রাবির ১৭৪ নিয়োগ বাতিল ও ভিসির বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ

প্রকাশিত: মে ২৩, ২০২১; সময়: ১২:৪২ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সদ্য সাবেক উপাচার্য ড. এম আব্দুস সোবহানের শেষ কর্মদিবসে বিতর্কিতভাবে দেয়া ১৪০ জনের নিয়োগ বাতিলের সুপারিশ করেছে এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি। একই সঙ্গে এম আব্দুস সোবহানের মেয়ে ও জামাতাসহ এর আগে অনিয়ম করে নিয়োগ পাওয়া আরো ৩৪ শিক্ষকের নিয়োগ বাতিলের সুপারিশও করা হয়েছে।

এছাড়া ড. এম সোবহানের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশও করা হয়েছে। রোববার বেলা ১১টার দিকে এ কমিটির প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে জমা দেওয়া হয়। সাবেক উপাচার্যের আরেকটি দেশের নাগরিকত্ব রয়েছে। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়েছে বিধায় বিচারের আগেই পালিয়ে যেতে পারেন আশঙ্কায় এ সুপারিশ করা হয়েছে।

গত ৬ মে ড. এম আব্দুস সোবহান তার শেষ কর্মদিবসে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী পদে প্রায় ১৪০ জনকে নিয়োগ দিয়ে যান। যদিও এর কয়েক মাস আগেই বিশ্ববিদ্যালয়টির সব নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত রাখতে তাকে চিঠি দিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বিদায়ী উপাচার্যের এমন কাণ্ডে ক্যাম্পাসে তোলপাড় শুরু হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে অনভিপ্রেত উল্লেখ করে ঘটনার তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীরকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কমিটিকে এ অবৈধ নিয়োগের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে সুপারিশমূলক প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।

মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে নিয়োগের ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করেছে তদন্ত দল। কমিটির প্রতিবেদনে নিয়োগের ঘটনায় প্রধান দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ড. এম আব্দুস সোবহানকে। এ ঘটনায় প্রধান সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে তার জামাতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের প্রভাষক এটিএম শাহেদ পারভেজকে।

এছাড়া সংস্থাপন শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার ইউসুফ আলী, রেজিস্ট্রার শাখার সহকারী রেজিস্ট্রার তারিকুল আলম ও পরিষদ শাখার সহকারী রেজিস্ট্রার মামুন অর রশীদকে সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করেছে তদন্ত কমিটি।

তদন্ত কার্যক্রম ও প্রতিবেদন বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্ত কমিটির এক সদস্য বলেন, ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িতদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। যেহেতু ড. সোবহানের অন্য একটি দেশের নাগরিকত্ব রয়েছে, তাই তার বিদেশ যাওয়ার নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ করা হয়েছে। সর্বোপরি কমিটি তার এখতিয়ার ও আইন অনুযায়ী সুপারিশ রেখেছে। এখন পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে মন্ত্রণালয়।

কয়েকজন শিক্ষক সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেন, ৩ মে রাতে এম সোবহানের জামাতা শাহেদ পারভেজের নেতৃত্বে সিনেট ভবন থেকে নিয়োগসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি সরিয়ে ফেলা হয়। নথি সরানোসহ নিয়োগ প্রক্রিয়ার অন্যান্য কাজে উপাচার্য ও তার জামাতাকে সহায়তা করেন ইউসুফ আলী, তারিকুল আলম ও মামুন অর রশীদ নামে তিন কর্মকর্তা।

ভাই ও সন্তানের নিয়োগ নিশ্চিত করতেই অবৈধভাবে দেয়া গণনিয়োগে এ তিন কর্মকর্তা সহযোগিতা করেন বলে তদন্তের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তিন কর্মকর্তার মধ্যে ইউসুফ আলীর স্বার্থ ছিল ছেলেকে চাকরি পাইয়ে দেয়া।

নিয়োগ তালিকা থেকে জানা যায়, তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী পদে ৮৫ জনের তালিকার ৮২ নম্বরে আছেন সংস্থাপন শাখার এ ডেপুটি রেজিস্ট্রার ইউসুফ আলীর ছেলে নাহিদ পারভেজ। সিনিয়র সহকারী পদের বিপরীতে নিম্নমান সহকারী হিসেবে সংস্থাপন শাখায় নিয়োগ পেয়েছেন তিনি।

অন্য দুই কর্মকর্তার স্বার্থ ছিল ভাইয়ের নিয়োগ নিশ্চিত করা। এর মধ্যে তারিকুল আলমের ভাই মাসুম আল শামীম নিয়োগ পেয়েছেন প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের নিম্নমান সহকারী হিসেবে। নিয়োগ তালিকার ৭৫ নম্বরে আছে তার নাম। আর তালিকার ৬৮ নম্বরে থাকা শেখ ফারহানুল ইসলাম পরিষদ শাখার কর্মকর্তা মামুন অর রশীদের ভাই বলে জানা গেছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে এম সোবহানের দেয়া এ অবৈধ নিয়োগের সুবিধাভোগী বেশ কয়েকজন শিক্ষকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই শিক্ষকদের স্ত্রী, সন্তান, জামাতাসহ বিভিন্ন নিকটাত্মীয় অবৈধভাবে নিয়োগ পেয়েছেন। এজন্য অবৈধ এ নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদেরও পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে।

এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঘটে যাওয়া এত বড় অবৈধ নিয়োগ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় দুই উপ-উপাচার্য ও ট্রেজারারের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করা হয়েছে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষক সমাজের আহ্বায়ক ড. সুলতান উল ইসলাম বলেন, যেকোনো ধরনের অন্যায়কারী ও অন্যায়ে সহযোগীদের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ হলে দেশে প্রচলিত আইন আছে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে এটাই চাওয়া থাকবে।

বর্তমান উপ-উপাচার্যদ্বয় ও কোষাধ্যক্ষ দায় এড়াতে পারেন না বলেও মনে করেন তিনি। এ শিক্ষক বলেন, সভাগুলোতে তারা ছিলেন। সেখানে কী পরিস্থিতি হচ্ছিল, সেটি তারা জানতেন। তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করলে হয়তো এ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো। সূত্র- বণিক বার্তা

  • 369
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে