টাকা দিতে না পারায় মর্গের সামনে দিনভর ছেলের লাশের অপেক্ষায় বাবা

প্রকাশিত: জুলাই ১৪, ২০২১; সময়: ১১:২৮ am |

নিজস্ব প্রতিবেদক, কুষ্টিয়া : চারবার টাকা দিয়েও ১৩ বছরের ছেলের লাশ হাসপাতালের মর্গে থেকে বের করতে পারেনি হতভাগ্য এক ভ্যান চালক পিতা। সর্বশেষ দাবি করা ১০ হাজার টাকা দিতে না পারায় সারাদিন হাসপাতালের মর্গে লাশ আটকিয়ে রাখা হয়।

ছেলের লাশের অপেক্ষায় দিনভর মর্গের সামনে বসে ছিল হতদারিদ্র সেই পিতা। হৃদয় বিদারক ঘটনাটি ঘটেছে মঙ্গলবার বিকালে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে।

সারাদিন বসে থেকে ছেলের লাশ না পেয়ে শেষ বিকালে মর্গের সামনে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন ভ্যান চালক কমল প্রামানিক। তারা আকুতি ‘আমি গরিব মানুষ, আমি টাকা কোথায় পবো। আমার এতো টাকা দেয়ার মতো কোন সামথ্য নেই।’

পরিবারটির অভিযোগ, পুলিশের সহযোগিতায় মোটা অংকের টাকা দাবি করেন মর্গের ডোম লক্ষণ ও হীরা লাল।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, দৌলতপুর উপজেলার হোগলবাড়িয়া ইউনিয়নের গাছেরদিয়াড় টলটলিপাড়ার হতদরিদ্র ভ্যান চালক কমল প্রামানিকের ১৩ বছরের ছেলে শান্ত। কয়েক বছর মাদ্রাসায় পড়াশুনা করেছে। অভাব-অনটনের সংসারে পড়াশুনা ছেড়ে বর্তমানে কৃষি কাজ করতো।

সোমবার সন্ধ্যায় মায়ের ওপর অভিমান করে নিজ বাড়িতে কীটনাশক পান করে শান্ত। রাত ৭টার দিকে পরিবারের লোকজন তাকে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে তাঁর অবস্থার অবনতি হলে রাতেই কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়।

হাসপাতালে নিয়ে আসলে রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিৎসক শান্তকে মৃত ঘোষণা করেন। তাৎক্ষনিক হাসপাতালের জরুরী বিভাগ থেকে লাশ মর্গে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

বিকাল চারটায় লাশ কাটা ঘরের সামনে বুকফাটা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন ভ্যান চালক কমল প্রামানিক। বারবার ফুপিয়ে ফুপিয়ে বলতে থাকেন, ঘরের মধ্যে ডেকে নিয়ে ওরা আমার ছেলের মরদেহ দেখিয়ে বলে, বুকের অর্ধেক কাটলে ৫ হাজার, পুরো কাটলে ১০ হাজার আর কপাল কাটতে আরো ছয় হাজার টাকা দেয়া লাগবে। তা না হলে লাশ কাটা হবে না। ওদের বারবার বলেছি আমি গরিব মানুষ, আমার এতো টাকা নেই। ওরা ক্ষিপ্ত হয়ে আমার চোখের সামনে ছেলের মরদেহ গরু ছেলার মতো চর চর করে ফেরে ফেলেছে। পুলিশের সামনে ডোমরা যখন টাকা দাবি করেন।

তখন পুলিশ বলছে এরা কি এসব বোঝে, তুমি এইটুকু কাটবা, এইটুকু কাটবা দেখাচ্ছো। এরা তো ওই সব বোঝে না। যে যেমন লোক, তার সাথে সে রকম করো। আমি পুলিশ ভাইকে বারবার অনুরোধ করে বলছি, ভাই আমি গরিব মানুষ। আমি ভ্যান চালাই খাই। আমার টাকা দেয়ার মতো কোন অবস্থা নেই। আমি টাকা কোথায় পাবো। উল্টো পুলিশ আমাকে বলছে, এসব কথা এখানে চলবে না। আমি বারবার বলেছি, ভাই আমার দেয়ার মতো ক্ষমতা নেই। আমার সহযোগিতা করার মতো লোকও নেই। আমার পাশে এসে দাঁড়াবে এমন একটা লোকও আমার নেই। ওরা আমার কোন কথায় শোনেনি। সকাল থেকে এখন চারটে বাজে, আমার ছেলেকে এখনো নিয়ে যেতে পারেনি। লাশ কাটি এখন বলছে টাকা ছাড়া আমার ছেলেকে দেবে না। আমি এখন টাকা কোথায় পাবো। দশ হাজার টাকা দিয়ে লাশ নিয়ে যেতে বলছে। আমার কাছে তো টাকা নেই। ভাইগো আমার দশ হাজার টাকা দেয়ার কোন পরিবেশ নেই।

ভ্যান চালক কমল প্রমানিক বলেন, রাতে লাশ মর্গে ঢোকানোর সাথে সাথে লাশ পাহাড়া দেয়ার কথা বলে আমার কাছ থেকে ১৫শ’ টাকা দাবি করে দুইজন ডোম। আমি গরিব মানুষ, আমি টাকা কোথায় পাব, একথা বলতেই আমার ওপর রেগে উঠে। পরে আমার ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে ১৫শ’ টাকা ধার করে ওদের দিয়ে রাতে বাড়ি চলে যায়। সকালে আসার সাথে সাথে আবার ৭০০ টাকা, পরে আরো একশ টাকা নেয়। দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকেও বিভিন্ন খরচের কথা বলে আমার কাছ থেকে ১ হাজার ৫৫০ টাকা নিয়ে নেয়। বিকালে সংবাদ পেয়ে গণমাধ্যমীরা মর্গের সামনে গেলে তাঁরা নিজেরাই তাড়াহুড়া করে লাশ একটি এম্বুলেন্সে উঠিয়ে দেয়।

শান্তর চাচা মামুন বলেন, সংবাদ শুনে দুপুরে আমি হাসপাতালের মর্গের সামনে এসে দেখতে পাই, দুই ডোম ও একজন পুলিশ সদস্য এক টেবিলে বসে সিগারেট খাচ্ছেন। পাশে শান্তর আব্বা দাঁড়িয়ে টাকা নিয়ে কথা বলছেন। এসময় আমি মোবাইলে ভিডিও করার চেষ্টা করলে তাঁরা টের পেয়ে যায়। পরে আমাকে ভিডিও করতে দেয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতালের মর্গে কর্তব্যরত পুলিশ কনেষ্টবল হাবিব জানান, তাঁর সামনেই ডোমরা টাকা দাবি করেছে। আমি তাঁদের কোন কিছু বলিনি। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে হাসপাতালের মর্গের ডোম লক্ষণ জানান, তাঁদের কাছে কোন টাকা দাবি করা হয়নি। তাঁরা ইচ্ছে করে লাশ ফেলে রেখেছে।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবদুল মোমেন বলেন,এমন কোন অভিযোগ আমার কাছে আসেনি। অভিযোগ পেলেই অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

  • 121
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে