চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ১০ জনই ভিসির ঘনিষ্ঠ

প্রকাশিত: মে ১০, ২০২২; সময়: ৩:৩১ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের-রামেবি ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক ডা. এজেডএম মোস্তাক হোসেন দায়িত্ব নিয়েই শুরু করেছেন তুঘলকি কাণ্ড। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে অবসরে যাওয়া ১০ জনকে সম্প্রতি এ বিশ্ববিদ্যালয়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছেন। তারা সবাই অবসরপ্রাপ্ত তার চিকিৎসক বন্ধু ও আত্মীয়-স্বজন। ভিসির এমন স্বেচ্ছাচারিতায় আর্থিক ও শৃঙ্খলাগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত ১১ মাসে তার দায়িত্বকালীন রামেবির ভিসি রেজিস্ট্রার দপ্তরে ২ জন, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরে ৩ জন, কলেজ পরিদর্শক দপ্তরে ২ জন, অর্থ ও হিসাব দপ্তরে ২ জন এবং পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরে ১ জনসহ মোট ১০ জনকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছেন। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগপ্রাপ্তদের তাদের অবসরকালীন বেতনভাতার সমান বেতন ভাতা ও সুবিধা দিয়েছেন। এর ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থ বাড়তি খরচ হচ্ছে।

তবে অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডা. অধ্যাপক এজেএম মোস্তাক হোসেন বলেন, যারা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন তারা আমার পরিচিতি। তবে ঘনিষ্ঠ বলে যা বোঝায় তা নয়। কেউ কেউ রাজশাহী মেডিকেল কলেজে আমার সহপাঠী ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মতামত নিয়েই এদেরকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যারা নিয়োগ পেয়েছেন তারা সবাই অভিজ্ঞ। বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের নজির আছে।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, নিয়োগপ্রাপ্ত এসব অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি আগে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। তাদের অনেককে অবসরকালীন পদের চেয়ে নিম্নপদে চাকরি দিয়েছেন। তবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়ে তারা অবসরকালীন বেতনভাতা ও সুবিধার সমান বেতনভাতা ও পরিতোষিক পাচ্ছেন।

অভিযোগকারীরা বলছেন, এসব পদে নিয়মিত নিয়োগ দেওয়া হলে বেতনভাতা ও সুবিধা বাবদ যে পরিমাণ টাকা ব্যয় হচ্ছে তার অর্ধেক টাকা লাগত। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ফলে এই ১০ জন কর্মকর্তার বেতন ভাতা ও সুবিধাদি দিতে অতিরিক্ত ৫ লাখ টাকা বেশি খরচ হচ্ছে।

সূত্র জানায়, রামেবিতে ডা. আনোয়ারুল কাদেরকে রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর আগে তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের প্রধান ছিলেন। এর মধ্যে ডেপুটি রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ পেয়েছেন রামেবি ভিসির বন্ধু ডা. আমিন আহম্মেদ খান। এর আগে তিনি রংপুর স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক পদ থেকে অবসর নেন। তাকে বেতন দেওয়া হয় এক লাখ সাত হাজার টাকা।

সুবিধাসহ তাকে মাসে মাসে দিতে হচ্ছে দেড় লাখ টাকা। নিয়মিত নিয়োগের মাধ্যমে এ পদে কাউকে নিয়োগ দিলে বেতনভাতা দিতে হতো সত্তর হাজার টাকা। এ অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসককে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ায় প্রতি মাসে সরকারের ৪০ হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। ডেপুটি রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে পূর্বের কর্মস্থলে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন ডেপুটি রেজিস্ট্রারের বিশেষ প্রয়োজনও নেই।

এদিকে, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, ডেপুটি ও সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদে ভিসি তার অবসরপ্রাপ্ত তিন বন্ধু চিকিৎসককে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছেন। এখানে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদে নিয়োগ পেয়েছেন ডা. আনোয়ার হাবিব। ডেপুটি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ডা. সারওয়ার হোসেনকে বেতন দেওয়া হচ্ছে লক্ষাধিক টাকা।

নিয়মিত নিয়োগ দিলে উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদের বেতন হতো ছেষট্টি হাজার টাকা। এ কর্মকর্তাকেও প্রতিমাসে একজন নিয়মিত কর্মকর্তার চেয়ে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা বেশি বেতন দিতে হচ্ছে। এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আগের কর্মস্থলে দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে।

এছাড়া সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ডা. আমির হোসেনকেও এক লাখ টাকা বেতন দেওয়া হচ্ছে। ডা. আমির হোসেন সর্বশেষ রাজশাহী বক্ষব্যাধি হাসপাতাল থেকে অবসর নেন। এ চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তার পেছনেও প্রতিমাসে নিয়মিত কর্মকর্তার চেয়ে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে।

সহকারী কলেজ পরিদর্শকের দায়িত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নিয়মিত কর্মকর্তা থাকলেও কলেজ পরিদর্শক ও ডেপুটি কলেজ পরিদর্শক পদে দুজন অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কলেজ পরিদর্শক পদে ডা. মোসাদ্দেক হোসেন ও ডেপুটি কলেজ পরিদর্শক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ভিসির বন্ধু ডা. জোহা মোহাম্মদ মেহের হোসেনকে।

তাদেরকে বেতন দেওয়া হচ্ছে পঁচাত্তর হাজার টাকা করে। ডা. মোসাদ্দেক সর্বশেষ রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রক্ত সঞ্চালন বিভাগের প্রধান ছিলেন। তাদের পেছনেও নিয়মিত কর্মকর্তার চেয়ে প্রতিমাসে প্রায় পনেরো হাজার টাকা করে বেশি ব্যয় হচ্ছে।

এছাড়া ডা. জোহার বিরুদ্ধে তথ্য গোপন করে দুই জায়গা থেকে বেতনভাতা তুলে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা আত্মসাৎ, বিধি লঙ্ঘন করে এক শিক্ষাবর্ষে একাই অর্ধশতাধিক পরিদর্শন কমিটির সদস্য সচিব, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা হয়েও পূর্বের পরিচয়ে অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষক হওয়াসহ বহু আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ডা. জোহা সর্বশেষ যশোর মেডিকেল কলেজ থেকে অবসর নেন।

অভিযোগে জানা গেছে, অর্থ ও হিসাব দপ্তরের পরিচালক ও সহকারী পরিচালক পদে দুজনকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ দুজনই ভিসির ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হকের সুপারিশে নিয়োগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে পরিচালক পদে নিয়োগ পেয়েছেন ডা. জাকির হোসেন খন্দকার। পেশাদার হিসাববিদ নিয়োগ না দিয়ে একজন চিকিৎসককে হিসাব বিভাগের এ উচ্চপদে নিয়োগদানের বিষয়টি নিয়ে বিস্তর সমালোচনা আছে।

অন্যদিকে, সহকারী পরিচালক মফিজ উদ্দিনকে বেতন দেওয়া হয় পঁচাত্তর হাজার টাকা, যা একজন নিয়মিত কর্মকর্তার চেয়ে প্রায় ত্রিশ হাজার টাকা বেশি। মফিজ উদ্দিন সর্বশেষ চাঁপাইনবাবগঞ্জ হিসাবরক্ষণ অফিস থেকে অবসর নেন। এ কর্মকর্তার শিক্ষাগত যোগ্যতার একটিতে তৃতীয় বিভাগ থাকা সত্ত্বেও বিধি লঙ্ঘন করে তাকে নিয়োগ দিয়েছেন ভিসি।

রামেবির পরিচালক পরিকল্পনা ও উন্নয়ন পদে সিরাজুম মুনীরকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর আগে তিনি রাজশাহী সিটি করপোরেশন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে নানাবিধ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল তার সাবেক প্রতিটি কর্মস্থলে।

অভিযোগ উঠেছে চুক্তিভিত্তিক এসব কর্মকর্তার বেশিরভাগেরই বিশ্ববিদ্যালয়ে দাপ্তরিক কাজের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা নেই। ফলে রামেবির প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। বিশেষ করে উপ-রেজিস্ট্রার, উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, উপ-কলেজ পরিদর্শক, সহকারী পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) ও সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদে যারা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের সংশ্লিষ্ট কাজে পূর্বের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। অভিযোগ রয়েছে, এসব চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা অফিসে এসে গল্প-গুজব করে এবং মোবাইল ফোনে ফেসবুক দেখে সময় পার করেন।

রাজশাহীর আরও কয়েকজন চিকিৎসক অভিযোগে বলেন, ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর রামেবি জামায়াত শিবির ও সরকারবিরোধীদের পুনর্বাসনকেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ পেয়েছেন তাদের অধিকাংশই সরকারবিরোধী শিবিরের লোক। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরও এই বিষয়ে সতর্ক নয়। সূত্র- যুগান্তর

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপে