলেন, আইনজীবী সালাহউদ্দীন বিশ্বাসকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা করছেন। মামলার তদন্তের স্বার্থে আইনজীবীকে রিমান্ডে নেয়া হতে পারে বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে