এবার নওগাঁয় আমে দেড় হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা

প্রকাশিত: মে ১৪, ২০২২; সময়: ২:০৯ pm |

আরিফুল হক সোহাগ, নওগাঁ : নওগাঁয় এ বছর মৌসুমী ফল আমের উৎপাদনের লক্ষমাত্রা বেড়েছে। ভালো ফলন ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় নওগাঁর বরেন্দ্র অঞ্চলগুলোতে এ বছর আমের বাম্পার ফলনের আশা করছেন চাষীরা। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশগুলোতে রপ্তানীর সম্ভাবনা দেখছেন ব্যবসায়ীরা। শেষ সময়ে এসে গাছ পরিচর্যার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন আম চাষীরা।

গেলও বছর জেলায় ২৫ হাজার ৮শত ৫০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হলেও এ বছর ৩ হাজার ৬শত ২৫ হেক্টর বেড়ে ২৯ হাজার ৪ শত ৭৫ হেক্টর জমিতে আম চাষ হচ্ছে। ২০২১ সালে যার উৎপাদনের লক্ষ্মমাত্রা ছিলো ৩লক্ষ ৪৮ হাজার ৯শত৭৫ মেট্রিকটন হলেও ২০২২ এ এসে ৩লক্ষ ৬৮ হাজার ৪শত ৩৫ মেট্রিকটন আম উৎপাদনের লক্ষমাত্রা নির্ধারন করেছে জেলা কৃষি বিভাগ। আর গেলও বছর জেলায় ১২শ কোটি টাকার আমের ব্যবসা হলেও এ বছর তার বেড়ে দাড়িয়েছে প্রায় ১৫শ কোটি টাকাতে।

ধান উৎপাদনের পাশাপাশি আম উৎপাদনে বেশি মনোযোগী হচ্ছেন নওগাঁর চাষীরা। জেলার সাপাহার, পোরশা, নিয়ামতপুর, বদলগাছি এবং পত্নীতলা উপজেলায় এ বছর বাণিজ্যিক ভাবে আম উৎপাদন করছেন চাষীরা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, জেলার ১১টি উপজেলায় প্রায় ১৬ জাতের আম উৎপাদন করছেন চাষীরা।

 

 

এদের মধ্যে নওগাঁ সদরে – ৪৪৫ হেক্টর, রানীনগরে – ১১০ হেক্টর, আত্রাই- ১২০ হেক্টর, বদলগাছি- ৫২৫ হেক্টর, মহাদেবপুর- ৬৮০ হেক্টর, পত্নীতলা- ৪৮৬৫ হেক্টর, ধামুরহাট- ৬৭৫ হেক্টর, সাপাহার- ১০০০০ হেক্টর, পোরশা- ১০৫২০ হেক্টর, মান্দা- ৪০০ হেক্টর এবং নিয়ামতপুরে- ১১৩৫ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের আম উৎপাদন করছেন চাষীরা। ফলন ভালো হওয়ায় চাষীরা দামও ভালো পাবেন বলে আশা করছে জেলা কৃষি বিভাগ। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ সামসুল ওয়াদুদ জানান- আম চাষ একটি লাভ জনক ব্যবসা। তাই নওগাঁর কৃষকরা ধানের পাশাপাশি আম চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলের লাল মাটি আম চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় চাষিরা এর পেছনে ঝুকছেন বেশি। তিনি জানান – আগামী ২৫ মে থেকে গুটি আম বা স্থানীয় জাতের আম পাড়ার মধ্য দিয়ে শুরু হবে এ বছরের আম সংরক্ষনের কাজ । এ মধ্যে ১০ -১৫ দিন পর পর বিভিন্ন জাতের আম পাড়া হবে । যা ১০ জুলাই থেকে আশ্বিনা/ বারী-৪ এবং গৌড়মতি আম পাড়ার মধ্যদিয়ে শেষ হবে এ বছরের আম সংরক্ষণ যা অগাস্ট মাসের মাঝামাঝি সময় চলমান থাকবে।

 

এদিকে সাপাহারের আম চাষীরা জানান- আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর গাছে আমের ফলন ভালো হয়েছে। গেলও বছর যে আম ১৫শ থেকে ২ হাজার টাকা মণ তাঁরা বিক্রি করেছেন এ বছর তা ২৫ শ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন তাঁরা। সাপাহার বরেন্দ্র এগ্রোর আম চাষি সোহেল রানা এ বছর ৭০ বিঘা জমিতে আমের চাষ করছেন তিনি। আমরুপালী, বারি-৪, গৌড়মতি, ব্যানানা ম্যাংগো, কাটিমন, ল্যাংড়া, হিমসাগর,ফজলি, মিয়াজিকি সহ দেশী বিদেশী প্রায় ১০০ জাতের আম চাষ করছেন তিনি।গত বছর দেশে বিদেশে আম রপ্তানী করে বেশ লাভবান হয়েছেন তিনি।

 

তিনি জানান- গত বছর তার এই বাগান থেকে ৮ মেট্রিকটন আম রপ্তানী করেছেন তিনি। ইউরোপের দেশ যুক্তরাজ্য এবং মধ্যপ্রাচের দেশ কাতারে তিনি এই রপ্তানী করেছিলেন। এবছর জার্মানী, ফিনল্যান্ড, দুবাই সহ বেশ কয়েকটি দেশে রপ্তানীর সম্ভাবনা দেখছেন তিনি। এবছর অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় আধুনিক ফ্রুট ব্যগিং পদ্ধতিতে আম উৎপাদন করায় এ বছর প্রায় ৫০ মেট্রিকটন আম রপ্তানী করতে পারবেন বলেন জানান এই আম চাষী।

এদিকে , আম বাগানে কাজ করা শ্রমিকদের বাড়িত উপার্জনে উন্নত হয়েছে তাদের জীবনযাত্রা। পড়াশুনার পাশাপাশি পরিবারকে সহযোগিতা করতে পেরে বেশি খুশি তাঁরা। এছাড়া আম গাছ পরিচর্যা এবং এর পদ্ধতি সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁরা নিজেদের কাজে ব্যবহার করতে পারবেন বলে জানান। এ ছাড়া বাগানে আম দেখতে আশা মানুষেরা বিভিন্ন জাতের আমের বাগান দেখে নিজেকে আম ব্যবসায় স্বাবলম্বী করার প্রত্যয় নিয়ে ফিরছেন।

 

 

 

এদিকে আম আড়তদাররা জানান- গত বছর ব্যবসায় তার লাভবান হয়েছেন। তাই এ বছর ব্যবসার সকল প্রস্তুতি চলছে। প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া ২৫ মে আম সংরক্ষণ শুরুর তারিখ দেওয়ায় এখন থেকেই তাঁরা ব্যবসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অন্যান্য মোকামমে আম কম হওয়ায় এবার বেশি লাভের আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।

এদিকে জেলা প্রশাসন ইতিমধ্যে আম চাষি ও ব্যবসায়ীদের সকল সুযোগ সুবিধা নিশ্চিতে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক খালিদ মেহেদী হাসান । তিনি জানান- ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আম সংরক্ষনের সময়সীমা নির্ধারন করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া উৎপাদিত আম সুষ্ঠভাবে বিপননের লক্ষে প্রশাসন কাজ করে যাবে সবসময়। আম ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বিগত সময়ে যেমন যানযট সৃষ্টি হত এবার তা অপেক্ষাকৃত কম হয় তার জন্য জেলা প্রশাসনের কয়েকটি টিম মাঠে কাজ করবে বলে জানান তিনি।

ঝড় বৃষ্টি ও শুস্ক আবহাওয়া উপেক্ষা করে চাষিদের স্বপ্ন দুলছে এখন আম গাছের ডালে ডালে। এ বছর নওগাঁর আম চাষিরা এবং ব্যবসায়ীরা দেশের পাশাপাশি বিদেশেও আম রপ্তানিতে এগিয়ে থাকবেন বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপে