তাড়াশে কলেজ মাঠে পশুর হাট, মানা হচ্ছে না নিয়মনীতি

প্রকাশিত: জুন ২১, ২০২১; সময়: ২:১৮ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক, তাড়াশ : সিরাজগঞ্জের তাড়াশে নওগাঁ হাটের গবাদিপশু ও কাঠের তৈরি আসবাবপত্রের হাট বসে নওগাঁ জিন্দানী ডিগ্রি কলেজের মাঠে। আর সেখানকার ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়কেই গুণতে হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত খাজনা ! বৃহত্তম এ প্রসিদ্ধ হাটে স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই।

নওগাঁ জিন্দানী ডিগ্রি কলেজের ছাত্র রমিজুল ইসলাম ও ইব্রাহীম হোসেন বলেন, করোনা সংক্রমণের আশঙ্কায় কলেজ বন্ধ রাখা হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় তরুণ ও কিশোর ছেলেরা প্রতিদিন কলেজ মাঠে খেলাধুলা করেন। সেখানে হাট বসানোয় গোবর, ছাগলের লাদি ও গরু-ছাগলের মূত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। ওসব থেকে উদভট গন্ধ বেরোচ্ছে। শুধু তাই নয়, কলেজ মাঠের ভেতরে অধিক সংখ্যক ছোট ট্রাক ও বড় ভটভটি গাড়ি ঢোকানো হয়। সেসব যানবাহনের চাকায় পিষ্ট হচ্ছে মাঠের সবুজ দুর্বা ঘাস। ফলে মাঠেই তৈরি হচ্ছে খানাখন্দ।

নওগাঁ গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার আব্দুস সামাদ বলেন, নওগাঁ জিন্দানী ডিগ্রি কলেজের মাঠে রয়েছে ৬০০ জন মুক্তিযোদ্ধার তালিকা সংরক্ষিত একটি স্মৃতিস্তম্ভ। হাটের লোকজন সেই স্মৃতিস্তম্ভের সিঁড়িতে বসে থাকছেন। গোবর-মূত্র পায়ে অনেকে ভেতরে ঢুকে স্মৃতিস্তম্ভের বেদীতে ঘোরাফেরা করছেন। এতে স্মৃতিস্তম্ভের পবিত্রতা ও পরিবেশ দুটোই নষ্ট হচ্ছে।

এদিকে উল্লাপাড়া উপজেলার বেলনা গ্রামের আব্দুল ছাত্তার নামে একজন কাঠের তৈরি আসবাবপত্রের ব্যবসায়ী বলেন, একটি ২ হাজার টাকার চৌকি ক্রয় করে ক্রেতাকে ২৫০ টাকা খাজনা দিতে হয়। অনেকেই আছেন, বেশি খাজনা দেওয়ার অপারগতায় মালামাল না কিনে ফিরে যান।

পাবনা জেলার ভাগুড়া উপজেলার হেলেনচা গ্রামের বাবু নামে আরেকজন ব্যবসায়ী বলেন, একটি ৩০০ টাকার কাঠের জানালার ৬০ টাকা খাজনা। ৫০ টাকা দিলেও নিতে চাননা। সেজন্য বেচা-কেনা একেবারে কমে গেছে।

নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার চাচকৈর বাজার এলাকার জাহিদুল ইসলাম নামে একজন বলেন, তিনি নওগাঁ হাটের একটুখানি জায়গাতে ভাতের হোটেল করেন। দিন ৫০ টাকা খাজনা দিয়ে খাবার হোটেলের ব্যবসা শুরু করেন। গত বছর খাজনা দিয়েছেন ৪০০ টাকা। আর এ বছর তার কাছ থেকে খাজনা আদায় করা হচ্ছে ৮০০ টাকা।

একই উপজেলার মোয়াখাড়া গ্রামের আমজাদ ব্যাপারী বলেন, তিনি দুই যুগ কালেরও অধিক সময় ধরে নওগাঁ হাটে গবাদিপশু বেচা-কেনা করেন। কিন্তু কখনো এত বেশি টাকা খাজনা দিতে হয়নি। ১টি গরুতে ৬০০ টাকা খাজনা নিচ্ছেন ইজারাদার। ছাগল প্রতি খাজনা দিতে হচ্ছে ৩০০ টাকা। আবার বিক্রেতাদের কাছ থেকেও খাজনা নেওয়া হচ্ছে। গরু বিক্রি করলে ১০০ টাকা ও ছাগল বিক্রি করলে ৫০ টাকা দিতে হচ্ছে। অনুরুপ অভিযোগ করেন ব্যাপারী আব্দুস ছাত্তার, শাহেদ আলী, আলতাব হোসেনসহ বেশ কয়েকজন ব্যাপারী। তারা আরো বলেন, এভাবে মাত্রাতিরিক্ত খাজনা আদায় করা হলে নওগাঁ হাট ছেড়ে অন্য হাট বেছে নেবেন।

সরেজমিনে গত বৃহস্পতিবার (১৭ জুন) হাটের দিন দেখা গেছে, নওগাঁ জিন্দানী ডিগ্রি কলেজ মাঠের মধ্যে গরু-ছাগল বেচা-কেনা হচ্ছে। মাঠের পূর্ব-দক্ষিণ কোণায় বসেছে কাঠের তৈরি বাসবাবপত্রের হাট। উত্তর-পশ্চিম কোণে মাছ ধরার চাইসহ বিভিন্ন উপকরণ বেচা-কেনা হচ্ছে। আর মাঠের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের সেই স্মৃতিস্তম্ভের সাথে বসেছে গানের মজমা। সেখানে গান গেয়ে লোক জরো করে এক কবিরাজ ওষুধ বিক্রি করছেন। এ হাটে অসংখ্য মানুষের সমাগম হয়েছে। কিন্তু বলতে গেলে ‘কারো মুখেই মাস্ক নেই।’ সবাই গাদাগাদি করে হাট করছেন।

তখন চোখে পড়ে, ইজারাদারের লোকজন হাটের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে টেবিল বসিয়ে খাজনা আদায় করছেন। তারা খাজনা আদায়ের রশিদে টাকার অংক ফাঁকা রেখে শুধুমাত্র ক্রেতা-বিক্রেতার নাম, ঠিকানা ও মোট মূল্য লিখে দিচ্ছেন। কিন্তু খাজনা আদায়ের তালিকা হাটের কোথাও নেই।

নওগাঁ জিন্দানী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) আবুল কাশেম বলেন, তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কলেজ মাঠে হাট বসানো হচ্ছে। তাছাড়া এহেন কান্ড আগে থেকেই ঘটে চলেছে। পরিস্থিতির কাছে তিনি নিরুপায়।

নওগাঁ জিন্দানী ডিগ্রি কলেজের সভাপতি ও নওগাঁ হাট কমিটির সভাপতি এ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম বলেন, হাটে স্থান সংকুলান। তাই কলেজ মাঠে হাট বসানো হয়।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফকির জাকির বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত মোতাবেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে কোনো ধরনের গরুর হাট বসা নিষেধ।

আবার তিনি এও বলেন, এ বিষয়ে তার কিছুই করার নেই। ইউএনও’র সাথে কথা বললে সব ঠিক হয়ে যাবে।

নওগাঁ হাটের ইজারাদার আকবার আলী বলেন, অনেক বেশি পরিমাণে টাকা মূল্য দিয়ে হাট ইজারা নিয়েছেন। তাকে প্রতি হাটে ৭ লাখ করে টাকা খাজনা আদায় করতেই হবে। নয়তো নিশ্চিত লোকসান গুণতে হবে। যে কারণে খাজনা আদায়ের ক্ষেত্রে কিছুটা অনিয়ম করতে হচ্ছে। তাতে কিছুই করার নেই।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মেজবাউল করিম বলেন, নওগাঁ হাটের প্রান্ত জায়গার বাইরের যে সব দোকানীদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করা হচ্ছিলো, তাদের লিখিত অভিযোগ পেয়ে তা বন্ধ করা হয়েছে। এ হাটের অন্যান্য অনিয়ম ক্ষতিয়ে দেখে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

এ প্রসঙ্গে সিরাজগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোঃ মোবারক হোসেন বলেছেন, সরকার নির্ধারিত হারেই ইজারাদারকে খাজনা আদায় করতে হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে