অযত্নে-অবহেলায় নাটোরের উত্তরা গণভবনের স্থাপত্যশৈলীর কারুকার্য

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৩০, ২০২০; সময়: ১২:৪২ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক : স্থায়ীত্ব নষ্ট হওয়ার কারণে খসে পড়ছে নাটোরের উত্তরা গণভবনের স্থাপত্যশৈলীর সব কারুকার্য। এতে করে নষ্ট হচ্ছে উত্তরা গণভবন তথা দিঘাপতিয়া রাজবাড়ির সৌন্দর্য ও নান্দনিকতা। মোগল ও প্রাশ্চাত্যরীতির মিশ্রণে তৈরি ইতিহাস ঐতিহ্যবহন করা উত্তরা গণভবনের কারুকার্য রক্ষার জন্য বিশেষজ্ঞদের মতামত চেয়ে চিঠি দিয়েছে নাটোর গণপূর্ত বিভাগ।

তবে কারুকার্য নিয়ে কাজ করা অভিজ্ঞ ব্যক্তি এবং নাটোরবাসীর দাবী অতিদ্রুত উত্তরা গণভবনের কারুকার্য রক্ষা করা না গেলে ইতিহাস হারিয়ে সংকটে পড়বে উত্তরা গণভবন। জানা যায়, ১৭৩৪ সালে দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি তথা উত্তরা গণভবন প্রাসাদের মূল অংশ ও কিছু ভবন নির্মাণ করেন রাজা দয়ারাম রায়। ১৮৯৭ সালের ১২ জুন এক ভূমিকম্পে রাজপ্রাসাদটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীতে রাজা প্রমোদনাথ রায় দীর্ঘ ১১ বছর ধরে বিদেশি বিশেষজ্ঞ আর দেশি মিস্ত্রিদের সহায়তায় মোগল ও প্রাশ্চাত্যরীতির মিশ্রণে মোট ১২টি ভবন নির্মাণ করেন।

আর তৎকালীন এসব ভবন এবং কারুকার্যে ব্যবহার করা হয় চুন, সুরকি। তবে এসব স্থাপত্যশৈলীর স্থায়িত্ব নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে তা খসে পড়েছে। এতে করে নষ্ট হচ্ছে উত্তরা গণভবনের মূল প্যালেস, কুমার প্যালেস ও সংগ্রহশালা।
নাটোর জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নাটোরের দিঘাপতিয়া রাজবাড়ির নাম পরিবর্তন করে উত্তরা গণভবন ঘোষণা করেন। এরপর থেকেই জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধায়নে গণপূর্ত বিভাগ ভবনগুলোর দেখভাল করে আসছে। একাধিকবার মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকও হয় উত্তরা গণভবনে। বর্তমানে এটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছে।

গণপূর্ত বিভাগ জানায়, উত্তরা গণভবনের মূল কাঠামো ঠিক রেখে নান্দনিকতা ফেরাতে প্রতিবছর চুন আর রঙের কাজ করে তারা। তবে এবার রং করতে গিয়ে কারুকার্য এবং নকশা খসে পড়তে দেখতে পায় শ্রমিকরা। মূল প্যালেস, কুমার প্যালেস ও সংগ্রহশালা ভবনের প্রতিটি কারকার্য স্থায়িত্ব নষ্ট হয়ে খসে খসে পড়ছে। এতে করে নষ্ট হচ্ছে ভবনগুলোর মূল কাঠামগুলো।

উত্তরা গণভবনের দায়িত্বে থাকা সহকারী ব্যবস্থাপক খায়রুল বাশার বলেন, যথাযথ সংস্কারের অভাবে ঐতিহাসিক উত্তরা গণভবনের প্রাচীন ভবনগুলো নষ্ট হয়েছে। ভবনের বেশির ভাগ জায়গায় কারুকার্যগুলো খসে পড়ছে। শ্রমিকরা রং করতে গিয়ে হাত দিলে তা ঝরে পড়ছে। কোনোভাবেই নকশাগুলো রক্ষা করা যাচ্ছে না। অতিদ্রুত ভবন সংস্কারের পাশাপাশি নকশাগুলো রক্ষা করা প্রয়োজন।

নাটোর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম বলেন, উত্তরা গণভবনের স্থাপত্যশৈলীর কারুকাজ ও নকশাগুলো অক্ষুন্ন রেখে কিভাবে সংস্কার কাজ করা যায়, তার জন্য গৃহহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালরে স্থাপত্য বিভাগে চিঠি প্রেরণ করা হয়েছে। স্থাপত্য বিভাগের বিশেষজ্ঞরা সরেজমিনে পরিদর্শন করবেন। এরপর আমরা বাকি সংস্কার কাজ করবো।

তিনি বলেন, উত্তরা গণভবনের ভবনগুলোর স্থায়িত্ব নষ্ট হয়ে গেছে। দীর্ঘ দিনের ভবনগুলো হওয়ার কারণে কারুকার্যগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। যার কারণে স্থাপত্যশৈলীগুলো ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ছে। এই স্থাপত্যগুলো রক্ষা করা খুবই জরুরি। আমরা স্থাপত্য বিভাগের বিশেষজ্ঞদের অপেক্ষায় রয়েছি। তারা পরিদর্শনের পরই মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের মতামত নিয়ে সংস্কার করা হবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের শিক্ষক ড. একেএম আরিফুল ইসলাম বলেন, প্রাচীন স্থাপত্য একটা জাতীর ইতিহাস ও ঐতিহ্যবহন করে। আর উত্তরা গণভবন নাটোরাসীর এক গর্বের জায়গা। এই ইতিহাস এবং স্থাপত্যশৈলী নষ্ট হলে গণভবনের সৌন্দর্যহানির পাশাপাশি নাটোর হারাবে তার ইতিহাস-ঐতিহ্য। এজন্য চারুকলা ভাষায় উত্তরা গণভবনের স্থাপত্যশৈলীর সব নকশা বা কারুকার্যের ছবি তুলে হুবহু ফরমা তৈরি করে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এছাড়া মোল্ট বানিয়ে এসব কারুকার্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, প্রয়োজন হলে দেশের সব নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ শিক্ষকদের দিয়ে পরিদর্শন করিয়ে তাঁদের মতামতের ভিত্তিতে গণভবনের স্থাপত্যশৈলীগুলো রক্ষা করতে হবে। একবার কারুকার্যগুলো ধ্বংস হয়ে গেলে, সেগুলো রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই বিশেষজ্ঞদেও মতামতের ভিত্তিতে কারুকার্যগুলো রক্ষা করা প্রয়োজন।
নাটোর উত্তারা গণভবনের ইতিকথা

নাটোর শহর থেকে ৩ কিলোমিটার উত্তরে এক মনোরম পরিবেশে ইতিহাস খ্যাত দিঘাপতিয়ারাজবাড়ী তথা উত্তরা গণভবন অবস্থিত। নাটোরের রাণী ভবানী তাঁর নায়েব দয়ারামেরউপরে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে দিঘাপতিয়া পরগনা উপহার দেন। ১৯৪৭ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করার পর ১৯৫২ সালে দিঘাপতিয়ার শেষরাজা প্রতিভানাথ রায় সপরিবারে রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে কলকাতায় চলে যান। পরবর্তীতে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত রাজ প্রাসাদটি পরিত্যাক্ত থাকে।

১৯৬৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসে এবং সরকারি ভবন হিসেবে সংস্কার হয়। ১৯৭২ সালে এটিকে উত্তরা গণভবন হিসেবে অভিহিত করা হয়। চারিদিকে মনোরম লেক, সুউচ্চ প্রাচীর পরিবেষ্ঠিত ছোট বড় ১২টি কারুকার্যখচিত ও দৃষ্টিনন্দন ভবন নিয়ে উত্তরা গণভবন ৪১.৫১ একর জমির উপর অবস্থিত। অভ্যন্তরে রয়েছে ইতালি থেকে সংগৃহীত মনোরম ভাস্কর্যে সজ্জিত বাগান, যেখানে রয়েছে বিরল প্রজাতির নানা উদ্ভিদ। নাটোরশহর থেকে ৩ কিলোমিটার

উত্তরে এক মনোরম পরিবেশে ইতিহাস খ্যাত দিঘাপতিয়া রাজবাড়ী তথা উত্তরা গণভবন অবস্থিত। নাটোরের রাণী ভবানী তাঁর নায়েব দয়ারামের উপরে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে দিঘাপতিয়া পরগনা উপহার দেন। ১৯৪৭ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করার পর ১৯৫২ সালে দিঘাপতিয়ার শেষরাজা প্রতিভানাথ রায় সপরিবারে রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে কলকাতায় চলে যান। পরবর্তীতে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত রাজ প্রাসাদটি পরিত্যাক্ত থাকে।

১৯৬৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসে এবং সরকারি ভবন হিসেবে সংস্কার হয়। ১৯৭২ সালে এটিকে উত্তরা গণভবন হিসেবে অভিহিত করা হয়। চারিদিকে মনোরম লেক, সুউচ্চ প্রাচীর পরিবেষ্টিত ছোট বড় ১২টি কারুকার্যখচিত ও দৃষ্টিনন্দন ভবন নিয়ে উত্তরা গণভবন ৪১.৫১ একর জমির উপর অবস্থিত। অভ্যন্তরে রয়েছে ইতালী থেকে সংগৃহীত মনোরম ভাস্কর্যে সজ্জিত বাগান, যেখানে রয়েছে বিরল প্রজাতির নানা উদ্ভিদ।

  • 35
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে