রাজশাহীতে মুড়িকাটা পিঁয়াজের উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১০, ২০২১; সময়: ৪:০০ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহীর পুঠিয়ার বিহারীপাড়া গ্রামের কৃষক আজিজুল হক ১৫ কাঠা জমিতে মুড়িকাটা পিঁয়াজ রোপন করেছিলেন। চাষাবাদ করতে পেঁয়াজ লেগেছিলো সাড়ে তিন মণ। দুই মাস আগে চাষাবাদ করার সময় পিঁয়াজের দাম ছিলো আকাশচুম্বী।

সাড়ে তিন হাজার টাকা মণ হিসেবে পেঁয়াজের দাম পড়েছিলো ১২ হাজার টাকা। জমি প্রস্তুত করা, শ্রমিক খরচ, কীটনাশক, সার ও নিড়ানী দেওয়ায় খরচ পড়েছিলো আরো ১০ হাজার টাকা। অর্থাৎ আজিজুল হকের ১৫ কাঠা জমিতে খরচ হয়েছিলো ২২ হাজার টাকা। তার ধারণা, সবমিলিয়ে ১৫ কাঠা জমিতে উৎপাদন হবে ২৫ থেকে ৩০ মণ পিঁয়াজ। অথচ রাজশাহীর বানেশ্বর পাইকারি বাজারে এখন পিঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১০০০ টাকা মণ।

আজিজুল হক জানান, ভারতীয় পিঁয়াজ আমদানির কারণে কৃষকরা ব্যাপক লোকসানে পড়েছে। এমনিতেই পিঁয়াজ বাজারে ওঠার সময় দাম কম থাকে। সেখানে আমদানির কারণে ইতিমধ্যে মণ প্রতি দেশীয় পিঁয়াজের দাম বাজারে চারশো থেকে পাঁচশো টাকা কমে গেছে। এই দাম আরো কমার সম্ভাবনা আছে।

পিঁয়াজ বাজারে উঠার সময় আমদানি না করে যখন দেশের চাহিদা থাকে তখন যদি আমদানি করতো তাহলে ভোক্তারাও লাভবান হতো এবং কৃষকরাও উপকৃত হতো। এজন্য কৃষকদের সাথে সরকারের সমন্বয়টা খুবই দরকার। কৃষকরা যে ফসলই উৎপাদন করে তাতেই লোকসান। এভাবে কৃষকরা মরে শেষ হয়ে যাবে।

রাজশাহীর দুর্গাপুরের কৃষক জনাব আলীও জানালেন একই আশঙ্কার কথা। তিনি এক বিঘা জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ চাষ করেছেন। তিনি জানালেন, ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানির কারণে পিঁয়াজের দাম কমে যাওয়ায় কৃষকরা অনেক লোকসানে পড়বে। দুই মাস আগে পিঁয়াজের দাম বেশি থাকায় এবছর জমিতে পিঁয়াজ প্রচুর খরচ পড়েছে।

সে তুলনায় বাজারে পিঁয়াজের দাম অনেক কম। শুধু রাজশাহী না, একই আশঙ্কার কথা জানালেন মুড়িকাটা পিঁয়াজ উৎপাদনে শীর্ষে থাকা পাবনা, কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষকরা।

তারা সবাই বলছেন, ভারতীয় পিঁয়াজ আমদানির কারণে কৃষকরা লোকসানে পড়বে। ভারতীয় পিঁয়াজ আমদানি কারণে পিঁয়াজের দাম অনেক কমে গেছে। এতে লাভ তো দূরের কথা, খরচ উঠাই কঠিন হয়ে পড়বে।

পাবনার সদর থানার নতুন গোহাইলবাড়ী গ্রামের কৃষক সাজাহান আলী তোফা। এবছর তিনি ১০ বিঘা জমিতে পিঁয়াজ চাষাবাদ করেছেন। তার ইতিমধ্যে সাত বিঘা জমির পিঁয়াজ জমি থেকে তুলে বাজারে বিক্রি করেছেন। আরো বিঘা তিনেক জমির পিঁয়াজ তার মাঠে পড়ে রয়েছে।

সাজাহান আলী তোফা জানান, এক মাস আগে থেকে পিঁয়াজ তুলে বাজারে বিক্রি করছি। তখন দাম পেয়েছিলাম মণপ্রতি ১৫০০ থেকে ১৮০০ টাকা। গতবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত এইরকম দাম ছিলো। ভারতীয় পিঁয়াজ আমদানির ঘোষণার পর পিঁয়াজের দাম ১০০০ টাকা মণে নেমে আসে।

আরো বিঘা তিনেক জমির পিঁয়াজ মাঠে আছে তার দাম কেমন পাবো এখনই তা বলা যাচ্ছে না। আমার মতো কৃষকদেরই খরচ তুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। যারা অল্প পরিসরে পিঁয়াজ চাষাবাদ করেছেন তাদের অবস্থা আরো খারাপ হবে।

প্রতিবছর নভেম্বরের শুরুতে দেশে আগাম মুড়িকাটা পেঁয়াজ উঠতে শুরু করে। এই পেঁয়াজ ছোট পেঁয়াজ রোপণ করে উৎপাদিত হয়। এটি সংরক্ষণ করা যায় না। বীজ থেকে উৎপাদিত পেঁয়াজ বছরজুড়ে সংরক্ষণ করা যায়। গতবছরের শেষের দিকে পিঁয়াজের দাম লাগামছাড়া হওয়ায় এবছর চাষীরা বেশি পিঁয়াজ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, দেশে ৬৫ হাজার ৯৬২ হেক্টর জমিতে মুড়িকাটা পিঁয়াজ চাষাবাদ হয়েছে। গতবছর চাষাবাদ হয়েছিলো ৬২ হাজার মেট্রিক টন। গতবছর মুড়িকাটা ও চারা পিঁয়াজ মিলে উৎপাদিত হয়েছিলো ২৫ লাখ ৬০ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন পিঁয়াজ।

রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও পাবনায় প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে পিঁয়াজ চাষাবাদ করা হয়েছে। গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ১৪.৩৯ মেট্রিক টন হিসেবে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৮৭ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে রাজশাহীতে ৫ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমিতে এবং পাবনায় ৯ হাজার হেক্টর জমিতে পিঁয়াজের চাষাবাদ হচ্ছে। সারা দেশের মধ্যে রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া ও ফরিদপুর মুড়িকাটা পিঁয়াজ উৎপাদনে শীর্ষে।

ঢাকার খামারবাড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামসুর রহমান জানান, যশোর অঞ্চলসহ দেশের মধ্যে রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া ও ফরিদপুরসহ ২১ টি জেলায় মুড়িকাটা পিঁয়াজ উৎপাদন হয়। অঞ্চলভিত্তিক একেক এলাকায় একেক পরিমাণ পিঁয়াজ উৎপাদিত হয়।

আলাদাভাবে মুড়িকাটা পিঁয়াজের উৎপাদনের হিসাব না থাকলেও গতবছর সব পিঁয়াজ মিলে গড়ে হেক্টরপ্রতি ১০.৭৬ মেট্রিক টন পিঁয়াজ উৎপাদন হয়েছিলো। সাধারণত চারা পিঁয়াজের চেয়ে মুড়িকাটা পিঁয়াজের উৎপাদন কম হয়। তবে আমরা হিসাব করে দেখেছি পিঁয়াজ উৎপাদন করতে গড়ে কেজিপ্রতি ১৫ টাকা থেকে ১৬ টাকা ব্যয় হয়। সেহিসেবে কৃষকদের গড়ে কেজিপ্রতি পাঁচ টাকা লাভ হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে ১৭ লাখ ৩৮ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে।

অন্যদিকে আমদানি হয়েছিলো ৯ লাখ ৩২ হাজার টন। তখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, বছরে দেশে ২৪ লাখ টন পেঁয়াজের চাহিদা ছিলো। এটা অবশ্য সংরক্ষণে ওজন কমে যাওয়া ও পচে যাওয়ার হিসাব বাদ দিয়ে।
দুই বছরে পেঁয়াজের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৯ লাখ মেট্রিক।

এদিকে কৃষকরা পাইকারি বাজারে ২৫ টাকা কেজিপ্রতি পিঁয়াজ বিক্রি বিক্রি করলেও রাজশাহীর বাজার খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৩৫ টাকা দরে এবং ঢাকায় তা বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা কেজিপ্রতি।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থানার স্বরূপপুর গ্রামের কৃষক নাজিম উদ্দিন জানান, এক বিঘা জমিতে সাত থেকে আট মণ পেঁয়াজের বীজ লাগে। ৪৪০০ টাকা মণ হিসেবে বীজ কিনে জমিতে লাগিয়েছিলাম। এছাড়া সার, কীটনাশকসহ অন্যান্য আনুসঙ্গিক খরচ তো লেগেছে। আমার দুই বিঘার সব পিঁয়াজই বিক্রি করেছি। এবার ফলন কিছুটা কম হয়েছে। ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি দরে সব পিঁয়াজ বিক্রি করা সত্ত্বেও উৎপাদন খরচ তুলাই কঠিন হয়ে পড়বে।

  • 38
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে