গুরুদাসপুরে গাছ থেকে লিচু নামিয়ে বাজারে বিক্রির জন্য ব্যস্ত কৃষকরা

প্রকাশিত: মে ১৩, ২০২২; সময়: ৮:৫৫ pm |

এসএম ইসাহক আলী রাজু, গুরুদাসপুর : নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার গাছে গাছে লাল টস্ টসে লিচু। লিচুর ভারে মাটি ছুঁই ছুঁই অবস্থা। লিচুর গ্রাম নামে ক্ষ্যাত গুরুদাসপুর ,নাজিরপুর ,বিয়াঘাট ,নাড়ানপুর ,বেড়ঙ্গারামপুর ও শাহাপুর কালিনগড়। সে সব লিচু সংগ্রহ করে থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে আড়তে বিক্রির জন্য গ্রীষ্মকালীন এই ফল।

অনেকে আবার ক্রেতাদের দৃষ্টিকার্ষনের জন্য দাম হাঁকছেন। দূরদূরান্ত থেকে ফরিয়ারা আসছে সেগুলো ক্রয় করতে। যাবে দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরে। সব মিলিয়ে মধু মাসের এই ফলকে ঘিরে জমে উঠেছে গুরুদাসপুরে লিচুর পাইকারি মোকাম। দুপুরের পর থেকে শুরু হয় পাইকার, ফড়িয়া আর বিক্রেতাদের হাঁক ডাক। গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের বেড়ঙ্গারামপুর কানু ব্যাপারির বটতলার চিত্র এটি।

ওই মোকাম এলাকায় প্রায় ৪ হাজার বিঘা জমিতে মোজাফ্ফর জাতের লিচুর আবাদ হয়। বৈশাখের শেষ সপ্তাহ থেকে এই লিচু সংগ্রহ শুরু হয়। গাছ থেকে সংগ্রহ করা তরতাজা লিচু দ্রুত মোকামে পাঠাতে অজপাড়া গাঁয়ে গড়ে উঠেছে লিচুর আড়তটি। সেটা ২০০১ সাল থেকে। তথ্যটি জানালেন বেড়ঙ্গারামপুর কানু ব্যাপারির বটতলার ‘লিচু আড়তদার সমিতির সভাপতি মো. সাখাওয়াত হোসেন মোল্লা।

সমিতির সভাপতি মো. সাখাওয়াত হোসেন মোল্লা বলেন, এখানে ২০ থেকে ২৫টি লিচুর আড়ত গড়ে উঠেছে। প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ ট্রাক লিচু (প্রতি ট্রাকে ২০০ ঝুড়ি, এক ঝুড়িতে ২হাজার ২০০টি লিচু থাকে) এখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে ঢাকা, সিলেট,চট্রগ্রাম,যশোরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে এই মোকামের কর্মকান্ড।

সরেজমিন নাজিরপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন লিচু বাগান ঘুরে দেখাগেছে,- গাছে গাছে লাল টস টসে লিচু ঝুলছে। লিচুর ভারে ডালপালাগুলো মাটি ছুঁই ছুঁই অবস্থা। বাগান থেকে লিচু সংগ্রহ করছে শ্রমিকরা। সেসব লিচু ঝুঁড়িতে ভরে ভ্যানে করে নিয়ে যাচ্ছে, পাইকারি আড়তে। গুরুদাসপুরসহ আশ পাশের উপজেলার বাগান থেকে লিচু এসে জমা হচ্ছে বেড়ঙ্গারামপুর কানু ব্যাপারির বটতলার আড়তে।

বেড়ঙ্গারামপুর কানু ব্যাপারির বটতলার ‘লিচুর আড়তে মক্কা-মদিনা, হাজী ফলভান্ডার, ভাই ভাই ফলভান্ডার, দেশ ফলভান্ডার ঘুরে জানাগেল, প্রতি হাজার লিচু রকম ভেদে ১ হাজার ২০০টাকা থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে। বাগান থেকে আনা লিচুর উম্মুক্ত ডাকে তোলা হয়। সেখান থেকে যে পাইকার-ফড়িয়া সব চেয়ে বেশী দাম বলে সে কিনে নেন। এরপর কেনা লিচুগুলো আড়তে স্তুপি করে রাখা হয়। সেখান থেকে শ্রমিকরা তা প্যাকেট করছেন ট্রাকে উঠানোর জন্য।

কথা হয় সিলেটের বাদামতলি থেকে আসা ‘ মা-বাবা ফলভান্ডার’এর প্রতিনিধি শফিকুল ইসলামের সাথে, তিনি প্রতিদিনের সংবাদকে জানালেন,‘ সাত বছর ধরে এই মোকাম থেকে লিচু কিনে সিলেটে বিক্রি করেন। প্রতিদিন তিনি দেড় থেকে দুই লাখ পিস লিচু কিনে থাকেন। এই লিচু তিনি সিলেটে নিয়ে প্রতি হাজারে গড়ে ৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকা লাভে বিক্রি করবেন। তাঁরমতে, এখানকার লিচু আকার,রং-স্বাদ সবই ভাল।

একই রকম তথ্য জানালেন শ্রীমঙ্গলের ‘মৌসুমী ফলভান্ডার, ঢাকার মিরপুর কাজীপাড়ার ‘মানিক ফলভান্ডার, যাত্রা বাড়ির ‘বিক্রমপুর ফলভান্ডার ও চৌরাস্তা বিশ্বরোডের ফলভান্ডার’এর প্রতিনিধিরা। তবে ঢাকার বাদাম তলির ‘রিফাত এন্টারপ্রাইজ’এর প্রতিনিধি আশরাফুল ইসলাম জানালেন ভিন্নতথ্য। তারা আড়ত থেকে কোন লিচু কিনেন না। তারা লিচু গাছে ফুল আসার পর পরই এলাকায় এজেন্ট নিয়োগ করে প্রায় কোটি টাকা দাদন দিয়ে থাকেন।

তাদের নিযুক্ত এজেন্টরা বাগান মালিকদের কাছ থেকে কম টাকায় বাগান কিনে থাকেন। লিচু সংগ্রহ করে তাদের আড়তে নিয়ে বাজার মূল্য হিসেবে মূল্য পরিশোধ করে থাকেন। ওই টাকার সুদ গড়ে ৫-১০%হারে কেটে নেওয়া হয়। এভাবে তারা ৩০-৪০টি বাগান কিনে নিয়েছেন। এসব বাগানের লিচু সংগ্রহ করতে বেড়ঙ্গারামপুর কানু ব্যাপারির বটতলার মোকামের প্রায় দুই কি.মি.দূরে মোল বাজার পয়েন্টে পৃথক আড়ত খুলেছেন। সেখান থেকে প্রতিদিন ৪-৫ট্রাক করে লিচু তাদের ঢাকাস্থ মোকামে নিয়ে যাচ্ছেন।

গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হারুনর রশিদ জানান, এই লিচু বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আগামজাত, সংখ্যায় বেশি ধরে, পোকার আক্রমন কম হয়, সুস্বাদু ফলের ৬০ভাগ রসাল (খাদ্য উপযোগী) ৪০ ভাগ ফেলনা (আঁটি) এবং শতভাগ ফরমালিন মুক্ত। বাগান থেকে সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছানোর কারনে চাহিদা অনেক বেশি। ওই কর্মকর্তার তথ্যমতে, গুরুদাসপুরেই ২০৫টি বাগান রয়েছে। এবছর ৪১০ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হয়েছে। গত বছরের চেয়ে ১০ হেক্টর বেশি। সময় মত পরিমিত কীটনাশক ব্যবহারে কৃষককে উদ্বুদ্ধ করাসহ প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগী প্রদান করা হয়। এবছর ৩ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন লিচু উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে।

কৃষক মোঃ ছালাউদ্দিন বলেন, ৬ বিঘা জমিতে লিচুর বাগান করেছেন। প্রতি বিঘায় ১২টি করে লিচুর গাছ রয়েছে। প্রতিটি গাছে গড়ে ৫ হাজার লিচু ধরেছে। প্রতি বিঘায় তাঁর খরচ গুণতে হয়েছে সার,কীটনাশক ও শ্রমিকবাবদ ১৫ হাজার টাকা। তাছাড়া লিচুর বাগানে সাথি ফসল কূলবড়ই, হলুদ, মুগডাল আবাদ করেও বাড়তি লাভবান হচ্ছেন তিনিসহ এলাকার শতশত লিচু বাগান মালিক।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপে