জলবায়ু মোকাবেলায় দুই কিলোমিটার জুড়ে লাগানো হলো তাল গাছ

প্রকাশিত: মে ২২, ২০২৩; সময়: ১২:৩২ pm |
জলবায়ু মোকাবেলায় দুই কিলোমিটার জুড়ে লাগানো হলো তাল গাছ

আব্দুল বাতেন: জলবায়ুর বিরুপ প্রভাবে বরেন্দ্র অঞ্চলের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায়, বিশেষত বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে তালগাছ রোপন করা হচ্ছে।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার কৃষি অফিসের ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদক’ প্রাপ্ত উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা অতনু সরকার কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করে এই মহতি কাজটি করছেন।

গত বৃহস্পতিবার (১৮মে) উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের লালুর মোড় থেকে ফকিরপাড়া পর্যন্ত দুই কিলোমিটার রাস্তার দুইপাশে তালগাছের চারা রোপনের উদ্বোধন করা হয়। রাজশাহী জেলা কৃষি প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা উম্মে সালমা চারা রোপনের উদ্বোধন করেন। এই সময় জেলা কৃষি প্রকৌশলী সাইদুর রহমান, উপজেলা কৃষি অফিসার মরিয়ম আহমেদসহ প্রায় ৩৫ জন কৃষক-কৃষাণী উপস্থিত ছিলেন।

বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদক প্রাপ্ত উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা অতনু সরকার বলেন, তালগাছের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে সারা দেশে রাস্তার দুই পাশে তালগাছের চারা-আঁটি রোপণের জন্য ২০১৭ সালে নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সেই নির্দেশনায় আমি নিজে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমার ব্লকের কৃষকদের সাথে আলাপ করে তালের আঁটি সংগ্রহ করতে বলি। গতবছর কৃষকরা আমার কথায় অনুপ্রেরিত হয়ে তালের আঁটি সংগ্রহ করে দিয়েছিলো। তাদের আঁটি গুলো আমি নিজে পরিচর্যা করে চারা করে দেয়। এরই অংশ হিসেবে গত ১৮ মে বৃহস্পতিবার ওইসব কৃষকদের সাথে নিয়ে পরিবেশের ভারসম্য রক্ষার উদ্দেশ্যে ১১৩০টি তাল গাছের চারা রাস্তার দুই পাশে প্রায় ২ কিলোমিটার জুড়ে রোপন করি।

অতনু সরকার আরো বলেন, আমাদের বরেন্দ্র অঞ্চল অতি খরাসহিঞ্চু প্রবণ এলাকা। দিনে দিন পালির স্তর মাটির নিচে নেমে যাচ্ছে ফলে কৃষি জমিতে পানি ঠিকমত পাওয়া যাচ্ছে না। কৃষকরা পানির জন্য হাহাকার করছে। ফলে আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে।

এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে এসব অঞ্চলে বজ্রপাতে মানুষ মরে যাওয়ার ঘটনা বেশ ঘটতেই আছে। আগের তাল গাছে বাবুই পাখির বাসা বেঁধে বসবাস করতো। এখন এসব দৃশ্য চোখে পড়েই না। আশ্রয় হিসেবে এ গাছ বাবুই পাখিদের বড়ই প্রিয় জায়গা। পাখিদের অভয়ারণ্য আমাদের গড়ে তোলা দরকার। সবকিছু চিন্তা করে আমি এই তালগাছ লাগানোর চিন্তা করে কৃষকদের সাথে নিয়ে কাজটি শুরু করেছি।

তিন আরো বলেন, কৃষি জমিতে পানির অভাব হচ্ছে। তাল গাছ থাকলে পানির স্তর উপরে উঠে আসে। আমাদের অঞ্চলে তাল গাছ বেশী করে রোপন করলে পানির স্তর উপরে উঠে আসবে। ফলে জলবায়ুর বিরুপ প্রভাব হতে আমাদের অঞ্চলকে বাঁচানোর জন্য তালগাছ ভূমিকার রাখবে বলে জানান।

উপজেলার ধামিলা গ্রামের কৃষক মনিরুল ইসলাম ও ধামিলা গ্রামের হুয়ায়ুন কবির বলেন, বছর খানেক আগে রাজশাহী ফল গবেষণায় আমাদের অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তনের উপর একটি ট্রেনিংয়ে অংশগ্রহণ করি। সেখান থেকে তালগাছের উপকারিতা ও রাস্তায় দুইপাশে সৌন্দর্য্যরে বিষয়ে জানান। পরবর্তিতে আমাদের কৃষি অফিসার অতনু সরকার সার্বিক বিষয়ে উদ্ধুদ্ধ করে। সে নিজে আমাদের তালগাছের চারা দিয়ে সহযোগিতা করে রাস্তার দুইপাশে তালগাছ লাগিয়েছি। তালগাছ লাগালে পনির স্তর উপরে আসে, পাখি বাসা বাঁধে, তাল থেকে পিঠা খাওয়া, তালগাছের পাতা থেকে পাটি বানানোসহ নানান বিষয়ে তিনি সচেতন করেছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তালগাছে কার্বনের স্তর বেশি থাকায় তা বজ্রপাত নিরোধে সহায়তা করে। কারণ, তালগাছের বাকলে পুরু কার্বনের স্তর থাকে। তালগাছের উচ্চতা ও গঠনগত দিক থেকেও বজ্রপাত নিরোধে সহায়ক। প্রকৃতি দিয়েই প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হবে। বজ্রপাত শুধু বাংলাদেশ, নয় সারা বিশ্বের জন্য আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দুর্যোগ থেকে পরিত্রাণের জন্য মানুষের ভাবনার অন্ত নেই। তালগাছ লাগানোর পাশাপাশি নারকেলগাছ, সুপারিগাছ লাগানোর উদ্যোগকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে।

উপজেলা কৃষি অফিসার মরিয়ম আহমেদ বলেন, এই অঞ্চলের কৃষকদের বিভিন্ন ফসল আবাদে উদ্ধুদ্ধ করার পাশাপাশি পরিবেশ বিষয়ে সচেতন করা হয়। এরই অংশ হিসেবে তালগাছ লাগানোর কার্যক্রমে কৃষকদের সাথে নিয়ে কাজটি করা হয়েছে। উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে কাজটি বাস্তবায়ন করছেন বলে জানান।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
topউপরে