স্ত্রী-পুত্রসহ পুলিশের এএসআইয়ের তিন হত্যার কারণ পরকীয়া!

প্রকাশিত: জুন ১৩, ২০২১; সময়: ৯:৩২ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক, কুষ্টিয়া : পরকীয়ার জেরে কুষ্টিয়ায় দ্বিতীয় স্ত্রী ও তার পুত্রসহ তিনজনকে গুলি করে হত্যা করেছে পুলিশের এক সহকারি পরিদর্শক (এএসআই)।

নিহতরা হলেন, আসমা খাতুন (২৬), তার ছেলে রবিন (৮) ও আসমার কথিত প্রেমিক শাকিল হোসেন (২২)। ঘাতক পুলিশের এএসআইয়ের নাম সৌমেন রায়। তাকে আটক করেছে পুলিশ। তিনি খুলনার ফুলতলা থানায় কর্মরত। তার বাড়ি মাগুরা জেলায় বলে জানা গেছে।

আসমা ও শাকিলের বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানায়। এর মধ্যে আসমার বাড়ি বাগুলাট ইউনিয়নের নাতুড়িয়া গ্রামে। তার বাবার নাম আমির আলী। আর শাকিল পাশের চাপড়া ইউনিয়নের সাওতা গ্রামের মেজবাউর রহমানের ছেলে। তিনি অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী বলে পরিবার জানিয়েছে। পাশাপাশি বিকাশে চাকুরি করতেন।

প্রত্যক্ষদর্শিরা জানান, বেলা ১১টার দিকে শাকিল, আসমা ও তার পুত্র রবিনকে সাথে নিয়ে কুষ্টিয়া শহরের কাস্টমস মোড়ে একটি বিকাশের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। এ সময় সেখানে সৌমেন রায় আসেন। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে পুলিশের এএসআই সৌমেন নিজের কাছে থাকা সরকারি পিস্তল বের করে শিশু রবিনকে পেছন থেকে গুলি করেন। রবিন মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর আরও কয়েক রাউন্ড গুলি হয়।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই অন্য দুইজনকে খুব কাছ থেকে গুলি করেন। এরপর স্থানীয় ব্যবসায়ীরা একজোট হয়ে সৌমেনকে লক্ষ্য করে ইট পাটকেল ছুড়তে থাকেন। এ সময় তিনি এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে থাকেন। এ সময় পুলিশ এসে তাকে ধরে একটি বাড়িতে আটকে রাখে। ক্ষুব্ধ জনতা এ সময় তাকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। পুলিশের অতিরিক্ত সদস্য এসে খুনিকে কড়া পাহারায় নিয়ে যায় ঘটনাস্থল থেকে।

ঘটনার সময় প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় এক মুদি দোকানী জানান, ‘১১টার দিকে হঠাৎ গুলির শব্ধ শুনতে পাই। এ সময় এক বাচ্চাকে একজন গুলি করছে দেখতে পাই। গুলি করার পর শিশুটি মাটিতে পড়ে যায়। এরপর আমরা হৈচৈ শুরু করলে সে আবার গুলি ছুঁড়তে শুরু করে।’

মার্কেটের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, একজনই তার হাতে থাকা অস্ত্র দিয়ে গুলি করছিলো। তিনজনকে গুলি করে সে। এরপর আমরা চারিদিক থেকে তাকে ঘিরে ধরি। পরে পুলিশ এসে তাকে নিয়ে যায়। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, মার্কেটের সামনে প্রচুর রক্ত পড়ে আছে। শিশুটিকে সেখানে গুলি করে খুনি।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ঘটনার পরপরই আমরা এখানে আসি। তিনজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। আর খুনিকে আমরা আটক করেছি। এ বিষয়ে তদন্ত করে পরে বিস্তারিত জানানো হবে। ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা হবে। তবে প্রাথমিক হত্যা কারণ তিনি জানাতে পারেননি।

নিহত শাকিলের বাড়ি সাঁওতা গিয়ে কথা হয় তার ভাবী লতা ও মা নুরজাহান খাতুনের সাথে। তারা জানান, ‘আসমার সাথে শাকিলের চেনাজানা ছিলো। তাদের ভাইবোনের সম্পর্ক ছিলো। এর বাইরে কোন গোপন সম্পর্ক তাদের মধ্যে ছিল বলে আমরা জানি না।

তারা বলেন, দেড় মাস আগে সৌমেন আমাদের বাড়িতে আসেন। আসার পর সে জানায়, তার স্ত্রী আসমার সাথে শাকিলের গোপন সম্পর্ক রয়েছে। সে যেন তার সাথে মেলামেশা না করে। এরপর সে চলে যায়।

পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, ২০০৪ সালে পুলিশে কনস্টেবল পদে চাকুরি পান সৌমেন। তার বাড়ি মাগুরা সদর উপজেলার বরইচারা গ্রামে। ২০০৫ সালে আঁখি রায় নামে এক নারীকে বিয়ে করেন। সেই ঘরে তার এক মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। তাদের একজন সৌমিত্র রায় ও মেয়ে শুক্লা রায়। তারা খুলনায় বসবাস করেন।

২০১৭ সালে সৌমেন রায়ের কুষ্টিয়ায় পোস্টিং হয়। এরপর তিনি উপ-সহকারি পরিদর্শক (এএসআই) পদে পদোন্নতি লাভ করেন। এর মধ্যে আসমার সাথে তার পরিচয়। একই সময়ে সে মিরপুর, ইবি, কুমারখালী থানাসহ বেশ কয়েকটি ক্যাম্পে চাকুরি করেছেন।

সৌমেনের সাথে বিয়ের আগে আসমার আগে আরও দুটি বিয়ে হয়। প্রথম ঘরে এক মেয়ে ও দ্বিতীয় ঘরে রবিনের জন্ম হয়। সর্বশেষ সৌমেনের সাথে তার সংসার চলছিলো। আসমার গ্রামের বাড়ি বাগুলাট ইউনিয়নের নাতুড়িয়া গিয়ে কথা বললে প্রতিবেশিরা জানান, এলাকায় তারা থাকেন না। পরিবারসহ কুষ্টিয়ায় বাবর আলী গেটে ভাড়া থাকেন। এর মধ্যে সৌমেন তাকে মসুলমান থেকে হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত করেন। সে আসমা থেকে আঁখি বনে যায়।

পুলিশের ওই সূত্র জানায়, এরপর আখিকে সে শহরে বাসা ভাড়া করে দেয়। মাঝে মধ্যে সে এসে তাদের সাথে থাকতো। এরই মাঝে আসমা ওরফে আঁখির সাথে বেশ কয়েকজন যুবকের সাথে সম্পর্ক হয়। বিষয়টি জানতে পারেন সৌমেন। তিনি কললিস্টসহ বিভিন্ন প্রমাণ সংগ্রহ করেন। সর্বশেষ শাকিলের সাথে তার সম্পর্ক চলছিলো বলে সৌমেন নিশ্চিত হন।

গত শনিবার সৌমেন আঁখিকে ফোন দেন। তাকে রেডি থাকতে বলেন, খুলনায় তাকে নিয়ে আসবেন। রোববার সকালে সৌমেন ওয়ারেন্ট তামিলের কথা বলে সরকারি অস্ত্র ও গুলি নিয়ে কুষ্টিয়ায় চলে আসেন। তার কাছে ১২ রাউন্ড গুলি ছিলো বলে জানা গেছে।

বাসা থেকে আসমাকে সাথে নিয়ে রিকশায় করে সে রওনা হয়। শহরের কুমকুম ফার্মেসির সামনে এ নিয়ে দুইজনের মধ্যে ঝামেলা হয়। তখন সৌমেন তাকে বলেন শাকিল যদি অনুমতি দেয় তাহলে তুমি যাবা কি-না। তখন সৌমেনের মোবাইল থেকে শাকিলকে ফোন দিলে সে জানায় কাস্টমস মোড়ে একটি বিকাশের দোকানে সে রয়েছে। ওখানে যেতে বলেন তাদের। পরে সেখানে যান সৌমেন, আসমা ওরফে আঁখি ও রবিন।

এ সময় সেখানে একটি হোটেলের মধ্যে বসে তারা কথা বলছিলেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। শাকিল বলেন, আপনার স্ত্রীকে আপনি নিবেন না রেখে যাবেন তা আপনার ব্যাপার। আমার সাথে তার কোন যোগযোগ ও কথা হয় না। তখন সৌমেন কললিস্টসহ নানা প্রমাণ দেখান।

এক পর্যায়ে হোটেলের মালিক তাদের অন্যখানে গিয়ে কথা বলতে বলেন। তারা হোটেল থেকে উঠে গিয়ে পাশেই মসজিদের সাথে লাগোয়া একটি ভবনের গলিতে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। এক পর্যায়ে সৌমেন অস্ত্র বের করে তার নিজের মাথায় ঠেকিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরপর দুইবার ফায়ার করলেও মিস ফায়ার হয়।

এ সময় সে ফাঁকা ফায়ার দেয়। এ সময় গুলি হয়। শব্দ শুনে শিশু রবিন বাইরে দৌঁড় দিলে তাকে পেছন থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর শাকিল ও আসমাকে কাছ থেকে গুলি করে। তিনজনকে মারতে সে ১১ রাউন্ড গুলি খরচ করে বলে ওই সূত্র জানায়।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, একটি গুলি ও পিস্তুল পাওয়া গেছে। তার থানায় সব বিষয়ে জানানো হয়েছে। বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। সব দিক বিবেচনা করে তদন্ত শুরু হয়েছে। কাউকে হত্যা করার উদ্দেশ্য তার ছিল না। স্ত্রীর তার সাথে চলে গেলে হয়তো এ ঘটনা ঘটতো না। প্রাথমিকভাবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সে বেশ কিছু তথ্য দিয়েছে। পুলিশ সেগুলো যাচাই বাছাই করে দেখছে।

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার খাইরুল ইসলাম বলেন, অস্ত্র ও গুলিসহ সৌমেনকে আটক করা হয়েছে। এ বিষয়ে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।’

এদিকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার তাপস কুমার সরকার বলেন, নিহতের কয়েকজেনর মাথাসহ শরীরের অন্য স্থানে গুলি করা হয়েছে। খুব কাছ থেকে গুলি চালানো হয়। হাসপাতালের মর্গে সবার মরদেহ রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।

  • 386
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে