সিরাজগঞ্জ প্লাটফর্মে আশ্রয় নেয়া প্রতিবন্ধী নুরজাহানের ঘরের আকুতি

প্রকাশিত: মার্চ ১৬, ২০২১; সময়: ২:৫৩ pm |

স্বপন মির্জা, সিরাজগঞ্জ : দেশ প্রতিনিয়ত সামগ্রিক অগ্রগতীতে এগিয়ে যাচ্ছে। গড়ে উঠছে নতুন নতুন বসতি আর দালান কোটা। আর ওই সব ভবনে যাদের বসবাস তারা সবাই স্বচ্ছল মানুষ। কিন্তু এই স্বচ্ছল মানুষের ভিড়েও রয়েছে অস্বচ্ছল অসহায় মানুষ। যাদের বেশির ভাগের ঠিকানা বস্তি, ফুটপাত, বাসস্ট্যান্ড ও রেলওয়ে স্টেশনসহ বিভিন্ন স্থান।

এমনই একটি অস্বচ্ছল প্রতিবন্ধী পরিবারের স্থান মিলেছে সিরাজগঞ্জ বাজার স্টেশনের প্লাটফর্মে। শুধু একটু মাথা গোজার ঠাইয়ের জন্য প্রতিবন্ধী নুরজাহান বেগম স্বামী ও মেয়েকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন এই প্লাটফর্মে। প্লাটফর্মের উপরে ছাউনি এবং এক পাশে দেয়াল থাকলেও তিন দিক খোলা। এতে কঁনকঁনে শীতের মধ্যে কাতর হয়ে পড়ে তারা। তবে গরমের দিনে খোলা বাঁতাসে শরীর একটু শীতল হলেও ঝড়-বৃষ্টির সময় ভিজে একাকার হয়ে যায় তাদের জীবন সংসার।

এসময় দৌড়ে নিরাপদ কোন স্থানে গিয়ে যে তারা আশ্রয় নেবে তাও তাদের দ্বারা সম্ভব পর হয় না। কারণ নুরজাহান বেগম এক’পা হারা প্রতিবন্ধী। যিনি হুইল চেয়ারে বসে ও কোন কোন সময় দু’হাত মাটিতে ভর করে ঘোষ পেরে চলাচল করেন। তিনি রোগাক্রান্ত শারীরিক প্রতিবন্ধী স্বামী এবং বুদ্ধি প্রতিবন্ধী মেয়ে নিয়ে বাস করেন এই প্লাটফর্মে। বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ওই মেয়েই তার চলাচলের একমাত্র অবলম্বন।

বৃষ্টির মাঝে তারা যে দৌড়ে গিয়ে কোথাও আশ্রয় নেবেন সে সক্ষমতাও নেই তাদের। ফলে ঝড় আর বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়ে পড়তে হয় তাদের। এমনকি তাদের আরাম আয়েশের জন্য এককোণে রাখা শুকনো বিছানাপত্র এবং কাপড়-চোপরও বৃষ্টিতে ভিজে যায়। এছাড়া সার্বক্ষণিক ধুলোবালি তো আছেই। ঝড়-বৃষ্টি, মোশা-মাছি আর ধুলোবালি যেন তাদের জীবনের সাথে মিশে একাকার। শত দুঃখ-কষ্টের মাঝেও তারা মনে করেন এটাই তাদের সুখের ঠিকানা। যে ঠিকানায় চলছে তাদের বসবাস এবং রান্না ও খাওয়া আর পাশের নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত পুকুরের পানিতে গোসল। প্রকৃতির ডাকে সারা মিলছে খোলা আকাশের নিচে রেললাইনের পাশে। কি-মানবেতর জীবন-যাপন।

এক’পা হারা প্রতিবন্ধী নুরজাহান বেগম এর সাথে কথা বলে জানা যায়,তার বাবা-মা মারা যাবার পর যখন তিনি অভিভাবকহীন হয়ে পড়েন তখন তিনি নিরুপায় হয়ে ১৯৯৩ সালে রাজশাহী থেকে সিরাজগঞ্জ পৌরসভার মিরপুর এলাকার শ্রমিকনেতা শফির বাড়ীতে এসে আশ্রয় নেন এবং তাকে বাবা হিসেবে সম্বোধন করেন। তবে সেখানে তিনি তাদের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না হয়ে জীবিকা নির্বাহের তাগিদে পত্রিকা বিক্রি শুরু করেন। একজন নারী হয়ে তিনি জীবনের সাথে যুদ্ধ করে প্রতিদিন কাকডাকা ভোরে কড্ডার মোড়ে গিয়ে পত্রিকা এনে পাঠকদের হাতে তুলে দিয়ে গ্রহণযোগ্যতা কুড়িয়ে নেন।

এদিকে পত্রিকা আনা নেওয়া করতে গিয়ে তার সাথে পরিচয় হয় আরেক পত্রিকা বিক্রেতা শহরের ফরিয়াপট্রি এলাকার ফারুক হোসেনের সাথে। পরিচয়ের সেই সুত্রে ১৯৯৭ সালে তারা পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। ভালোই কাটছিল তাদের দাম্পত্য জীবন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ১৯৯৮ সালের জুন মাসের কোন একদিন ভোরে কড্ডার মোড়ে পত্রিকা আনতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে নুরজাহান বেগমের একটি পা হারিয়ে যায়। দীর্ঘ এক বছর সিরাজগঞ্জ সদর হাসপালে চিকিৎসা গ্রহন করে নুরজাহান বেগম সুস্থ হয়ে উঠলেও আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয় তাকে।

কথার একপর্যায়ে প্রতিবন্ধী নুরজাহান বেগম আক্ষেপ করে বলেন,এতো কষ্ট আর সহ্য হয়না এবং বেঁচে থাকারও আর ইচ্ছে জাগে না। কি করবো কপাল মন্দ স্বামীর ঘর নেই-বাড়ী নেই,বসবাসের জন্য কোন জায়গা নেই,তাই একটু মাথা গোজার ঠাইয়ের জন্য বুদ্ধি প্রতিবন্ধী মেয়ে ও রোগাক্রান্ত শারীরিক প্রতিবন্ধী স্বামীকে নিয়ে শান্তির ঠিকানা হিসেবে প্লাটফর্মই বেছে নিয়েছি।

অন্তরে কষ্ট লুকিয়ে রেখে প্রতিবন্ধী নুরজাহান বেগম বলেন, এখানে অনেক শান্তি। নুরজাহান বেগম ও তার স্বামী ফারুক হোসেনের আকুতি তাদের স্থায়ী বসবাসের জন্য সরকার বা সমাজের বিত্তশালী দানশীল ব্যক্তিরা যদি একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দিতেন তাহলে একদিকে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পেতাম আরেকদিকে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী মেয়ে শিল্পীকে বিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু পোড়া কপাল আমাদের দিকে কেউ তাকায় না।

সিরাজগঞ্জ স্টেশনের প্লাটফর্মে গেলেই দেখতে পাওয়া যায় এই অসহায় মানুষগুলোকে। তারা প্রকৃতির সব বাধা উপেক্ষা করে পলিথিন আর চট বিছিয়ে শুয়ে আছেন প্লাটফর্মের দক্ষিন-পশ্চিম কোণে। ঝড়-বৃষ্টি, রোদ, ধুলোবালি মোশা-মাছি সবকিছুর সাথেই যেন তাদের মিলটা অনেক বেশি। তাইতো এসবের মাঝেও প্লাটফর্মই তাদের একমাত্র ভরসা।

তবে শত দুঃখ কষ্টের পরও আমৃত্যু শান্তির ঠিকানা মনে করে তারা নিভীর ভাবে জড়িয়ে আছেন এই প্লাটফর্মে। জীবিকার তাগিদে রাত পোহালেই নরজাহান বেগম তার বুদ্ধি প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়েন শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে মানুষের দ্বারে-দ্বারে সাহায্য- সহযোগিতার জন্যে।

মানুষের সাহায্য সহযোগিতাই তাদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন। বেঁচে থাকার তাগিদে শত কষ্টকে সঙ্গী করে স্বামী ও মেয়েকে নিয়ে এভাবেই জীবনধারণ করে চলছেন অসহায় প্রতিবন্ধী নুরজাহান বেগম। তার দাবী কোন স্বহৃদয়বান ব্যক্তি যদি এগিয়ে এসে তাদের পাশে দাঁড়াতেন এবং একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দিতেন তাহলে তাদের একটু মাথাগোজার ঠাই মিলতো।

  • 19
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে