গ্রামে আলোর দ্যুতি ছড়াচ্ছে মজিবুর রহমান স্মৃতি গ্রন্থাগার

প্রকাশিত: জুন ৭, ২০২১; সময়: ৯:০৬ pm |

মো. আবু মুছা স্বপন, ধামইরহাট : আধুনিক যুগে ডিজিটাল মোটিভেশনে মোবাইল, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, আর ইন্টারনেটর দাপটে যুব সমাজের মন-প্রাণ প্রযুক্তি নির্ভর ডিভাইসের দিকে আসক্ত হয়ে পড়েছে। ঠিক সেই সময় যুবসমাজকে জ্ঞানার্জনের জন্য বইমুখী করতে নওগাঁর ধামইরহাটে দৃষ্টিনন্দন লাইব্রেরি গড়ে তুলে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন আলমগীর কবির।

আলমগীর কবির পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ‘গ্রীন ভয়েস বাংলাদেশ’ এর প্রতিষ্ঠাতা। জন্মস্থান নওগাঁ জেলার ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা ধামইরহাট উপজেলার আগ্রাদিগুন গ্রামে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই গ্রন্থাগার গড়ে তুলেছেন। তাকে আগ্রাদিগুন গ্রামের স্বপ্নমানব বলা হয়।

বিলুপ্ত সামাজিক বিচার ব্যবস্থায় যুব সমাজ এখন ধ্বংসের দিকে। ডিজিটাল যুগে পড়ালেখার অজুহাতে কেউ ছুটছে ডিভাইসের দিকে, কেউ ছুটছে মাদকের দিকে। আর অনেকেই দু’পথেই পা বাড়িয়ে নষ্ট করছে জীবন। লাইব্রেরীতে বসে পড়ার চর্চা একযুগ থেকে স্তিমিত হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় ক্ষতিকর আসক্তি থেকে ফেরাতে যুব সমাজের জন্য ও শিক্ষানুরাগীদের জন্য প্রতিষ্ঠিত এই লাইব্রেরী ইতিমধ্যেই সাড়া ফেলেছে প্রত্যন্ত ওই এলাকায়।

পিতার স্মৃতি ধরে রাখতে আলমগীর হোসেন ও তার ভাইবোন বাবার নামানুসারে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ‘মজিবুর রহমান স্মৃতি গ্রন্থাগার’। নিয়মিত পাঠক সৃষ্টি করতে ইতোমধ্যেই পার্শ্ববর্তী ৪২টি গ্রাম থেকে ১১০ জন পাঠক নিয়ে ১০টি গ্রুপ করা হয়েছে। যারা নিয়মিত গ্রন্থাগারে আসবেন এবং ১০টি গ্রুপ কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে অন্যদের বই পাঠে আগ্রহী করবেন। পাশাপাশি কবি-সাহিত্যিক রাজনৈতিক ব্যক্তিদের জন্ম ও মৃত্যুদিবস পালন ও তাদের জীবন আলেখ্য চর্চা করবেন।

গ্রন্থাগারের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আলমগীর কবির জানান, করোনার চাপ সহনীয় মাত্রায় আসলে শিক্ষনীয় বিভিন্ন সিনেমা ও ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হবে। উপজেলার ২৬টি হাইস্কুল থেকে মাসে ১দিন করে নির্দিষ্ট সংখ্যক শিক্ষার্থীকে শিক্ষনীয় ডকুমেন্টরি প্রদর্শন, বইপড়া, ছড়া-কবিতা, বিতর্ক, গান পরিবেশ সুরক্ষা গ্রন্থাগারের গুরুত্ব ইত্যাদি বিষয়ে বিনোদনের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হবে। দিনশেষে মূল্যায়নের মাধ্যমে ভাল ফলাফলকারিদেরকে পুরস্কৃত করা হবে।

তিনি আরও জানান, শিক্ষার্থীদের বইমুখী করতে এ সকল কাজ করা হবে গ্রন্থাগারের খরচে। গ্রন্থাগারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাঝে সামাজিক সম্প্রীতি ও বন্ধন সৃষ্টি সহজতর হয়। কারণ আজকের ছাত্র আগামী দিনে জাতির কান্ডারী। ইতোমধ্যেই গত কয়েক বছর যাবত উপজেলার ২৬টি হাইস্কুল, ১৬টি প্রাথমিক ও ৩টি মাদ্রাসার ট্যালেন্টপুলে ফলাফলকারিদের ‘মজিবুর রহমান ফাউন্ডেশন’র মাধ্যমে নিয়মিত শিক্ষাবৃত্তি প্রদান অব্যাহত রয়েছে।

মজিবুর রহমান গ্রন্থাগারের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম মজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র আলমগীর কবির কয়েকটি সামাজিক সেবামূলক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর যুগ্ম-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন বয়স ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ গ্রন্থাগারে আকৃষ্ট হয়ে পাঠে সময় ব্যয় করছেন।

চকময়রাম সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খেলাল-ই-রব্বানী গ্রন্থাগার বিষয়ে বলেন, ‘গ্রন্থাগার সৃষ্টি নিঃসন্দেহে মহৎ উদ্যোগ। গ্রন্থাগার মনুষ্যত্ব সৃষ্টির অন্যতম মাধ্যম। আর মনুষ্যত্বের মাধ্যমেই মানুষ পূর্ণতা পায়।’

আগ্রাদ্বিগুন ইউনিয়নের প্রবীন গুণিজন ও সাপাহার উপজেলার চৌধুরী চান মোহাম্মদ মহিলা ডিগ্রী কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ মো. আব্দুল জলিল বলেন, ‘মজিবুর রহমান গ্রন্থাগার’ তার নিজস্ব স্বকীয়তায় জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে মাদকমুক্ত, প্রতিহিংসামুক্ত, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে বিচক্ষণ জ্ঞানদিপ্ত সমাজ গঠনে অবদান রাখবে। পরবর্তী প্রজন্মের কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও তাদের দেখে লাইব্রেরীমুখী হবে বলে আমি মনে করি।

ধামইরহাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার গনপতি রায় বলেন, একজন স্বপ্নমানব আলমগীর কবির। যিনি তার স্বপ্নকে বাস্তবে রুপ দিয়েছেন। তৈরী করছেন আলোকিত মানুষ গড়ার মন্দির ‘মজিবুর রহমান স্মৃতি পাঠাগার’। এই গ্রন্থাগার প্রত্যন্ত অঞ্চলে যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে, তা ইউনিয়ন পর্যায় পেরিয়ে ভবিষ্যতে পুরো ধামইরহাট উপজেলায় মানবিক মানুষ তৈরীতে অনন্তকাল ভূমিকা রাখবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে