জোড়া খুনের ঘটনায় হামলা-ভাঙচুর

প্রকাশিত: মে ৫, ২০২২; সময়: ১:৫৬ pm |

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এক পক্ষের হামলায় দুইজন নিহত হওয়ার ঘটনার পর হামলাকারীদের বাড়ি-ঘরে পালটা হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। তবে বৃহস্পতিবার (৫ মে) সকাল ১১টা পর্যন্ত এ ঘটনায় বোয়ালমারী থানায় কোনো মামলা হয়নি।

ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল (বুধবার) দুপুর দেড়টার দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ফরিদপুর মর্গ থেকে স্বজনদের হাতে মৃতদেহদুটি তুলে দেয় পুলিশ। সন্ধ্যায় জানাজা শেষে খরসূতী কবরস্থানে মৃতদেহদুটি দাফন করা হয়।
এলাকাবাসী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক মোস্তফা জামান সিদ্দিকীর (৫৬) সাথে গোহাইলবাড়ী গ্রামের মরহুম বজলু খালাসির ছেলে আলফাডাঙ্গায় কর্মরত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আরিফ খালাসির (৫৫) বিরোধ চলছিল। গত ১৬ এপ্রিল গোহাইলবাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্বাচনে দুই পক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মোস্তফা জামান সিদ্দিকী পুনরায় ওই স্কুল কমিটির ব্যবস্থাপনা পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন।

মোস্তফা ওই ইউনিয়নের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দিন আহমেদের ছেলে। নিহত ওই দুইজন মোস্তফা জামান সিদ্দিকীর সমর্থক। অপর দিকে আরিফের বাবা বজলু খালাসির নামে এলাকায় স্বাধীনতার সময়ে বিতর্কিত ভূমিকার অভিযোগ রয়েছে। এই বিষয়টি নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বিরোধ দীর্ঘদিনের।

এই বিরোধ নিয়ে উভয় পক্ষ মাঝে মধ্যেই সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। বিরোধ নিষ্পতির জন্য জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে একাধিকবার শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সমাবেশ করা হয়েছে। উভয় পক্ষই আর সংঘর্ষে যাবে না মর্মে পুলিশের কাছে অঙ্গিকার করেছে। জমা দিয়েছে দেশীয় অস্ত্র। তারপরও সংঘর্ষ ঠেকানো যায়নি।

প্রসঙ্গত, গত মঙ্গলবার (৩ মে) দুপুর ২টার দিকে আরিফ সমর্থকেরা ৮/১০টি মটোরসাইকেল নিয়ে গোহাইলবাড়ি বাজারে মহড়া দিয়ে অতর্কিত হামলায় চালায় মোস্তফার মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। এতে দুইজন নিহত এবং মোস্তফার দুই ভাইসহ পঁচজন আহত হন।

এ হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে মোস্তফার সমর্থকরা মঙ্গলবার রাতে আরিফের সমর্থকদের বাড়ি-ঘরে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাট করে। এলাকাবাসী সুত্রে জানা গেছে, গোহাইবাড়ী ও দৌত্যেরকাঠি গ্রামে অন্তত ১২টি বাড়িতে হামলা-ভাচুর ও লুটপাট হয়। হামলার ঘটনা ঘটে গোহাইলবাড়ি গ্রামের রবিউল ইসলাম (৫২), মুরাদ মোল্লা (৩২), নূর আলম (২০), জিয়াউর রহমান (৩০) এবং অতিয়ার শেখসহ (৪০) চারটি বাড়িতে।

আতিয়ার শেখ জানান, ২৫/৩০ জন ব্যক্তি মঙ্গলবার রাতে তাদের বাড়িতে হামলা করে তিনটি ঘর ভাঙচুর করে। হামলাকারীরা পেঁয়াজ, চাল ও দুটি গরু লুট করে নিয়ে গেছে। নূর মোল্লা জানান, হামলাকারীরা তার বাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে। হামলার ভয়ে তারা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

এদিকে ঈদের দিন প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত দুইজনের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। ঈদের আনন্দের পরিবর্তে অজানা ভবিষ্যতের শঙ্কায় পরিবার দুটির স্বজনেরা। ঘোষপুর ইউনিয়নের গোহাইলবাড়ি গ্রামে পাশাপাশি অবস্থিত পরিবার দুটিতে চলছে শোকের মাতম।

নিহত কৃষক খায়রুল শেখের (৪৫) বাড়িতে কান্নার আওয়াজে ভারি হয়ে উঠেছে পরিবেশ। খায়রুল এক ছেলে ও এক মেয়ের বাবা। নিহতের একমাত্র ছেলে ইয়াছিনের বয়স ১৫ বছর। নিহতের মা জরিনা বেগম (৭০) বলেন, আমার ছেলের হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই। যারা আমার ছেলেকে ঈদের দিন কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে তাদের বিচার চাই।

নিহত খায়রুল শেখের মেয়ে রাবেয়া বেগম বলেন, ঈদের দিন আমি শ্বশুর বাড়ি মধুখালি থেকে বাবার বাড়ি গোহাইলবাড়ি আসছিলাম। বাবা আমাকে এগিয়ে আনতে দুপুরে বাড়ি থেকে বের হন। তখন গোহাইলবাড়ি গ্রামের আরিফের অনুসারী আমজেদসহ কয়েকজন আমার বাবাকে কুপিয়ে মেরেছে। আমার বাবার হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই। আমি মৃত্যুর বদলে মৃত্যু চাই।

নিহত খায়রুলের স্ত্রী নাসিমা বেগম বলেন, ঢাল, সড়কি, রামদা, চাইনিজ কুড়াল দিয়ে আরিফের লোকেরা আমার স্বামীকে হত্যা করেছে। নিহত খায়রুল শেখের কয়েকটি বাড়ি পরেই প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত আকিদুল মোল্লার (৪৬) বাড়ি। তিনি এক মেয়ে ও চার ছেলের বাবা।

আকিদুল শেখের হত্যাকাণ্ডে পরিবার ও প্রতিবেশীরা বাকরুদ্ধ। জন্মের সময় মা মারা যাওয়া আকিদুলের ছোট মেয়ে আছিয়ার বয়স মাত্র দুই বছর। মায়ের আদর বঞ্চিত আছিয়া এখনো জানে না তার বাবাও আর বেঁচে নেই। আকিদুল মোল্লার চার ছেলের মধ্যে বড় ছেলে আজিজের বয়স ১৫ বছর, মেজ ছেলে রিয়াজুলের বয়স ১৪, সেজ ছেলে মমিনের বয়স ১০ বছর এবং ছোট ছেলে মোস্তাকিনের বয়স ৭ বছর। এতিম হয়ে পড়া এই পাঁচ শিশুর দায়িত্ব নিজের কাঁধে পড়ায় তাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নির্বিকার আকিদুলের সত্তর বছর বয়সী অসুস্থ মা সাহেদা বেগম।

সহকারী পুলিশ সুপার (মধুখালী সার্কেল) সুমন কর জানান, এ দুটি হত্যার ঘটনায় বৃহস্পতিবার (৫ মে) সকাল ১১টা পর্যন্ত বোয়ালমার থানায় কোনো মামলা হয়নি। গতকাল সন্ধ্যায় মৃতদেহ দুটির দাফন হয়েছে। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।

বিভিন্ন বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাটের ব্যাপারে জানতে চাইলে সুমন কর বলেন, হামলা-ভাংচুর বা লুটপাটের ঘটনা ঘটেনি। তবে অনেকে হামলার শঙ্কায় বাড়ির মালপত্র সরিয়ে অন্যত্র চলে গেছে। তাদের পুলিশ বাধা দেয়নি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপে