অর্ধকোটি টাকা আত্নসাৎকারী কোলা ইউপি চেয়ারম্যান অপসারণ

প্রকাশিত: মে ২, ২০১৯; সময়: ১০:১৩ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক, বদলগাছী : নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার কোলা ও ভান্ডারপুর নামক দুটি হাট-বাজার উন্নয়ন প্রকল্পের ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে, ইউপি সচিবের সাক্ষর জাল করে অর্ধকোটি টাকা আত্নসাৎ এর ঘটনা প্রমাণিত হওয়ায় সেই কোলা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান এসকেন্দার মির্জাকে চুড়ান্তভাবে অপসারণ করা হয়েছে।

গত ৩০ এপ্রিল ২০১৯ ইং তারিখে ৪৬.০০.৬৪০০.০১৭.২৭.০০১.১৭-১২৪ নং স্বারকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের ইপ-১ অধিশাখার উপসচিব ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত চুড়ান্তভাবে অপসারণের প্রজ্ঞাপনটি জারি করেন।

প্রজ্ঞাপনটিতে, বদলগাছী উপজেলাধীন কোলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এসকেন্দার মির্জার বিরুদ্ধে একই ইউনিয়ন পরিষদের ৬জন সদস্য এবং ভান্ডারপুর ও কোলা বাজার বণিক সমিতি কর্তৃক উথাপিত একাধিক ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে টাকা উত্তোলন, ইউপি সচিবের স্বাক্ষর জাল করা, মাটি ভরাটের কাজ না করে টাকা আত্্রসাৎ এবং একই প্রকল্প বার বার দেখিয়ে অর্থ আত্্রসাৎ এর অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায়। জেলা প্রশাসকের প্রস্তাব মোতাবেক স্থানীয় সরকার বিভাগ ২৭/১১/২০১৮ ইং তারিখে ৮৯০ নং স্বারকে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একই সাথে কেন তাঁকে চুড়ান্তভাবে অপসারণ করা হবেনা তা পত্র প্রাপ্তির ১০ কার্যদিবসের মধ্যে তার জবাব সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এ বিভাগে প্রেরণের জন্য অনুরোধ করা হয়।

যেহেতু নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলাধীন কোলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এসকেন্দার মির্জা (সাময়িক বরখাস্তকৃত) কর্তৃক প্রদত্ত কারণ দর্শানোর জবাব সন্তোষজনক বিবেচিত না হওয়ায় জেলা প্রশাসক, নওগাঁ বর্ণিত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯ এর ধারা ৩৪(৪) (ঘ) ধারা মোতাবেক তাঁর বিরুদ্ধে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করেছেন।

সেহেতু নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলাধীন কোলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এসকেন্দার মির্জাকে (সাময়িক বরখাস্তকৃত) জনস্বার্থে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন ২০০৯ এর ৩৪ (৪) (ঘ) অনুযায়ী তাঁর পদ হতে অপসারণ করা হলো।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার বদলগাছীকে, নওগাঁ স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন ২০০৯ এর ৩৫ (২) ধারা মোতাবেক পদটি শুন্য ঘোষণা সংক্রান্ত গেজেট বিজ্ঞপ্তিটি জারীর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনটি অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য, ১. জেলা প্রশাসক নওগাঁ, ২. সিনিয়র সচিব মহোদয়ের একান্ত সচিব, স্থানীয় সরকার বিভাগ, বাংলাদেশ সচিবালয় ঢাকা, ৩. উপজেলা নির্বাহী অফিসার বদলগাছী নওগাঁ, ৪. প্রোগ্রামার, স্থানীয় সরকার বিভাগ (স্থানীয় সরকার বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশের অনুরোধসহ), ৫. অতিরিক্ত সচিব মহোদয়ের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, স্থানীয় সরকার বিভাগ, বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা, ৬. এসকেন্দার মির্জা, চেয়ারম্যান (অপসারণকৃত) কোলা ইউনিয়ন পরিষদ বদলগাছী, নওগাঁকে প্রেরণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে গত ২/৫/২০১৯ ইং তারিখে এই প্রজ্ঞাপনটি প্রকাশও করা হয়েছে।

এ বিষয়ে নওগাঁ জেলা প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান এর সাথে মোবাইলফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোনটি কেটে দেন।

উপজেলা প্রশাসন ও কোলা ইউপি কার্যালয় সূত্রে জানাগেছে, কোলা ইউপির ৬ জন ইউপি সদস্য গত ২০১৭ ইং সালের ৫ সেপ্টেম্বর ইউপি চেয়ারম্যান এসকেন্দার মির্জার বিরুদ্ধে কোলার হাট ও ভান্ডারপুর হাটের ২২ টি উন্নয়ন প্রকল্পের ৫১ লাখ ৩০ হাজার ৯৫১ টাকা আত্নসাতের অভিযোগ এনে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ড. আমিনুর রহমানের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মাসুম আলী বেগকে ওই বছরের ২১ সেপ্টেম্বর পত্র দিয়ে অভিযোগটি তদন্তের নির্দেশ দেন।

ওই দিনই ইউএনও মাসুম আলী বেগ উপজেলা কৃষি অফিসার হাসান আলীকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যে বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, উপজেলা সমাজসেবা অফিসার তারিকুল ইসলাম ও বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) সহকারী প্রকৌশলী হারুন-অর রশিদ।
কমিটিকে দশ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পত্র দেন ইউএনও। তদন্ত কমিটি উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা আত্নসাতের সত্যতা পায়। তদন্ত কমিটি গত বছরের ১৮ অক্টোবর ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে উপযুক্ত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে ইউএনওর কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। পরে ২৯ অক্টোবর ইউএনও মাসুম আলী বেগ সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নওগাঁর স্থানীয় সরকার শাখার উপপরিচালকে পত্র দেন। ইউএনও নওগাঁর ডিসিকেও একটি অনুলিপি দেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, উপজেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি অর্থ আত্নসাতের সত্যতা পেয়ে ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশ করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। এরপর পর ইউপি চেয়ারম্যান পুনঃ তদন্ত চেয়ে আবেদন করেন। এরই প্রেক্ষিতে গত ৬ ফেরুয়ারি জেলা প্রশাসনের পক্ষে থেকে ফের অভিযোগটি তদন্ত করে। নওগাঁর স্থানীয় সরকার উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) আহসান হাবিব অভিযোগটি তদন্ত করেন। এরপর আবারও ২১ মে নওগাঁ স্থানীয় সরকার উপ-পরিচালক মুজিবুল হক অভিযোগটি তদন্ত করেন।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ইউপি চেয়ারম্যান এসকেন্দার মির্জার বিরুদ্ধে দুনীতির অভিযোগে অভিযুক্ত করে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯ এর ৩৪(৪) (খ) ধারায় ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে সুপারিশ করে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্নসাৎ সংক্রান্ত তদন্তের প্রতিবেদন ও অনান্য তথ্যাদি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে। ২৭ নভেম্বর ২০১৮ ইং তারিখে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় চেয়ারম্যান এসকেন্দার মির্জাকে সাময়িক বরখাস্ত করেন।

এরপর গত ৩০শে এপ্রিল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয় অর্থ আত্নসাতকারী কোলা ইউপি চেয়ারম্যান এসকেন্দার মির্জাকে চুড়ান্তভাবে অপসারণ করেন।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাসুম আলী বেগ বলেন, কোলা ইউপি চেয়ারম্যান এসকেন্দার মির্জাকে অপসারণ করা হয়েছে সেই প্রজ্ঞাপনটি আমি পেয়েছি। এখন তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

উল্লেখ, গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর দৈনিক সংবাদে ‘কাজ না করেই প্রকল্পের টাকা আত্নসাৎ! ও ২০ সেপ্টেম্বর ‘কোলা ইউপি চেয়ারম্যানের অর্থ আত্নসাৎ অভিযোগের তদন্ত ১৫ দিনেও শুরু হয়নি’ ২৭ সেপ্টেম্বর ’কাজ না করে অর্থ আত্নসাৎ কোলা ইউপি চেয়ারম্যানকে শোকজ ঃ তদন্ত শুরু’ ২৫ অক্টোবর ’ কোলা ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত’ ও চলতি বছরের ২১ জানুয়ারী ‘ কোলা চেয়ারম্যানের অর্থ আত্নসাৎ প্রমাণের তিন মাসেও ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ ও গত ২০১৮ ইং ডিসেম্বরে কোলা ইউপির চেয়ারম্যান সাময়িক বরখাস্ত বলে কয়েকটি দৈনিক সংবাদ এ ছাপানো হয়।

অপরদিকে, বদলগাছী উপজেলার কোলা ইউনিয়নবাসী দূণিতীবাজ ইউপি চেয়ারম্যান এসকেন্দার মির্জার চুড়ান্তভাবে অপসারণের খবর শুশে খুশিতে মাতোয়ারা হয়ে পড়েন। ঐ ইউনিয়নের জনসাধারণ এই প্রতিবেদক ও দৈনিক সংবাদের সম্পাদককে অসংখ্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে