ভিসির মানবিক নিয়োগে অমানবিক অনিয়ম

প্রকাশিত: মে ৯, ২০২১; সময়: ১১:৩০ pm |

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) ‘অবৈধ’ জনবল নিয়োগে করতে গিয়ে অনিয়মের পর অনিয়ম করে পদ থেকে বিদায় নিয়েছেন দুইবারের দায়িত্বপালনকারী উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সোবহান।

গত বৃহস্পতিবার মেয়াদের শেষ কর্মদিবসে অস্থায়ী ভিত্তিতে (এডহক) ১৩৭ জনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে নতুন সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন ইউজিসির তদন্তে অনিয়ম ও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হওয়া এই উপাচার্য।

এই নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে শুরুতেই তিনি অমান্য করেছেন সরকারি নির্দেশনা। ইউজিসির তদন্তে রাবিতে অনিয়মের কথা উঠে আসার পর গত বছরের ১০ ডিসেম্বর সব ধরনের নিয়োগ কার্যক্রম পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখতে উপাচার্য আবদুস সোবহানকে নির্দেশ দিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

এর আগে, নিজের কন্যা ও জামাতাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে ২০১৭ সালে ইচ্ছাকৃতভাবে শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা শিথিল করেছিলেন উপাচার্য। এ ছাড়া, শিথিল করা এই নিয়মের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগে ৩৪ জন অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এসব শিক্ষকদের নিয়োগ বাতিল করার সুপারিশও করেছিল ইউজিসি।

মূলত এসব দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অবৈধ নিয়োগের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ার প্রেক্ষিতে ‘প্রশাসনিক কারণ’ দেখিয়ে সব নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে ‘দুর্নীতি ও অনিয়ম’র অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া এই ‘স্থগিতাদেশ’ অমান্য করে বিদায়কালে আবারও এডহকে ১৩৭ জনের ‘অবৈধ’ নিয়োগ দিয়ে গেছেন এই উপাচার্য। ‘অবৈধ’ নিয়োগে স্বাক্ষর দিতে রেজিস্ট্রার অস্বীকৃতি জানানোয় ‘অসত্য তথ্য’ উপস্থাপন করে উপ-রেজিস্ট্রারকে স্বাক্ষরের দায়িত্ব প্রদান

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, নিয়োগ সংক্রান্ত অফিস আদেশ ও নিয়োগপত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর থাকার কথা। তবে, বৃহস্পতিবার ইস্যু করা এই নিয়োগপত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আবদুস সালামের স্বাক্ষর ছিল না। সেখানে স্বাক্ষর ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্থাপন শাখার উপ-রেজিস্ট্রার ইউসুফ আলীর।

রেজিস্ট্রারকে রেখে উপ-রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর কেন নেওয়া হলো? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে একটি দাপ্তরিক নোট এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। যেখানে লেখা আছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ও অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার অনুপস্থিত থাকায় বিভিন্ন পদে নিয়োগপত্রে স্বাক্ষরের জন্য সংস্থাপন শাখার অফিসার ইউনিটের উপ-রেজিস্ট্রার মো. ইউসুফ আলীকে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। উপাচার্য আবদুস সোবহান স্বাক্ষর দেওয়ার মাধ্যমে নোটটি অনুমোদন করেছেন। আর সেই নোট ব্যবহার করেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।

এ বিষয়ে রেজিস্ট্রার আবদুস সালামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এই তথ্য মোটেও সঠিক নয়। এখানে অসত্য তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। আমি ছুটিতে যাইনি, পদত্যাগ করিনি। এমনকি আমাকে অপসারণও করা হয়নি। সে কারণে রেজিস্ট্রার বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুপস্থিত, এমন নোট লেখার কোনো সুযোগ নেই, বলেন অধ্যাপক সালাম।

তাহলে নিয়োগের দিন কী ঘটেছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এই নিয়োগের ব্যাপারে শুরু থেকে তিনি অবগত ছিলেন না। শেষ সময়ে নিয়োগপত্রে স্বাক্ষরের জন্য তাকে উপাচার্যের বাসভবনে ডাকা হয়। তবে, বিশ্ববিদ্যালয়ে সবধরনের নিয়োগে সরকারি নিষেধাজ্ঞা আছে, কাজেই এখন কোনো ধরনের নিয়োগই বিধিসম্মত হবে না, এই চিন্তা থেকেই তিনি স্বাক্ষরে অস্বীকৃতি জানান।

রেজিস্ট্রার অস্বীকৃতি জানানোয় নিয়োগ প্রক্রিয়া অনিশ্চিত হয়ে যায়। এমতাবস্থায় বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্থাপন শাখার উপ-রেজিস্ট্রার ইউসুফ আলীর স্বাক্ষরে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করেন উপাচার্য।

এ বিষয়ে উপ-রেজিস্ট্রার ইউসুফ আলী বলেন, আমি নির্বাহী আদেশ (উপাচার্যের আদেশ) পালন করেছি মাত্র। এখানে আমার কিছুই করার ছিল না। নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষে উপাচার্য তার বাসভবন থেকে বের হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করেন। এর পরপরই বাসভবনে গিয়ে উপাচার্যের স্বাক্ষর করা নিয়োগপত্র গ্রহণ করেন চাকরিপ্রাপ্তরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগবিধি অনুযায়ী, কোনো বিভাগ বা দপ্তরের লোকবল প্রয়োজন হলে তারা উপাচার্যের কাছে চাহিদাপত্র পাঠাবে। অনুমোদন সাপেক্ষে বিভাগ বা দপ্তর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করবে। এরপর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে তাদেরকে নিয়োগ দেবেন উপাচার্য। পরবর্তীতে সিন্ডিকেটে অনুমোদন পাওয়ার পর তারা স্বপদে যোগদান করতে পারবেন।

যদি জরুরিভিত্তিতে লোকবলের প্রয়োজন হয় এবং পরীক্ষা নেওয়াও সম্ভব না হয়, তখন উপাচার্য অস্থায়ী (এডহক) নিয়োগ দিতে পারবেন। এ ধরনের নিয়োগ দিতে গেলেও মৌখিক পরীক্ষা নিতে হয় বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য বিদায় নেওয়া উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সোবহান যে ১৩৭ জনকে নিয়োগ দিয়েছেন, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগবিধির কোনো নিয়মই মানা হয়নি।

এখানে কোনো বিভাগ বা দপ্তর থেকে চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও সেসব বিভাগ ও দপ্তরে নিয়োগ হয়ে গেছে। এই নিয়োগের আগে কোনো বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি, লিখিত পরীক্ষা হয়নি, এমনকি মৌখিক পরীক্ষাও নেওয়া হয়নি। হাতে আসা ডকুমেন্টস অনুযায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত ১৩৭ জনের মধ্যে শিক্ষক হয়েছেন নয় জন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই শিক্ষকদের নিয়োগেও হয়েছে অনিয়ম। বেশ কয়েকটি বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেসব বিভাগের প্ল্যানিং কমিটি থেকে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশই করা হয়নি। ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে নিয়োগ পেয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. চিত্তরঞ্জন মিশ্রের ছেলে ইন্দ্রনীল মিশ্র।

এই বিভাগে নিয়োগের ব্যাপারে কোনো সুপারিশ ছিল না জানিয়ে বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মো. এমদাদুল হক বলেন, ‘শিক্ষক নিয়োগের জন্য কোনো প্ল্যানিং কমিটির সভা ডাকা হয়নি। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো আলাপও হয়নি।’

সংগীত বিভাগে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক খন্দকার ফরহাদ হোসেনের ছেলে ঋত্বিক মাহমুদ। এই বিভাগের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন বিভাগের সভাপতি দীনবন্ধু পাল। তিনি বলেন, ‘আমি হঠাৎ শুনেছি, আমাদের বিভাগে একজন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আমার আগে থেকে কোনো কিছু জানা ছিল না।’

শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এমন বেশ কয়েকটি বিভাগে কথা বলে আরও জানা গেছে, এসব বিভাগে স্থায়ী পদের বিপরীতে নিয়োগ চেয়ে বিভিন্ন সময় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী অনেকে আবেদনও করেছেন। তবে, নানা কারণে সেসব পদে নিয়োগ সম্পন্ন হয়নি। এসব স্থায়ী পদের নিয়োগ সম্পন্ন না করেই সেসব বিভাগে এডহকে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন উপাচার্য আবদুস সোবহান।

প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বিভাগের জন্য ছয় জন শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। সে প্রেক্ষিতে আবেদনও করেছিলেন অনেকে। শেষপর্যন্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। হঠাৎ সেদিন শুনেছি আমার বিভাগে একজন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা কি না অস্থায়ী (এডহক) ভিত্তিতে। স্থায়ী পদের নিয়োগ রেখে অস্থায়ী ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ হলো, অথচ আমরা কিছুই জানি না। উপাচার্য আমাদেরকে কিছুই জানাননি।’

ইতিহাস বিভাগে নিয়োগের ব্যাপারে সভাপতি অধ্যাপক মর্তুজা খালেদ বলেন, আমার বিভাগে তিন বছর আগে থেকে পাঁচটি স্থায়ী পদের বিপরীতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া আছে। বিভিন্ন সময়ে অজানা কারণে উপাচার্য এই নিয়োগ প্রক্রিয়া বার বার স্থগিত করেছেন। অথচ এই নিয়োগ সম্পন্ন না করেই, অস্থায়ী ভিত্তিতে একজনকে নিয়োগ দিয়ে গেলেন, যার সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণাই নেই।

এই নিয়োগ নিয়ে কোনো অনুতাপ নেই বলে মন্তব্য করেছেন উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সোবহান। তিনি বলেন, মানবিক’ কারণে ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্যদের চাকরি দেওয়া হয়েছে। এখানে তার নিজস্ব কোনো স্বার্থ নেই। যারা ডিজার্ভ করে তারাই নিয়োগ পেয়েছে। তাদের প্রত্যেকেই অনার্স-মাস্টার্স পাস এবং আওয়ামী পরিবারের সন্তান। দীর্ঘদিন ধরে তাদের জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়ে যাচ্ছিল। তাই আমি মানবিক কারণে ছাত্রলীগকে চাকরি দিয়েছি, বলেন তিনি।

উপাচার্য আবদুস সোবহান বলেন, ‘তাদের (ছাত্রলীগের) ক্রমাগত দাবি এবং চাপের পরিপ্রেক্ষিতে আমি বোধ করেছি যে, তাদের চাকরি পাওয়া উচিত। তাই তাদের চাকরি দিয়েছি। এখানে অন্য কেউ জড়িত নয়।

সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকার পরেও কেন নিয়োগ দেওয়া হলো? জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ অনুযায়ী উপাচার্যের ক্ষমতাবলে এ নিয়োগ দিয়েছি। এখন যদি সরকার থেকে এ ধরনের আদেশ আসে, তাহলে তো বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশই বাতিল করা উচিত, বলেন তিনি।

নিয়োগে কোনো অনিয়ম করেছেন কি না? প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক সোবহান বলেন, আমি মনে করি এই নিয়োগ যৌক্তিক, তাই আমি নিজ দায়িত্বে এটা দিয়েছি। সূত্র- দ্য ডেইলি স্টার

  • 164
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে