পেরেকে ক্ষত-বিক্ষত রাস্তার ধারের গাছ

প্রকাশিত: এপ্রিল ২৬, ২০২২; সময়: ১০:১৪ am |

কপোত নবী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ : মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) এর কোন নিবন্ধন ছাড়াই চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাজুড়ে প্রায় ৩৫-৪০টি শাখায় অবৈধভাবে ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে বিভিন্ন সমাজ উন্নয়ন সংস্থা। ক্ষুদ্র ঋণের পাশাপাশি বিভিন্ন পণ্যদ্রব্যও উৎপাদন করছে তারা।

সচেতনতামূলক বিভিন্ন পোস্টার লাগিয়ে এসব পন্যদ্রব্য ও অবৈধ এনজিও’র বিজ্ঞাপন প্রচার করতে তারা বেছে নিয়েছে রাস্তার দুই ধারের গাছকে। আর গাছের সাথে লাগানো এসব পোস্টারে দেয়া হয়েছে পেরেক।

বিভিন্ন ফসলের কীটনাশক ও বালাইনাশক উৎপাদন করে অটো ক্রপ কেয়ার লিমিটেড। ফসলী জমির জন্য উপকারী নানা ওষুধ উৎপাদন করলেও গাছের বিষয়ে তারা যেন উদাসীন। রাস্তার ধারের গাছে বড় বড় পেরেক দিয়ে নিজেদের বিভিন্ন কীটনাশক ও বালাইনাশকের বিজ্ঞাপন প্রচার করেছে তারা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার কায়েমপুর ডোবারমোড়ে সকল প্রকার বাঁশ, বাঁশের বেড়া, নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বাঁশের খুঁটি বিক্রি করে নিসফা বাঁশ ঘর। আশেপাশের গ্রামের বিভিন্ন সড়কজুড়ে রয়েছে তাদের প্রচারণামূলক ফেস্টুন।

রাস্তার দুই ধারের গাছে লাগানো এসব ফেস্টুনে দেয়া হয়েছে পেরেক। নিসফা বাঁশ ঘরের মতোই স্থানীয় বালু ও খোয়া ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসার প্রচারণা চালাতে ব্যবহার করেছে রাস্তার ধারের গাছে লাগানো পেরেকযুক্ত ব্যানার।

প্রত্যেকটি গাছে প্রায় দেড়-দুই ইঞ্চির পেরেক দিয়ে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছে রাজশাহী হোমিও হল এ্যান্ড কাউন্সিলিং সেন্টার এবং সরকার হোমিওপ্যাথিক এ্যান্ড কাউন্সিলিং সেন্টার। তাদেরকে অনুসরণ করেছে হাড় জোড় চিকিৎসালয় নামের একটি চিকিৎসা কেন্দ্র। সোনা, রুপা, চাঁদনীর বিভিন্ন গহনা নদীতে পড়ে গেলে তুলে দেয় গোলাম রহমান। এটি প্রচার করতে তিনিও ব্যবহার করেছেন রাস্তার ধারের গাছ। লাগিয়েছেন বড় বড় পেরেক।

ক্ষুদ্র ঋণ দানকারী প্রতিষ্ঠান উষা মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি নিজেদের প্রচারণা ছাড়াও কেউ জমিজমার মালিকানার নোটিশ, কেউ আবার জমি বিক্রির বিজ্ঞপ্তি প্রচারের জন্য পেরেক ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন লাগিয়েছে। ‘গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান’ এমন পরিবেশবান্ধব স্লোগানের ব্যানার ঝুলছে গোমস্তাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন সড়কে। অথচ পরিবেশ বাঁচানোর আহ্বান জানিয়ে গাছে লাগানো ব্যানারেও দেয়া পেরেকের যন্ত্রণা। রাস্তার ধারের গাছে লাগানো এসব পেরেকের গা বেয়ে আঠা বের হতে দেখা যায়।

জানা যায়, বন বিভাগ ও বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কোন অনুমতি ছাড়াই গাছে পেরেক লাগানো হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-গোমস্তাপুর, রহনপুর-আড্ডা, রহনপুর-যাতাহারা, নাচোল-রহনপুর, ভোলাহাট-রহনপুর সহ বিভিন্ন সড়কের রাস্তার ধারের গাছে লাগানো হয়েছে এসব পেরেক।

স্কুলশিক্ষক মাহফুজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের খ্যাতনামা বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু বহুদিন আগে এটা প্রমাণ করেছে যে, গাছেরও জীবন আছে। আঘাত দিলে কষ্ট পায়। অথচ মধুমতি এনজিও রাস্তার ধারের সরকারি গাছে ইচ্ছেমতো কাঁটা (পেরেক) লাগিয়েছে। রাস্তার ধারের হাজার হাজার গাছে তারা এভাবে পেরেক দিয়েছে।

কলেজছাত্র আপন রেজা নিসান জানান, যেকোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন তাদের বিজ্ঞাপন প্রচার করতেই পারে। তবে একাজে রাস্তার ধারের সরকারি গাছ কেন ব্যবহার করবে? গাছের তো প্রাণ আছে। তাদের মনে কি নূন্যতম দয়া-মায়া নাই। এভাবে রাস্তার গাছগুলোতে পেরেক দিয়ে সাইনবোর্ড, বিজ্ঞাপন প্রচার করা অন্যায়।

গাছ কিনে নিয়ে তা কেটে কাট হিসেবে বিভিন্ন কারখানায় বিক্রি করেন সাত্তার আলী। তিনি জানান, আমরা যখন মরা ও জীবিত গাছগুলো কাটতে যায়, তখন দেখতে পায়, পেরেকের জন্য গাছগুলোর কতো ক্ষত তৈরি হয়। পেরেকের জন্য গাছের শুধু কষ্টই হয় না। আসবাবপত্র নির্মানের উপযোগী করে কাটা কাঠের জন্যেও তা বিরাট প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। কারন পেরেকের কারনে স্বাভাবিক বেড়ে উঠতে পারে না গাছ। তাছাড়া পেরেকের গোড়া দিয়ে গাছের যে রস বের হয়, তাতেও কাঠ নষ্ট হয়।

মাছ ব্যবসায়ী ও কৃষি উদ্যোক্তা সুমন আলীর মতে, গাছে পেরেক দিয়ে তারা খুব অন্যায় কাজ করেছে। তাদের শাস্তি হওয়া উচিত। কিন্তু এসব অপরাধের বিষয়গুলো দেখার কেউ নাই। স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের প্রতি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান তিনি।

মকরমপুর বালু পয়েন্টের ম্যানেজার আব্দুল করিম মুঠোফোনে বলেন, আমাদের বালুর পয়েন্টের প্রচারণা করতেই রাস্তায় থাকা গাছে ব্যানার-পোস্টার লাগিয়েছি। গাছেরও জীবন আছে। তাই এসব পোস্টার-ব্যানারে পেরেক দেয়া ঠিক হয়নি।

এবিষয়ে কথা বলতে মধুমতি সমাজ উন্নয়ন সংস্থার জেনারেল ম্যানেজারের বক্তব্য নিতে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।

এদিকে, পেরেকযুক্ত ব্যানারে দেয়া সরকার হোমিওপ্যাথিক এ্যান্ড কাউন্সিলিং সেন্টারের যোগাযোগ করার জন্য যে ফোন নাম্বার দেয়া আছে, তাতে ফোন দিলে কেটে দেয়া হয়। হাড় জোড় চিকিৎসালয়ের চিকিৎসক নজরুল ইসলাম জানান, অনেকেই গাছে পেরেক দিয়ে নিজেদের এমন প্রচারণা করেন। তাই আমরাও করেছি। এর থেকে আমার বেশিকিছু আর জানা নেই।

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-বিএমডিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী শফিুকুল ইসলাম জানান, রাস্তার দুই ধারের গাছে পেরেক মারা খুব অন্যায়। গাছগুলো যেহেতু স্থানীয় সমিতির অধীনে থাকে, তাই বিষয়টি নিয়ে আমরা স্থানীয় সমিতির মাধ্যমে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ বন বিভাগের সহকারী পরিচালক মেহেদীজ্জামান বলেন, এসবের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফাতেমা পারভীন জানান, ছোট পেরেক সাধারণত গাছের উপরের অংশে থাকা মরা টিস্যুতে থাকলে তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতি হয় না। তবে পেরেক বড় হলে উদ্ভিদের পরিবহন টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে মাটি থেকে পানি ও খনিজ লবণ সঠিকভাবে শোষণ করতে পারে না। উদ্ভিদ যে খাদ্য তৈরি করে তা সমস্ত সজীব অঙ্গে পরিবাহিত হতে বাধাপ্রাপ্ত হয়, এতে উদ্ভিদের বৃদ্ধি হ্রাস পায়।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক একেএম গালিভ খান মুঠোফোনে বলেন, রাস্তার ধারের এসব গাছে পেরেক লাগানো অন্যায়। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পেলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে যে বা যারা গাছে পেরেক লাগিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রকৃতি ও পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষায় গাছপালার অবদান ব্যাপক। কাজেই বৃক্ষ রক্ষার্থে জেলার সকল গাছ থেকে পেরেক সংবলিত বিজ্ঞাপন সরিয়ে মুক্ত করা হোক এটাই একমাত্র প্রত্যাশা।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপে