রাবি ভিসির বিদায় বেলার নিয়োগে যোগদানে নিষেধাজ্ঞা

প্রকাশিত: মে ৮, ২০২১; সময়: ৯:৩৯ pm |

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, রাবি : শিক্ষামন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বিদায়কালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) উপাচার্য এম আব্দুস সোবহান বিভিন্ন পদে প্রায় ১৪১ জনকে নিয়োগ দিয়েছেন। এই নিয়োগকে অবৈধ ঘোষণা করে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনতে ঘটনা তদন্তে চার সদস্যের কমিটি করে শিক্ষামন্ত্রণালয়। শনিবার দুপুরে পৌনে ১২টার দিকে এই তদন্ত কমিটির বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছান। ক্যাম্পাসে এসে দলটি বিভিন্ন নথিপত্র ঘেঁটে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে বিকেলে ঢাকার পথে রওয়ানা হয়েছেন।

এর পরপরই রেজিস্ট্রার দফতর থেকে তদন্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগদানে নিষেধ করে চিঠি পাঠানো হয়। এই বিষয়ে রেজিস্ট্রার আব্দুস সালাম বলেন, যেহেতু নিয়োগের ওপর একটা তদন্ত চলছে তাই এটাই নিয়ম যে নিয়োগে যোগদান স্থগিতাদেশ আসবে। তদন্ত কমিটির সদস্যরা আমাদের বলেছেন, তদন্তের কাজ শেষ না হওয়া নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগদান স্থগিত রাখতে। সে অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অফিসগুলোকে চিঠি দিয়েছি।

তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য আনন্দ কুমার সাহা বলেন, তদন্ত দলের সদস্যরা সকালে এসেছিলেন। তারা রেজিস্ট্রারকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন কাগজপত্র দেখেছে আজকের মত কাজ করে ঢাকায় ফিরে গেছেন। তবে তাদের তদন্ত শেষ হলো কি না কিংবা আরও তারা ক্যাম্পাসে আসবেন কি না তা বলতে পারছি না।

ক্যাম্পাস ছেড়ে যাবার আগে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, যে পরিস্থিতি উদ্ভুত হয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষামন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি করেছে। সেই কমিটির সদস্য হিসেবে আমরা এখানে তদন্ত করতে এসেছি। এখানে এসে আমরা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছি, বিভিন্ন নথিপত্র দেখেছি। আশা করি, নির্ধারিত সময়ের ভেতর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারব।

এদিকে তদন্ত দলের তলবে সদ্য সাবেক উপাচার্য এম আব্দুস সোবহানও প্রশাসন ভবনে আসেন। পরে গণমাধ্যমের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় আইনের ১২ (৫) ধারায় বলা আছে উপাচার্য নিজ ক্ষমতা বলে নিয়োগ দিতে পারবে। সেই ধারায় আমি নিয়োগ দিয়েছি। সুতরাং এখানে আইনের ব্যাত্যয় হয়নি। সরকারি যে নিষেধাজ্ঞা এসেছে, সেটা আসার আগে তো সেই আইনটা বাতিল করা উচিৎ।

এর আগে, সদ্য সাবেক উপাচার্যের বিরুদ্ধে আনীত নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পায় ইউজিসি। এর পরিপ্রেক্ষিতে গতবছর ডিসেম্বরে একাধিক চিঠিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরণের নিয়োগ স্থগিত রাখতে বলা হয়। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা না মেনেই গত ৬ মে বৃহস্পতিবার উপাচার্য হিসেবে শেষ কার্যদিবসে ১৪১ জনকে বিভিন্ন পদে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়ে যান এম আব্দুস সোবহান। এদিন এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে চাকরী পাওয়া রাবি ছাত্রলীগের সংগে সংঘর্ষে জড়ায় চাকরী না পাওয়া মহানগর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এই ঘটনায় ৫ জনের আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।

এদিন দুপুর ২টায় উপাচার্য ভবন ত্যাগ করে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যান এম আব্দুস সোবহান। এর কিছুক্ষণ পরেই উপাচার্য ভবনে সদ্য নিয়োগ পাওয়ারা ভীড় করতে থাকেন। এসময় তাদের নিজ নিজ কর্মস্থলে যোগ দেবার জন্যে উপাচার্যের আদেশনামায় স্বাক্ষর করতে দেখা যায়। জানা যায়, নিয়োগপত্রে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানানোয় রেজিস্ট্রার আবদুস সালামকে অব্যাহতি দেন উপাচার্য। তার স্থলে পরিষদ সেকশনের সহকারী রেজিস্ট্রার মামুন-উর-রশিদ অথবা উপ-রেজিস্ট্রার ইউসুফ আলীকে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব দিয়ে এই নিয়োগ সম্পন্ন করেন। এই নিয়োগে ৯ জন শিক্ষক, ২৩ জন সেকশন অফিসার, ২৪ সহায়ক কর্মচারী এবং ৮৫ জন উচ্চ ও নিম্ন সহকারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

এর পরেই বিকেলে এই নিয়োগকে অবৈধ ঘোষণা করে চার সদস্যের একটি তদন্ত দল গঠণ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীরকে আহ্বায়ক, ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. মো. আবু তাহের ও ড. মো. জাকির হোসেন আখন্দকে কমিটির সদস্য এবং ইউজিসির পরিচালক মো. জামিনুর রহমানকে সদস্য-সচিব করে এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে নিয়োগে জড়িতদের চিহ্নিত করে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয় মন্ত্রণালয়ের উপসচিব শামিমা বেগম স্বাক্ষরিত এই আদেশে।

এদিকে এই নিয়োগে বিশ্ববিদ্যালয়ের বঞ্চিত ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের নিয়োগ দিয়েছেন উপাচার্য এমন কথা ছড়ালেও নিয়োগের তালিকে ঘেঁটে দেখা যায় ১৪১ জনের মধ্যে ছাত্রলীগের ২০/২৫ জনই নিয়োগ পেয়েছেন। তাদের অধিকাংশই ৩য় শ্রেণির পদে নিয়োগ পেয়েছেন। এই নিয়োগে এম আব্দুস সোবহানের অনুগত শিক্ষকদের স্বজন, সাংবাদিক নেতারাও নিয়োগ পেয়েছেন। এতে ক্ষোভ ঝেড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, ছাত্রলীগকে ব্যবহার করে উপাচার্য নিয়োগ বাণিজ্য সম্পন্ন করলেন। আর কলঙ্কিত হলো ছাত্রলীগ।

এদিকে এই নিয়োগের নিন্দা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধে বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের আহ্বায়ক কমিটি। শনিবার এক বিবৃতিতে এই নিয়োগের প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি জড়িতদের শাস্তিও দাবি করেছেন তারা।

  • 119
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে