রাজশাহীতে সরকারি দুই সংস্থার দ্বন্দ্বের কবলে গমের বীজ উৎপাদন

প্রকাশিত: নভেম্বর ১৯, ২০২১; সময়: ১০:৩২ pm |

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর গম উৎপাদন অঞ্চল রাজশাহী। এই অঞ্চলে গম ও ভুট্টা গবেষণার একমাত্র মাঠ রাজশাহীর শ্যামপুর। বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিডাব্লিউএমআরআই) আঞ্চলিক কেন্দ্রের এই মাঠের এক পাশে চলছে গবেষণা, অন্য পাশে চলছে মানঘোষিত বীজ উৎপাদন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছর বিডাব্লিউএমআরআই এর সাত একর জমি দখলে নেয় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)। ফলে গম বীজ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বিডাব্লিউএমআরআই। বছরে অন্তত এই অঞ্চলের চার হাজার চাষির মাঝে মানঘোষিত বীজ পৌঁছে দেয় বিডাব্লিউএমআরআই। উৎপাদন না থাকায় সেই উদ্যোগও ভেস্তে যেতে বসেছে এবার।

জানা গেছে, নভেম্বরে মূলত গম বীজ বপন হয় গবেষণা মাঠে। এবারও বিডাব্লিউএমআরআই গবেষণার পাশাপাশি গম বীজ উৎপাদনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু গত বছরের মতো জমি দখলের পায়তারা করছে বারি। গত মৌসুমে গম বীজ ফেলার মাসখানেক আগেই জোর করে জমি দখলে নিয়ে সরিষা, মশুর ও পেঁয়াজ চাষ করে বারি। ওই সময় দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতিও হয়। এবারও গত বছরের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে এই অঞ্চলের গম চাষ ও গবেষণায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছরের ১৫ নভেম্বর জটিলতা মেটাতে দুই পক্ষকে নিয়ে বৈঠকে বসেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মেসবাহুল ইসলাম। ওই বৈঠকে শ্যামপুরের এই অঞ্চলিক কেন্দ্রে গম ও ভুট্টার গবেষণা এবং বীজ উৎপাদন কার্যক্রম চালু রাখার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু তার আগেই বারির আওতাধীন সরেজমিন গবেষণা বিভাগের কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে তড়িঘড়ি করে জমি দখল হয়।

বিয়ষটি নিয়ে এই বছরের ২৮ মার্চ বারি মহাপরিচালকের সঙ্গে বৈঠকে বসের গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক। সেখানে শ্যামপুরের এই জমি নিজেদের উল্লেখ করে এর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন তিনি। কিন্তু তা কিছুতেই মানতে চায়নি বারি। ফলে বিষয়টি নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে উত্তেজনাও বাড়ছে।

বিডাব্লিউএমআরআই আঞ্চলিক কেন্দ্রের তথ্য অনযায়ী, ২০১৫-১৬ মৌসুমে আঞ্চলিক কেন্দ্রে ৪ হাজার ৩০৫ কেজি মান ঘোষিত গম বীজ উৎপাদন হয়। ওই বছর বারি-২৬, বারি-২৭, বারি-২৮, বারি-২৯ এবং বারি-৩০ জাতের গম বীজ উৎপাদন হয়েছে। পরের বছরও এই পাঁচ জাতের গম বীজ উৎপাদন হয় আঞ্চলিক কেন্দ্রে। ওই বছর উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার ১৯৫ কেজি।

২০১৭-১৮ মৌসুমে গম বীজ উৎপাদন ছিল ৬ হাজার ৩০৯ কেজি। ওই বছর আগের পাঁচটি জাত ছাড়াও বারি-৩৩ জাতের বীজ উৎপাদন হয়। পরের বছর সব মিলিয়ে ৫ হাজার ৮৮০ কেজি বীজ উৎপাদন হয়েছে। ওই বছর বীজ উৎপাদনের তালিকায় বারি-৩১ ও বারি-৩২ জাত যুক্ত হলেও বাদ পড়ে যায় বারি-২৬, বারি-২৭।

২০১৯-২০ মৌসুমেও এই দুটি জাত ছাড়াও বারি-৩১ জাতের বীজ উৎপাদন ছিল না। সেই বছর মোট বীজ উৎপাদন হয়েছে ৫ হাজার ৬১৮ কেজি। সর্বশেষ গত ২০২০-২১ মৌসুমে গম ও ভুট্টা গবেষণা কেন্দ্রের বীজ উৎপাদন মাঠ দখল করে নেয় বারি। ফলে বারি-৩২ ও বারি-৩৩ ছাড়া অন্য জাতের বীজ উৎপাদন করা যায়নি। এতে বীজ উৎপাদন নেমে আসে ১ হাজার ৬৩০ কেজিতে। যা এক দশকের মধ্যে গম বীজ উৎপাদনের সর্বনিম্ন রেকর্ড।

বীজ উৎপাদন না থাকলেও চাষিদের মাঝে বীজ বিতরণ বন্ধ রাখেনি বিডাব্লিউএমআরআই। বিভিন্ন উৎস থেকে বীজ সংগ্রহ করে বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বছর রাজশাহী বিভাগের আটটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মাধ্যমে প্রদর্শনীর উদ্দেশ্যে ৪৩০ জন চাষিকে গম বীজ দেওয়া হবে। আরও ২৫টি প্রদর্শনী হবে বেসরকারি সংস্থা কারিতাসের মাধ্যমে। সব মিলিয়ে গম বীজ বিরতণ হবে প্রায় সাড়ে ৪ টন।

বিডাব্লিউএমআরআই রাজশাহী আঞ্চলিক কেন্দ্রের প্রধান ড. ইলিয়াছ হোসেন জানান, বারির অধীনে ১৯৯৩ সালে রাজশাহীতে আঞ্চলিক গম গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা পায়। প্রায় ১৮ বছর ধরে কেন্দ্রের ২০ একর জমিতে কেবল গম ও ভুট্টা গবেষণা এবং বীজ উৎপাদন হয়েছে।

২০১৭ সালের ২১ নভেম্বর স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট যাত্রা শুরু করে। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, গম গবেষণা কেন্দ্রের যাবতীয় স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির মালিকানা পায় বিডাব্লিউএমআরআই। কিন্তু গম মৌসুমে তারা ১৩ একর জমি চাষ করতে পেরেছেন। সাত একর জমি পাননি। জমি নিয়ে বারির সঙ্গে বিরোধের বিষয়টি স্বীকার করলেও এ নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি আঞ্চলিক প্রধান।

তবে বিডাব্লিউএমআরআই এর শীর্ষ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, বিডাব্লিউএমআরআই যাত্রা শুরু করার বছর খানেক পর বারি তাদের আওতাধীন সরেজমিন গবেষণা বিভাগ-১ এর দফতর এনে ঢোকায় বিডাব্লিউএমআরআই আঞ্চলিক দফতরে। এরপর ২০২০ মৌসুমে জোর করে বিডাব্লিউএমআরআই’র গম গবেষণার সাত একর জমি দখলে নেয়।

এই কেন্দ্রের বাইরে তাদের আর কোনো জমি নেই। ফলে তারা গত বছর লক্ষ্যমাত্র অনুযায়ী গম বীজ উৎপাদন করতে পারেনি। এবারও একই শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সেখানে ব্রিডার বীজ উৎপাদন সীমিত করা হতে পারে। তবে জমি সংক্রান্ত বিষয়টি সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিচ্ছে বিডাব্লিউএমআরআই। এ বিষয়ে কয়েক দফা চেষ্টা করেও বিডাব্লিউএমআরআই মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ড. আমিরুজ্জামানের মোবাইলে সংযোগ পাওয়া যায়নি। ফলে এ নিয়ে তার মন্তব্য মেলেনি।

তবে জমি বণ্টন নিয়ে জটিলতা থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন বারি মহাপরিচালক ড. দেবাশীষ সরকার। তিনি বলেন, সংস্থা দুটি কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। এক সময় বারির আওতাধীন ছিল গম গবেষণা কেন্দ্র। সম্প্রতি সেটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করেছে। ফলে জমি বণ্টন নিয়ে নিজেদের ভেতর একটু সমস্যা হয়েছে। সেটি নিয়ে আলাপ আলোচনা চলছে। এতে গবেষণায় কোনো প্রভাব পড়েনি, পড়বেও না।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে