চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম উৎপাদনে রেকর্ড, লকডাউনে বিপাকে চাষীরা

প্রকাশিত: জুলাই ৭, ২০২১; সময়: ৯:৫৮ pm |

ডি এম কপোত নবী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ : চলতি বছরে আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৫ হাজার ৭৩৮ হেক্টর জমিতে আম চাষ হচ্ছে। সেখানে ২ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদনের সম্ভাবনা আছে। জেলা কৃষি সম্প্রাসরণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বিষয় টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, এবার আমের তুলনামূলক দাম কম হওয়ায় আম চাষী ও ব্যবসায়ীরা অন্য বছর থেকে কম লাভবান হতে পারে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত ১০ বছরের রেকর্ড ভঙ্গ করে এবার আমের উৎপাদন হতে চলছে। আর গত ২০ বছরেও এবারের মত বিপর্যয় ঘটেনি আম উৎপাদন কারীদের ভাগ্যে।

গত ২৭ জুন সোমবার থেকে সিমিত লকডাউন ও ১ জুলাই বৃহস্পতিবার থেকে কঠোর লকডাউন ঘোষণার পরই ২৭ জুন থেকে শুরু হয় দরপতন। এরআগে ঢাকাসহ পাশের ৭ টি জেলায় লকডাউন শুরু হলে প্রথম দফায় দরপতন হতে থাকে। ঢাকাসহ পাশের সাত জেলায় রকডাউন শুরুর পর ঢাকা ও আপাশের আড়ৎদাররা আম কেনা কমিয়ে দেয়ায় স্থানীয় বাজারে সরবরাহ ব্যাপক থাকা আম বাজারে ধস নামায়। এতে আম চাষীরা তাদের উৎপাদিত আম নিয়ে চরম উৎকণ্ঠা ও বিপাকে পড়েন।

গত বুধবার থেকে বাজারে সরবরাহও দরপতন শুরু হয়। বাইরের আড়তদাররা আম পাঠাতে নিষেধ করেন স্থানীয় ব্যাপারী ও আড়তদারদের। কারন হিসেবে স্থানীয় ব্যাপারী ও আড়তদাররা জানান বাইরের আড়তদাররা দোকান খুলা রেখে খুচরা বিক্রেতাদের আম সরবরাহে বাধার মূখে পড়ে। আর খুচরা বিক্রেতারাও কোনভাবে দোকান খুললে গ্রাহক কম লকডাউনের কারনে। বেঁচা কেনা নেমে আসে সিকি পরিমানে।

ম্যাংগো ফাউন্ডেশনের সদস্য সচিব ও সংবাদকর্মী আহসান হাবিব জানান লকডাউনের এ পরিস্থিতিতে ঢাকা,চিটাগাং,কুমিল্লাহসহ দেশের সব আম আড়ত খোলা রাখা ও সরবরাহে সবধরনের সহায়তা কামনা,কুরিয়ার আড়ত বা বাজার থেকে যারা আম বেচা কেনায় জড়িত ভোক্তা ও খুচরা ব্যবসীদের নির্বেঘ্নে যাতায়তে বাধা না দেয়ার আবেদন জানাচ্ছি।

তিনি আরো জানান আম রপ্তানীতে কার্গোভাড়া কমানো এবং রপ্তানীকারকদের প্রনোদোনা প্রদানসহ উৎপাদনকারীদে বীমার ব্যবস্থা করতে হবে এবং প্রনোদোনা প্রদান করতে হবে সরকারকে। তিনি আরো জানান এসময়ে ল্যাংড়া ও ক্ষিরসাপাত প্রায় শেষ। বাজারের এখন আম্রপালি ও ফজলিসহ আশ্বিনা আমের নায্য দাম ও সরবরাহে সমস্যা না থাকলে ক্ষতি কাটিয়ে উঠা সম্ভব।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে এবার আমের বাম্পার ফলন হলেও করোনা ও লকডাউন আতঙ্কে আম বাজারে ধস নামায় আম চাষীরা তাদের উৎপাদিত আম নিয়ে চরম উৎকণ্ঠা ও বিপাকে পড়েছে। গত বছরের তুলনায় বাজারে এবার আমের দাম অর্ধেকের কম। যা দিয়ে চাষীর উৎপাদিত খরচও পাচ্ছে না। এতে ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা এ বছর এক হাজার কোটি টাকার তি হবেন আম ব্যবসায়ীরা।

দুই সপ্তাহ আগেও যেখানে কৃষক কিছুটা ভাল দাম পাচ্ছিলেন,সেখানে কঠোর লকডাউন ঘোষনার পরই আমের বাজারে নামে চরম ধ্বস। দাম কমে যাওয়ায় আম উৎপাদনকারীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরো বেশী করে ফুটে উঠে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জিআই পণ্য খ্যাত রিসাপাত আম এ মৌসমের শুরুতে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা মন দর ছিল। এবার তা অর্ধেকেরও কমে নেমে আসে। তবে মান ভেদে ক্ষিরসাপাত আম আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা মন দরে বিক্রি করছেন অনেকেই।

গত বছর রিসাপাতের আমের দাম ছিল তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার। এসময়ে রিসাপাত আমের মন যেখানে ৫ হাজার টাকা পৌছার কথা ছিল সেখানে আমের বড় বাজার কানসাটে শনিবার বিক্রি হয় দুই হাজার সাতশ থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা। গত বছর এসময়ে ল্যাংড়া আমের দাম ছিল ২,৫০০ থেকে তিন হাজার টাকা, শনিবার বিক্রি হয় দুই হাজার থেকে দুই হাজার দুইশ টাকা।

গত বছর এসময়ে ফজলির দাম ছিল ১,৫০০ থেকে ১,৬০০ টাকা, বর্তমানে এক হাজার থেকে এগারোশ টাকা। আম্রপালি ছিল ৩,০০০ টাকা, শনিবার ছিল ভাল মানেরটা দুই হাজার থেকে দুই হাজার তিনশ টাকা।

গত বছরের আমের বাজার ভাল থাকায় চলতি বছরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঁচটি উপজেলায় বাগান মালিক ও আম ব্যবসায়ীরা অধিক লাভের আশায় তাদের সর্বস্ব খুইয়ে আম বাগানে অর্থ যোগান দিয়ে আমচাষ করেছিলেন। বর্তমানে আমের যে মূল্য তাতে আম বিক্রি করে উৎপাদিত খরচের অর্ধেকও হবে না। অনেক ঘাটতি থেকে যাবে বলে জানিয়েছে আম চাষীরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, এ বছর আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রায় ৩ লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হবে। নায্য মূল্য আম বিক্রি হলে, যার বাজার মূল্য প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। তবে দেশে করোনা ভাইরাসের কঠোর বিধিনিষেধ, লকডাউনে আমের বাজারে বিশিষ্ট আম ব্যবসায়ীরা আম ক্রয় করতে আসছেনা। লকডাউনে আমের বাজারে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে।

ঢাকা, সিলেট, চট্টোগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন আড়তে আম বিক্রি না হলে এখানে আমের দাম ভাল হবে না। এতে প্রায় এক হাজার কোটি লোকসানের শঙ্কায় ভুগছেন আম উৎপাদনকারীরা।

চাষীরা বলছেন, এবার বেশী গরমের কারনে যে জাতের আম পরে পাঁকার কথা,সে আমও পেকে যাচ্ছে। করোনার কারণে বাইরের ক্রেতা না আসায় স্থানীয় ক্রেতারা কিছু আম কিনে বাইরে পাঠাচ্ছেন। তারা অল্প দামে আম ক্রয় করছেন। এতে আমের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না চাষী ও ব্যবসায়ীরা। ক্রেতা না থাকায় লাভ তো দূরের কথা, গাছ থেকে আম নামানো ও বাজারজাতের খরচই উঠছে না অনেকেরই।

গত এক সপ্তাহ আগে কানসাট আম বাজারে সরবরাহ ও কেনা বেচা অনেক কম থাকলেও মানুষের ভিতি ও আবহাওযা ভাল থাকার কারনে সরবরাহ ও বিক্রি বেড়েছে।
কানসাট বাজারের নয়, জেলা সদর, নাচোল, গোমস্তাপুর, ভোলাহাট আম বাজারের একই চিত্র দেখা গেছে।

কানসাটের এক আম আড়ৎদার জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম শুনে আগে মানুষ আগ্রহ নিয়ে বেশি দামে ক্রয় করত । কিন্তু এবছর করোনা ভাইরাসের কারনে তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না । ব্যাপারী আসা কমে গেছে,কয়েকদিন থেকে লকডাউনের কারনে যাতায়ত সুবিধা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যাপারীদের আসা কমে গেছে।

 

  • 428
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে