করোনায় হাট বন্ধ, মান্দায় কোরবানির পশু নিয়ে হতাশ খামারীরা

প্রকাশিত: জুন ৩০, ২০২১; সময়: ৬:৩২ pm |

জিল্লুর রহমান, মান্দা : নওগাঁর মান্দায় কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে ছোটবড় খামারে লক্ষাধিক গবাদিপশু পালন করা হয়েছে। কিন্ত মহামারী করোনাভাইরাসের সংক্রমণরোধে উত্তরাঞ্চলের পশুর হাটগুলো ইতোমধ্যে বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। এতে হতাশ হয়ে পড়েছেন খামারীরা। আসন্ন ঈদে পশুগুলো বিক্রি করতে পারবেন কি-না এনিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।

খামারীদের দাবি, করোনার কারণে শুক্রবার (২৫ জুন) উপজেলার চৌবাড়িয়াতে বৃহৎ পশুরহাট বসতে দেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় তাদের পালিত গবাদিপশু হাটে তুলতে পারছেন না। ঈদে পশুগুলো বিক্রি করতে না পারলে ব্যয় বাড়তেই থাকবে। এতে চরম লোকসানের মুখে পড়বেন তারা।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা গেছে, এবারের কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে উপজেলার ৭ হাজার ২৪৭ জন খামারী গবাদিপশু লালন পালন করেছেন। বিক্রির তালিকায় রয়েছে ঝাঁড়, বলদ, গাভী, বকনা, মহিষ, ছাগল, ভেড়াসহ অন্যান্য প্রাণি। এদের সংখ্যা প্রায় ৪৫ হাজার। এছাড়া কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে তালিকার বাইরেও ছোটছোট খামার ও বাড়িতে গবাদিপশু পালন করা হয়েছে। পরিবেশ প্রতিকূল হওয়ায় বেচাকেনা সহজতর করতে চালু করা হয়েছে অনলাইন ব্যবস্থা।

সূত্রটি আরো জানায়, উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পক্ষ থেকে ‘অনলাইন গবাদিপশুর হাট মান্দা’ নামে একটি প্লাটফর্ম চালু করা হয়েছে। বিক্রেতারা সেখানে তাদের পশুর ছবি ও নাম-ঠিকানাসহ যাবতীয় তথ্য আপলোড করতে পারবেন। পশু পছন্দের পর আলোচনায় দরদাম ঠিক ও টাকা পরিশোধের মাধ্যমে বেচাকেনা করা যাবে এই অনলাইন প্লাটফর্মে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় ছোটবড় মিলিয়ে ৩০ হাজারেরও বেশি খামার রয়েছে। স্থানীয়ভাবে পালিত এসব গবাদিপশু থেকে এলাকার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি করে থাকেন খামারীরা। লাভজনক হওয়ায় অনেক বেকার যুবকরা আত্মনিয়োগ করেছেন এ পেশায়। সফলতাও পেয়েছেন অনেকে। কিন্তু করোনার কারণে হাট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেশ দুশ্চিন্তায় ফেলেছে তাদের।

সূত্রটি আরো জানায়, রাজশাহী সিটি হাটের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম পশুরহাট হচ্ছে নওগাঁর মান্দা উপজেলার চৌবাড়িয়া। উপজেলার সতিহাটও আরেকটি বৃহৎ পশুরহাট। এছাড়া কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে উপজেলার বিভিন্ন হাটে অস্থায়ী পশুরহাট বসানো হয়। অন্যদিকে নিয়ামতপুর উপজেলার ছাতড়া ও রাজশাহীর নাচোল উপজেলার সোনাইচন্ডিতে বসে বৃহৎ গরুরহাট। কিন্তু মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে ইতোমধ্যে এসব হাট বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন।

উপজেলার ফতেপুর গ্রামের খামারী আবু হেনা মকলেছার রহমান জানান, তার বাড়িতে শাহীওয়াল পাকিস্তানী জাতের একটি গাভী রয়েছে। এ গাভী ৩ বছর ২ মাস আগে একটি এঁড়ে বাছুরের জন্ম দেয়। অল্পদিনেই বাছুরটি তরতাজা হয়ে ওঠে। বাড়ন্ত গঠন দেখে বাছুরটি পালন করার সিদ্ধান্ত নেন। নাম দেওয়া হয় ‘শাহীরাজ’।

তিনি আরো বলেন, সেই ‘শাহীরাজ’ এখন বিশাল দেহের অধিকারী। ওজন দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩০০ কেজি। কিন্তু হাট বন্ধ থাকায় বাড়িতে রেখেই যত্ন করতে হচ্ছে। আসন্ন ঈদকে সামনে রেখেই শাহীরাজকে প্রতিপালন করে আসছেন। ঈদে বিক্রি করতে না পারলে ব্যয় বাড়তেই থাকবে। এতে লোকসানের মুখে পড়বেন তিনি।

খামারী আব্দুল খালেক বলেন, বিগত বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা উপজেলার বড়বড় হাটগুলোতে গরু কিনতে আসেন। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাড়িতে নিয়ে গরু দেখিয়ে বেচাকেনা করা হতো। কিন্তু এবারে যদি ব্যবসায়ীরা হাটে না আসেন তাহলে গরু নিয়ে চরম বিপাকে পড়তে হবে তাদের।

তিনি আরো বলেন, এলাকার অনেক বেকার যুবক বিভিন্ন ব্যাংক ও সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে খামার গড়ে তুলেছেন। খামারের গরুগুলো সময়মত বিক্রি করতে না পারলে ঋণের চাপে পথে বসার সম্ভবনা রয়েছে।

উপজেলার নলঘৈর গ্রামের খামারী রফিকুল ইসলাম বলেন, পেশায় তিনি একজন মিষ্টি ব্যবসায়ী ও দরিদ্র মানুষ। ব্যবসার পাশাপাশি ১৫ বছর ধরে গরু লালন-পালন করছেন। গত বছর কয়েকটি গরু বিক্রি করে মোটামুটি টাকা লাভ করেছিলেন। এবারেও ৩ টি ষাঁড় গরু রয়েছে। করোনার কারণে ভালো দাম মিলবে কি-না মনে এ আতঙ্ক কাজ করছে।

মান্দা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. অভিমান্য চন্দ্র বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবারে পশু লালন-পালনের সংখ্যা বেড়েছে। এসব পশু বেচাকেনার জন্য খামারীদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সিলেট, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা এ এলাকার পশু কেনার জন্য খামারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।

তিনি আরো বলেন, অনলাইন পশুরহাট মান্দা নামে একটি প্লাটফর্ম চালু করা হয়েছে। সেখান থেকেও কাঙ্খিত পশু বেচাকেনার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে গরুর দাম ও হাট বন্ধ হওয়া নিয়ে টেনশন বা হতাশ হওয়ার কিছু নেই।

  • 160
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে