ফণীতে রাণীনগরে পাকা ধানের ব্যাপক ক্ষতি

প্রকাশিত: মে ৭, ২০১৯; সময়: ৩:১১ pm |

কাজী আনিছুর রহমান, রাণীনগর : নওগাঁর রাণীনগরে গত বৃহস্পতিবার (২ মে) রাত থেকে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড় ফণী’র প্রভাবে লাগাতার ভারি বৃষ্টিপাত আর ঝড়ো হাওয়ার কারণে চলতি মৌসুমের উঠতি ইরি-বোরো পাকা ধানের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছে কৃষকরা। প্রান্তিক পর্যায়ে জিরা জাতের ধান লম্বা হওয়ার কারণে বৃষ্টি আর বাতাসে ধানের গাছ গুলো জমিতে পড়ে পানি আর পাকা ধানের সোনালী শীষ একাকার হয়ে গেছে। বিশেষ করে নিম্মাঞ্চলের জমিতে পাকা ধান বৃষ্টি আর ঢলের পানিতে প্রায় হাঁটু জলে পরিনিত হয়েছে। দিনের বেলায় রোদের কারণে জমি থেকে বৃষ্টির পানি নামতে শুরু করলেও শ্রমিক সংকটের কারণে সময় মত ধান কাটতে না পারাই ফলন বিপর্যয়ের আশংকা দেখা দিয়েছে। অনেক জমিতে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় পাকা ধান নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছে কৃষকরা। এছাড়াও শেষ মহুর্তে ধানে কারেন্ট পোকার আক্রমনে দিশে হারা হয়ে পরেছেন কৃষকরা। ব্লাস্ট রোগ আর কারেন্ট ও মাজরা পোকার আক্রমনে ধানের ফলন কমে গেছে বলে জানিয়েছেন চাষীরা। এছাড়া বাজারে ধান বিক্রিতে ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় বিঘা প্রতি আড়াই থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা লোকসানের কবলে পরেছেন বর্গা চাষীরা ।

চলতি মৌসুমে কৃষকরা ইরি-বোরো ধানের ভাল ফলনের বুকভরা আশা থাকলেও বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত ঝড়ো হাওয়া আর বৃষ্টির কারণে ধানের ক্ষতি হওয়ায় আশানুরুপ ফলন নিয়ে চাষিরা শংকায় রয়েছে। বৃষ্টিপাতে রক্তদহ বিল এলাকা ও উপজেলার প্রধান প্রধান সড়কের দুই পাশের নিচু শ্রেণীর জমিগুলোর ধান পানিতে ডুবে গেছে।

স্থানীয় কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে মাঠ পর্যায়ের কৃষকদেরকে দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু শ্রমিক সংকটের কারণে ধান কাটতে অধিক মজুরী দিয়েও আশানুরুপ শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে মরার উপর খাঁড়ার ঘাঁ হয়ে দাড়িয়েছে ধানের দর পতন নিয়ে। গত বছর এই সময় জিরা জাতের সরু ধান প্রতি মণ সাড়ে ৮শ’ টাকা দরে বিক্রয় হলেও সেই মানের ধান এখন সাড়ে ৬ শ’ থেকে ৭ শ’ টাকার বেশি বেচা-কেনা হচ্ছে না। তাই কৃষকদের দাবি যত তারাতারি সম্ভব সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে সরাসরি চাষিদের কাছ থেকে ধান ক্রয় করা হোক।

জানা গেছে, চলতি বছরে উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে প্রায় ১৯ হাজার হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো ধানের চাষ হয়েছে। রাণীনগর উপজেলায় কয়েক দিন আগে পুরোদমে শুরু হয় বোরো ধান কাটা-মাড়াইয়ের কাজ। উপজেলার কৃষকরা জিরাশাইল, খাটো-১০, স্বর্ণা-৫ জাতের ধান চাষ করেছেন। নতুন ধান কাটার শুরুতেই বিঘা প্রতি ২০ থেকে ২২ মন হারে ধান উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে হালকা থেকে মাঝারি ঝড়ো বাতাস ও মসুলধারে বৃষ্টির কারণে উঠতি পাকা ধান জমিতে শুয়ে পড়ায় বিপাকে পড়েছে কৃষকরা।

বৃষ্টিপাতে রক্তদহ বিল এলাকা ও উপজেলার প্রধান প্রধান সড়কের দুই পাশের নিচু শ্রেণীর জমিগুলোর ধান ডুবে গেছে। দিনের বেলায় রোদের কারণে জমি থেকে বৃষ্টির পানি নামতে শুরু করলেও শ্রমিক সংকটের কারণে সময় মত ধান কাটতে না পারাই ফলন বিপর্যয়ের আশংকা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে নিম্মাঞ্চলের জমিতে বৃষ্টি আর ঢলের পানিতে প্রায় হাঁটু জলে পরিনিত হওয়ায় ধান কাটা শ্রমিকদের কাজ করে নিতে বিঘা প্রতি গুনতে হচ্ছে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। আবার কিছু এলাকায় অতিরিক্ত মজুরী দিয়েও ধান কাটা শ্রমিক না পাওয়ায় চরম দূর্ভোগে পড়েছে কৃষকরা। এছাড়াও ধানের বাজার দর হঠাৎ করে প্রতি মণে ৩০ থেকে ৫০ টাকা কমে যাওয়ায় সমদয় খরচই মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকরা। বর্তমানে জিরা জাতের সুরু ধান মান ও এলাকা ভেদে ৬শ’ ৮০ থেকে ৭শ’ টাকা পর্যন্ত হাটে-বাজারে বেচা-কেনা হচ্ছে।
উপজেলার সিম্বা গ্রামের কৃষক মো: সাইদুল ইসলাম ফকির জানান, আমি ইতিমধ্যেই ইরি-বোরো ধান কাটা মাড়াই শুরু করেছি ফলন ভালই হচ্ছে। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত ঝড় আর ভারি বৃষ্টিপাতে রাণীনগর-আবাদপুকুর সড়কের পাশে আমার প্রায় ২ বিঘা জমির জিরা জাতের ধান মাটিতে পড়ে গেছে। জমিগুলোতে ঢলের পানি জমে যাওয়ায় বিঘা প্রতি অতিরিক্ত মজুরী দিয়েও ধান কাটা শ্রমিক মিলাতে না পারাই পাকা ধান গুলো জমিতেই নষ্ট হচ্ছে।

রক্তদহ বিল এলাকায় ইরি-বোরো চাষি খালেছুর রহমান বাবু ও মোস্তাক হোসেন বলেন, তাদের দুই জনের প্রায় সাড়ে ১০ বিঘা জমির ধান পানিতে ডুবেছিল। তার মধ্যে প্রায় সাড়ে ৫ বিঘা জমির ধান দ্বিগুণ মজুরী দিয়ে ইতিমধ্যেই কেটেছে। পানিতে ডুবে যাওয়ায় ধানের ফলন বিপর্যয় হয়েছে। বাজারেও এই ভেজা ধানের তেমন চাহিদা নেই।

রাণীনগর উপজেলার সিলমাদার গ্রামের গোলাম রাব্বানী,গুয়াতা গ্রামের আনোয়ার হোসেন,হরিশপুর গ্রামের জাহের আলীসহ অনেক বর্গা চাষীরা জানান,চলতি মৌসুমে প্রতি বিঘা জমিতে ধান উৎপাদন করতে মাটি ও অঞ্চল ভেদে ১৬ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা খরচ পরেছে । পক্ষান্তরে প্রতি বিঘা জমিতে ২০-২৪ মন পর্যন্ত ধানের ফলন হচ্ছে । এই ধান বর্তমান বাজার দরে বিক্রি করে বিঘা প্রতি আড়াই থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে । বাজারে ন্যায্য মূল্য পেলে লোকসান কাটিয়ে বেশ ভাল লাভবান হওয়া যেত ।

আবাদপুকুর বাজার ধান-চাল আড়ৎ সমিতির সাধারণ সম্পাদক হেলাল উদ্দীন হেলু মন্ডল বলেন, মোকামে প্রচুর মজুদ থাকায় আগ্রহ নিয়ে কোন মহাজন ধান ক্রয় করছেনা । এছাড়া বর্তমান চালের বাজার দর কম হওয়ায় মোকামের দাম অনুসারে ধান ক্রয় করতে হচ্ছে ।

রাণীনগর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন, সরকারীভাবে প্রতি কেজি ধান ২৬ টাকা দরে প্রতি মন ধান এক হাজার চল্লিশ টাকায় ক্রয়-বিক্রয় হবার কথা । কিন্তু স্থানীয় বাজারে যে দামেই বেচা-কেনা হোক না কেন এতে আমাদের কিছু করার নেই।

উপজেলা কৃষি আফিসার কৃষিবিদ মো: শহিদুল ইসলাম জানান, বৃষ্টিপাতের কারণে উপজেলার মেইন রাস্তার দুই পাশের নিচু শ্রেণীর কিছু জমির ধান ডুবে গেছে। এটা খুবই সামান্ন পরিমাণ। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে মাঠ পর্যায়ের কৃষকদেরকে ডুবে যাওয়া জমির ধান দ্রুত কাটার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যেই উপজেলা ৮টি ইউনিয়নে অর্ধেক ধান কাটা-মাড়াই হয়ে গেছে। চলতি বোরো মৌসুমে ধানের ভাল ফলন হচ্ছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে