পাটে সুদিন ফেরার স্বপ্নে চাষিরা

প্রকাশিত: জুন ২৯, ২০২১; সময়: ১১:২৫ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক : গত মৌসুমে কৃষকের সিকে ছিড়লেও পাটের দামে বৃহস্পতি তুঙ্গে ছিল ব্যববসায়ী ও মজুতকারিদের। দেশের ইতিহাসে পাটের এমন উর্ধ্বগতি এরআগে কেহ দেখে নাই। কৃষকের কাছে দুই হাজার থেকে পঁচিশশো টাকা মণ দরের কেনা পাট বিক্রি হয়েছে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত।

অনুকুল আবহাওয়া ও ব্যাপক দাম থাকায় এবারে জেলায় গত বছরের চেয়ে প্রায় সাড়ে ২৩ হাজার বিঘা (তিন হাজার ১৪৩ হেক্টর) বেশী জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, এবারে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পাটের আবাদ হয়েছে ১৭ হাজার ৯৩৯ হেক্টর (প্রায় এক লাখ ৩৫ হাজার বিঘা)। আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৪ হাজার ৯ শো’ হেক্টর। গতবার আবাদ হয়েছিল ১৪ হাজার ৭ শো’ ৯৬ হেক্টর।

দেশের ‘সোনালি আঁশ’ খ্যাত পাট তার অতীত ঐতিহ্য হারিয়েছে অনেক আগেই। কালের বিবর্তনে পাটের সেই কদর এখন আর নেই। পাটের সোনালি অতীত এখন কেবলই ইতিহাস। এরপরও পুরোনো ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন পাট চাষিরা। পাশাপাশি কয়েকবছর থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চটকলগুলো হারানো ঐতিহ্য ফিরে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।

রাজশাহীতে সবেমাত্র পাট কাটা ও জাগ দেয়া শুরু হয়েছে। প্রায় সপ্তাহ দু’য়েক পর বাজারে পাট আসতে শুরু করবে। এরমধ্যে কৃষকের মাঝে শুরু হয়েছে পাটের দাম নিয়ে জল্পনা-কল্পনা। আশা-নিরাশার দোলাচালে এখনও বছর বছর কৃষকের আঙিনা রঙিন করে রাখে এই সোনালি আঁশ। প্রতিবছর এক বুক স্বপ্ন নিয়ে পাট চাষ করেন গ্রামের সাধারণ কৃষক।

রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে মাঠে কাজ করেন। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে মাটি থেকে ফসল ফলান। সবুজ পাটকে রূপান্তরিত করেন সোনালি আঁশে। এরপরও বিক্রি করতে গিয়ে পড়েন দুর্বিপাকে। কখনো ভালো দাম পান; আবার কখনও একেবারেই পান না! অনেক সময় আবার লাভের চেয়ে ক্ষতিই হয় বেশি। এরপরও সামান্য লাভের আশায় প্রতি বছরই পাটের আবাদ করেন।

পাটের দাম নিয়ে সংশয় থাকেই। তবে গতবার পাটের দাম ভালো পাওয়ায় কপাল খুলেছে কৃষকদের। নতুন সম্ভাবনায় কৃষকের মনে সেই ভয় কেটেছে। তবে কৃষকের চেয়ে ভালো দামে পাট বিক্রি করেছেন মজুতদারেরা। সবমিলিয়ে গত মৌসুমে সোনালি আঁশের কদর ছিল। এবারে কেমন হবে তাই নিয়ে ভাবনা চাষিদের।

রাজশাহীতে বাজারে এখনো উঠতে লাগেনি। তবে গত বছর শুরু দিকেই এক হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার টাকা মণ দরে পাট বিক্রি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে সাড়ে ৫ হাজার টাকা মণ দরে পাট বিক্রি হচ্ছে। যা দেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রেকর্ড। এবারে চাষিরা সাড়ে ৫ হাজার টাকা চান না। প্রতি মণ পাট আড়াই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা পেলেই খুশি তারা।

রাজশাহীর পবা উপজেলার চৌবাড়িয়া গ্রামের পাটচাষি সবুর আলী বলেন, এবার তিনি আট বিঘা জমিতে পাটের আবাদ করেছেল। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ভালো ফলন হবে বলে আশা করছেন। তিনি বরাবরই পাট চাষ করে থাকেন। সোমবার থেকে তার জমির পাট কাটা শুরু হয়েছে। তিনি বলেন গতবার প্রথম দিকে পাট বিক্রি করে ঠকেছেন। তবে তার মত প্রায় চাষিরাই পাট বিক্রিতে ঠকেছেন বলে তিনি জানান।

উপজেলার নওহাটা হাটের পাট ব্যবসায়ী সাইদুর রহমান বলেন, প্রতিবছর মৌসুমের প্রথম দিকে পাটের দাম কম থাকে। শেষের দিকে কিছুটা দাম বাড়ে। এক হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হয়। গতবার দাম বাড়তে বাড়তে সাড়ে ৫ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন বিশ্ব বাজারে সুতার দাম বেড়েছে। এজন্য পাটের দামও বেড়েছে বলে উল্লেখ করেন রাজশাহীর পবা উপজেলার এই পাট ব্যবসায়ী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পবার এক জুটমিলের মহাব্যবস্থাপক বলেন, রাজশাহীতে নতুন পাট এখনো উঠেনি। তাই দামের বিষয়টা বলতে পারছেনা না। আপনাদের লক্ষ্য মণপ্রতি কতটাকায় কেনায়, এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ধরে নেন আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার। তবে তিনি বলেন সরকারিভাবে পাটের দাম নির্ধারণ করলে চাষি ও ব্যবসায়ীদের লোকসানের ও লাভের অঙ্ক সীমার মধ্যে থাকবে।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কেএজএম আব্দুল আওয়াল জানান, রাজশাহী জেলার নয় উপজেলায় গেল বছর (২০২০) ১৪ হাজার ১৯৬ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছিল। এবারে (২০২১) লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩ হাজার ১৪১ হেক্টর বেশী জমিতে আবাদ হয়েছে। এবারে আবাদ হয়েছে ১৭ হাজার ৯৩৯ হেক্টর (প্রায় এক লাখ ৩৫ হাজার বিঘা)। চাষিরা পাটের ভাল দাম পাবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

  • 174
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে