তাড়াশের শীর্ষ দাদন ব্যবসায়ী হেলালের খপ্পরে পড়ে নিঃস্ব শত শত মানুষ

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৩, ২০২১; সময়: ৬:০৪ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক, তাড়াশ : সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার মাগুড়াবিনোদ ইউনিয়নের ঘরগ্রাম পূর্বপাড়া গ্রামের মো. হেলাল হোসেন স্কুল জীবন থেকে প্রচন্ড ধুরন্ধরবাজ প্রকৃতির। বাবা মোজাম্মেল হক পেশায় ছিলেন একজন পুলিশ কনস্টেবল। তিনি মারা গেছেন অনেক আগেই। রেখে গেছেন তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। হেলাল হোসেন এদের মধ্যে তৃতীয়। বর্তমানে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলা বিএনপির প্রস্তাবিত কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, হেলাল হোসেন কলেজ জীবনের শুরুতেই বিয়ে করেন সনাতন ধর্মাবলম্বী এক নাবালিকাকে। এনিয়ে মেয়ের বাবা মামলাও দায়ের করেন। পালিয়ে ছিলেন বেশ কয়েক মাস। পরে সামাজিকভাবে মামলার ফয়সালা হয়। সম্প্রতি স্ত্রী ও তিন কণ্যা সন্তান রেখে পরকিয়া প্রেমের মাধ্যমে বিয়ে করেছেন দুই সন্তানের জননী এক স্কুল শিক্ষিকাকে।

তথ্যানুসন্ধানে অরও জানান যায়, হেলাল হোসেনের বাবা মোজাম্মেল হক জীবদ্দশায় রেখে যান প্রায় ১০-১২বিঘা জমি। নানা অপকর্ম করতে গিয়ে প্রায় সবই বিক্রি করে ফেলেন হেলাল হোসেন। সব হারিয়ে অভাবের তাড়নায় নিজ এলাকা তাড়াশে মিলন সিনেমা হলে টিকিট বিক্রেতার চাকরী নেন। এতেও সংসার চালাতে রীতিমত হিমশিম খেতে হতো তাকে। অভাব যেন তাকে তাড়া করে ফিরছিলো। নিরুপায় হয়ে ১৯৯৮সালে দেশ ছেড়ে চলে যান সৌদী আরব। সেখানে তিন বছর থেকে দেশে ফেরেন।

যে টাকা উপার্জন করেছিলেন তাও শেষ করেন মাদক, জুয়া, নারীসহ নানা অপকর্মের পিছনে। অভাবে পড়ে জড়িয়ে পরেন কষ্টিপাথরের মূর্তি, মাদক ব্যবসাসহ নানাবিধ অবৈধ কর্মকান্ডের সাথে। স্থানীয়দের মতে সেখান থেকেই পেয়ে যান অর্থনৈতিক সফলতার সিঁড়ি। উচ্চাভিলাসী হেলাল হোসেন আরও অর্থবিত্ত অর্জনের সহজ পথ হিসেবে বেছে নেন সুদের কারবার। থাকেন বিলাসবহুল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাড়িতে। ব্যবহার করেন এক্সিও টয়োটা প্রাইভেট কার। তিনি বর্তমানে প্রায় ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা কয়েকশ’ অসহায় পরিবারের মাঝে উচ্চহারে ঋণ দিয়ে রেখেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি সুদে ঋণ দেয়ার সময় নিরুপায় ঋণ গ্রহীতার অসহায়ত্বকে পুঁজি করে কৌশলে নিয়ে নেন একাধিক স্বাক্ষরযুক্ত সাদা চেক।

এক সময় ঋণ গ্রহীতা মূল টাকা ফেরৎ দিলেও তিনি কৌশলে ১-২টি চেক নিজের কাছে রেখে দেন। পরবর্তীতে ওই চেকগুলোতে মোটা অংকের টাকা বসিয়ে মামলা করে অতিরিক্ত টাকা আদায় করেন। এছাড়াও হেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, তার অনুসারী আরও যারা সুদ কারবারী রয়েছেন তাদের কাছ থেকে টাকা দিয়ে কিনে নেন বিভিন্নজনের স্বাক্ষরযুক্ত সাদা চেক।

পরবর্তীতে ওই চেকগুলো দিয়ে মামলা করে অতিরিক্ত টাকা আদায় করেন। এভাবে শত শত মানুষকে নিঃস্ব করে ফেলেছেন এই হেলাল হোসেন। আর এ ধরণের লাগামহীন অপকর্মের ক্ষেত্রে তিনি থানার ওসি, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাসহ প্রধানমন্ত্রীর নিকটাত্মীয়দের সাথে বিশেষ সখ্যতা রয়েছে বলে নিজেকে জাহির করে থাকেন। এছাড়াও, তার পিছন থেকে জাল ঠেলছেন জেলা ও উপজেলা বিএনপির শীর্ষনেতারা। এভাবে জনমনে আতংক সৃষ্টি করে দাপটের সাথে চালিয়ে যাচ্ছেন সুদ কারবার।

এতে সর্বশান্ত ও জিম্মি হয়ে পড়েছেন সিরাজগঞ্জ, নাটোর ও পাবনা জেলার অনেক অসহায় মানুষ। হেলাল হোসেনের কাছে ভুক্তভোগী অনেকের স্বাক্ষরযুক্ত সাদা চেক ও নন জুডিশিয়াল ষ্ট্যাম্প থাকায় এবং প্রভাবশালী লোকজনের সাথে সখ্যতা থাকায় কেউ তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।

তবে, গত প্রায় এক বছর পূর্বে হেলাল হোসেনের নানা অপকর্মের প্রতিবাদ জানিয়ে স্থানীয়ভাবে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। যা স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকাগুলোতে প্রকাশও হয়। কিন্তু এতেও কোন ফল না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন এলাকার মানুষ ও ভুক্তভোগীরা। এলাকাবাসী ও ভূক্তভোগী অনেকেরই দাবি, দিন যতোই যাচ্ছে ততই বেপরোয়া হয়ে উঠছেন এই হেলাল হোসেন। এখনই লাগাম টেনে না ধরলে তিনি আরও ভয়ংকর হয়ে উঠবেন।

ভুক্তভোগী তাড়াশের খালকুলা বাজারের সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ী মাসুম মাষ্টার জানান, ব্যবসার প্রয়োজনে হেলাল হোসেনের কাছ থেকে পাঁচটি স্বাক্ষরযুক্ত সাদা চেক দিয়ে প্রায় তিনবছর আগে মাসিক ৫শতাংশ হারে সুদে এক লক্ষ টাকা নেই। তিন মাসের সুদ বাকি পড়ায় আমার নামে পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ কোর্টে মোট চারটি চেকে ৪৪লাখ টাকার মামলা করেছেন। ১লাখ ৬০হাজার টাকা পরিশোধ করার পর মামলাগুলো তুলে নিলেও এখনও তার কাছে একটি স্বাক্ষরযুক্ত সাদা চেক রয়েই গেছে। এখন চেক চাইলে খুঁজে পাচ্ছি না, দিচ্ছি বলে কালক্ষেপন করছেন। এদিকে, বেশি চাপ দিলে ওই চেক দিয়ে নতুন একটি মামলা ঠুকে দিয়ে আবারও হয়রানি করবে। যে কারণে ভয়ে কিছু বলা যাচ্ছেনা।

নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার আলীপুর গ্রামের ভুক্তভোগী আকবর হোসেন বলেন, হেলাল হোসেনের সাথে আমার কোন চেনাজানা ছিলো না। নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার মৌখাড়া গ্রামের আব্দুল মজিদ নামে একজন সুদ কারবারীর কাছ থেকে আমি প্রায় আট বছর পূর্বে তিনটি সাক্ষরযুক্ত সাদা চেক দিয়ে ২০শতাংশ হারে মাসিক সুদে তিন কিস্তিতে মোট সাত লাখ টাকা নেই। দুই বছর পর জমি বিক্রি করে দুই কিস্তিতে সে টাকা পরিশোধও করি।

কিন্তু তিনি আমার দেয়া চেকগুলো আর ফেরত দেননি। সেই চেকগুলোর মধ্যে একটি চেক হেলাল হোসেন টাকার বিনিময়ে আব্দুল মজিদের কাছ থেকে নিয়ে আমার নামে সিরাজগঞ্জ কোর্টে ২৫লাখ টাকার মামলা দায়ের করেন। মামলাটি এখন রায়ের পর্যায়ে রয়েছে বিধায় কোন উপায় না পেয়ে বর্তমানে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। এসময় তিনি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সঠিক তথ্য বেড় করে হেলালের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

তাড়াশের কাওরাইল গ্রামের মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, হেলাল হোসেনর কাছ থেকে তিনটি সাক্ষরযুক্ত সাদা চেক দিয়ে সুদের উপর ৭ লাখ টাকা ঋণ নেই। দীর্ঘদিন নিয়মিত সুদ দিয়ে আসলেও দুই মাস বাকী পরায় ওই তিনটি চেক দিয়ে আমার নামে সিরাজগঞ্জ ও নাটোর কোর্টে মোট ৬০লাখ টাকার মামলা করে। পরে কোন উপায় না পেয়ে হেলাল হোসেনের পরামর্শে আমার দুই একর সতের ডেসিমাল জমি নাটোরের যমুনা ব্যাংকে মর্টগেজ রেখে সমুদয় টাকা পরিশোধ করি। কিন্তু এরপরও হেলাল হোসেন মামলা তুলে নিচ্ছেন না। উপরোন্ত আমাকে এখনও ব্যাংকের সুদ গুনতে হচ্ছে।

তাড়াশের নওগাঁ গ্রামের মো. আব্দুল খালেক বিএসসি জানান, প্রায় তিন বছর পূর্বে হেলাল হোসেনের কাছ থেকে তিন দফায় সুদে ৫ লাখ টাকা নেই। বিনিময়ে হেলাল হোসেনকে তিনটি সাক্ষরযুক্ত সাদা চেক দিতে হয়। নিয়মিত সুদের টাকা দিতে না পারায় আমার নামে সিরাজগঞ্জ কোর্টে ২০লাখ টাকার মামলা করেছে।

এ ছাড়াও পাবনা জেলার চাটমহর উপজেলার সমাজ গ্রামের আবুল হাশেম, তাড়াশ উপজেলার চকরসুল্লা গ্রামের মো. মাসুদ, নওগাঁর ইউনয়নের সাকুয়াদিঘী গ্রামের রফিকুল ইসলাম রফিকসহ পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ জেলার এমন ভুক্তভোগী শতাধিক মানুষ তাদের পরিবার নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন। ভুক্তভোগী মানুষগুলো প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সুদ কারবারী হেলাল হোসেনের এমন কর্মকান্ডের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি এবং দৃষ্টান্তকমূলক শাস্তি কামনা করেছেন।

তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেজবাউল করিম বলেন, এব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে সরকারি কোন নির্দেশনা নেই। তবে বিষয়টি খোজঁ নিয়ে দেখা হবে।

জেলা সমবায় কর্মকর্তা সামিউল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, ব্যক্তি পর্যায়ে সুদকারবারীরা আমাদের আওতার বাইরে। তাদের ব্যাপারে আমাদের করণীয় ক্ষমতার বাইরে। পুলিশ সুপার মো. হাসিবুল আলম বলেন, সংক্ষুব্ধ কেউ অভিযোগ দিলে প্রয়োজনিয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে