নওগাঁয় জমজমাট অনলাইন আমবাজার

প্রকাশিত: মে ৩০, ২০২১; সময়: ৯:৪০ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক, নওগাঁ : দেশে আম উৎপাদনে শীর্ষ জেলা নওগাঁয় এখন পুরোদমে আম বেচাকেনা শুরু হয়েছে। শুধু হাটে-বাজারেই নয়, আমের ব্যবসার জন্য অনলাইন ও ফেসবুকের ব্যবহার দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। গত বছর দেশে করোনা মহামারি ছড়িয়ে পড়ার পর অনলাইনে আম ব্যবসা নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন বেশ কিছু উদ্যোক্তা। এবার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন আরও একঝাঁক তরুণ। এদের অধিকাংশই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

নওগাঁর কিছু তরুণ উদ্যোক্তা গত বছর প্রথম অনলাইনে বাগান থেকে পাড়া আম অনলাইনের মাধ্যমে বাজারজাত করেছেন। এর ফলে নওগাঁর আমের যেমন সুনাম বজায় থাকছে, তেমনি ক্রেতারাও বাড়িতে বসে নওগাঁর বাগানের সুস্বাদু আমের স্বাদ গ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন। গত বছর ভালো সাড়া পাওয়ায় এবার মৌসুম শুরুর আগে থেকেই নওগাঁর আমের গুনগান লিখে অনলাইনে প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছেন তরুণ উদ্যোক্তারা। ইতোমধ্যে হাটে-বাজারের পাশাপাশি অনাইনে পুরোদমে শুরু হয়েছে আম কেনা-বেচা।

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, এ মৌসুমে নওগাঁ জেলায় ২৫ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন। এ বছর প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার আম-বাণিজ্যের প্রত্যাশা করছে স্থানীয় প্রশাসন। অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে গত বছর প্রায় ২০ কোটি টাকার আমের ব্যবসা করেছেন শতাধিক তরুণ উদ্যোক্তা। এবার আরও একঝাঁক নতুন উদ্যোক্তা অনলাইন আম ব্যবসায় নেমেছেন। অনলাইন মাধ্যমেই এবার প্রায় ৫০ কোটি টাকার আম ব্যবসা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

‘নওগাঁর সুস্বাদু আম’ নামের একটি ফেসবুক পেজ খুলে এবং মোবাইলের মাধ্যমে আমের ব্যবসার প্রসার ঘটিয়েছেন জেলার পোরশা উপজেলার কয়েকজন তরুণ আম ব্যবসায়ী। এদের একজন ফয়সাল আহমেদ জানান, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভুগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগে চতুর্থ বর্ষে পড়াশোনা করছেন। গত বছর করোনা মহামারি শুরুর পর তিনি বাড়িতে চলে আসেন। বাড়িতে অলস বসে না থেকে কয়েকজন বন্ধু মিলে ফেসবুক পেজ খুলে আম ব্যবসা শুরু করেন। গত বছর প্রায় দুই মাস প্রতি দিন পাঁচ থেকে ছয় মণ করে আম অনলাইনের মাধ্যমে বিক্রি করেছেন। অনলাইনে আম ক্রেতাদের আগ্রহ ছিল খুবই ভালো। গত বছর ১০ লাখ টাকার ওপরে আম বিক্রি করেছেন তাঁরা। এবার অনলাইনে আরও বেশি আম বিক্রি হবে বলে আশা করছেন তাঁরা।

এবারই প্রথম অনলাইনে আম ব্যবসা শুরু করেছেন এমন কয়েকজন নতুন উদ্যেক্তা জানান, নতুন ব্যবসা হলেও ভালো সাড়া পাচ্ছেন তাঁরা। ইতোমধ্যে অনলাইনে মার্কেট প্লেস ও ফেসবুক পেজ দেখে আম নেওয়ার জন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে ক্রেতাদের ফোন পাচ্ছেন। ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্ডার পেয়ে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে আম কিনে কুরিয়ারের মাধ্যমে আম পাঠাচ্ছেন তাঁরা। তবে কুরিয়ার খরচ কম হলে তাঁদের সুবিধা হতো বলে মতপ্রকাশ করেন তাঁরা।

কয়েকজন বন্ধু মিলে এবারই প্রথম আম ব্যবসা শুরু করেছেন নওগাঁর সাপাহার উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা কাজী রাহাত। অনলাইন মাধ্যমে আম ব্যবসার পাশাপাশি নওগাঁ শহরের মুক্তির মোড়ে দোকান খুলে বসেছেন তাঁরা। কাজী রাহাত জানান, একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি বাড়িতেই বসে ছিলেন। গত বছর অন্যদের অনলাইনে আম ব্যবসার সাফল্য দেখে তাঁরা কয়েকজন বন্ধু মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আম ব্যবসার করার। ফেসবুকে ‘নওগাঁর আম বাজার’ নামে একটি ফেসবুক খুলে গত ১৫ দিন ধরে তাঁরা প্রচারণা চালাচ্ছেন। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জায়গা থেকে আমের অর্ডার পাচ্ছেন। ইতোমধ্যে অনলাইন মাধ্যম কিংবা মোবাইলে অর্ডার পেয়ে গোপালভোগ ও লক্ষণভোগ জাতের ২০-২২ মণ আম বিক্রি করেছেন তাঁরা। পরিবহন খরচ ও ক্যারেটের দামসহ প্রতি মণ গোপালভোগ ও লক্ষণভোগ আম ২,৮০০ থেকে ২,৯০০ টাকায় বিক্রি করছেন তাঁরা।

আরেক তরুণ উদ্যোক্তা জামিল আহমেদ বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি গত বছর থেকে তিনি অনলাইনের মাধ্যমে আমের ব্যবসা করেছেন। ক্রেতাদের ভালো সাড়া পেয়েছেন। গত বছর আম্পান ঝড়ের কারণে আমের দাগ ও পোঁকার কারণে আম বিক্রি করতে একটু সমস্যা হয়েছিল। কারণ অনলাইনে ক্রেতার বিশ্বাস বড় পুঁজি। তিনি সেই বিশ্বাস ধরে রাখছেন।

জেলা প্রশাসনের বেধে দেওয়া সময় অনুযায়ী, নওগাঁয় গুটি জাতের আম গত ২০ মে থেকে সংগ্রহ শুরু হয়েছে। ২৭ মে থেকে গোপালভোগ, রাণীপছন্দ ও লক্ষণভোগ জাতের আম আম পাড়া শুরু হয়। এছাড়া ২ জুন থেকে হিমাসাগর/ক্ষীরসাপাত, ৪ থেকে নাগ ফজলী, ল্যাংড়া ১০ জুন, ফজলি ২০ জুন, আমরুপালি ২২ জুন, ফজলী ও আশ্বিনা আম ৮ জুলাই থেকে সংগ্রহ শুরু হবে।

এ বিষয়ে নওগাঁর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামছুল ওয়াদুদ বলেন, ‘যাঁরা অনলাইনে আমের ব্যবসা করেছে তারা অধিকাংশই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কিংবা বেকার তরুণ ও যুবক। বাড়িতে বসে না থেকে অনলাইন প্লাটফর্ম ব্যবহার করে আয়-রোজগার করছেন এমন তরুণদের আমরা সাধুবাদ জানাই। যতই দিন যাচ্ছে ততই অনলাইন প্লাটফর্মে বেচা-কেনার প্রবণতা বাড়ছে। গত বছর কিছু তরুণ অনলাইনে সুনামের সাথে ব্যবসা করে ভালো উপার্জন করেছেন। তাঁরা তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা আমাদের জানিয়েছেন। আবার উদ্যোক্তাদের একটা বড় অংশ এবার প্রথম অনলাইন মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করেছেন। গত বছর নওগাঁয় অনলাইন মাধ্যমে প্রায় ২০ কোটি টাকার আম ব্যবসা হয়েছে। এবার তা ৫০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা করছি। অনেক তরুণ উদ্যোক্তা পরিবহনের খরচটা কমানো যায় কিনা সে বিষয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। আমরা কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে পরিবহন খরচ কমানোর বিষয়ে কথা বলব।

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে